ইংলিশ চ্যানেল জয়ী তাহারিনা নাসরিন আসন্ন মার্চে নিউজিল্যান্ডের কুক প্রণালী ট্রিট অতিক্রম করতে চলেছেন

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 16 h ago
ইংলিশ চ্যানেল জয়ী তাহারিনা নাসরিন আসন্ন মার্চে নিউজিল্যান্ডের কুক প্রণালী ট্রিট অতিক্রম করতে চলেছেন
ইংলিশ চ্যানেল জয়ী তাহারিনা নাসরিন আসন্ন মার্চে নিউজিল্যান্ডের কুক প্রণালী ট্রিট অতিক্রম করতে চলেছেন
 
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী

হাওড়ার উলুবেড়িয়ার নিমদিঘির তাহারিনা নাসরিন। আড়াই বছর বয়সে মায়ের হাত ধরেই সাঁতারে এসেছিলেন। তাহারিনাদের বাড়ির সামনেই রয়েছে দুটি বড় বিশাল পুকুর। আড়াই বছর বয়সে সেখানেই মায়ের হাত ধরে সাঁতার শিক্ষার হাতে খড়ি তাঁর। সেই শুরু। তারপর থেকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সাঁতার শেখার আগ্রহটা আরো বেড়ে যায়। পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার পর সাঁতারের প্রশিক্ষণ নিতে তাহারিনা বাবার হাত ধরে উলুবেরিয়া মিউনিসিপালিটি সুইমিংপুলে ভর্তি হয়ে যান। সেখান থেকে উলুবেড়িয়ারই একটি সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনুশীলন শুরু করেন।
 
তাঁর বাবা শেখ আফসার আহমেদ, যিনি সত্তর দশকে একজন কলকাতা ময়দানের কুমারটুলির ফুটবলার ছিলেন। তার কথায়, আমাদের পরিবারে দুতিন বছর বয়স হলেই বাড়ির সামনের পুকুরে ছেলে মেয়েদের সাঁতার শেখানো হয়। তাহারিনার ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম হয়নি। এই ভাবেই তার বেড়ে ওঠা ঘরের পুকুরে। এরপরই সে ২০০৫ সাল থেকে সাঁতারের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিযোগিতাতে ভালো সাফল্যও পেতে থাকে।
 
তাহারিনা নাসরিন
 
ঠিকই তাই। এরপর রাজ্য ও জাতীয় স্তরে একটার পর একটা সাফল্য পেতে শুরু করেন তাহারিনা। রাজস্তরে ৫০, ১০০ ও ২০০ মিটার ব্যাক স্ট্রোকে তার রয়েছে রেকর্ড। জাতীয় স্তরে সে পেয়েছে ২২টি মেডেল। এছাড়া ইন্দো বাংলা গেমসেও অংশ নিয়েছেন তিনি। সেখানেও এনেছিলেন সাফল্য । ২০১৩ সালে লাস্ট ন্যাশনাল খেলে দূরপাল্লার সাঁতারে আসার সিদ্ধান্ত নেয় তাহারিনা।
 
২০১৩ সাল থেকেই তাহারিনার ভাগ্যের চাকাটা ঘুরে যায়। ওই বছরেই তিনি বেলেঘাটা সুভাষ সরোবরে মাসুদুর রহমানের কাছে সাঁতারের অনুশীলন নিতে শুরু করেন। ২০১৪ সালে ৮১ কিলোমিটার কম্পিটিশনে তৃতীয় হন তাহারিনা। প্রায় ২২ বছর কোনো এক মহিলা সাঁতারু কম্বাইনে পজিসন পেয়েছিলেন।
 
এর আগে অবশ্য ২০১২ সালে তাহারিনা ইনকাম ট্যাক্সে চাকরি পান। তাহারিনা বলেছেন,২০১৩ সালেই স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করেন তুই ইংলিশ চ্যানেল পেরোতে পারবি? আমি বলেছিলাম হ্যাঁ,পারব। যা বলা,তাই কাজ। ২০১৩ কাল থেকেই আমি সেই লক্ষ্য নিয়েই অনুশীলন শুরু করি। আমার রুটিনটা ছিল সকাল নটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে অফিস করে তারপর বেলেঘাটায় সাঁতার শিখতে যেতাম।
 
পিতা-মাতার সঙ্গে তাহারিনা নাসরিন
 
কিন্তু ২৬ এপ্রিল, ২০১৫ সাল। তার চলার পথে একটা ব্যাঘাত সৃষ্টি হল। সেই সময় মারা যান মাসুদুর রহমান। কোচের মৃত্যুতে তাহারিনা ভেঙে পড়েছিলেন। ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। তখন তার বাবা-মা সাহস জুগিয়েছিলেন। তিনি মেয়েকে বলেছিলেন, ইংলিশ চ্যানেল সফলভাবে পেরোতে পারলেই তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে।
 
ইংলিশ চ্যানেল পেরোনোর ক্ষেত্রেও এসেছিল বাঁধা। একেবারে শেষ মুহূর্তে, কলকাতার ব্রিটিশ হাই কমিশনার তার ভিসার আবেদন বাতিল করে দিয়েছিলেন। সব আশা তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত কিছু সিনিয়র অলিম্পিয়নের সাহায্যে তাহারিনা ইংলিশ চ্যানেল পেরোনোর অনুমতি পান।
 
এরপর তার সেই ঐতিহাসিক দিনটা ছিল ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ৩ টে ২৫ মিনিটে। তিনি ওই সময়ে জলে নামেন। চ্যানেল পার করেন বিকাল চারটে তিন মিনিটে। অনেক বাধা অতিক্রম করে এই ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেন তাহারিনা।
 
তাহারিনা নাসরিন
 
ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে তাহরিনা বলেছিলেন, মাসাদুর স্যার বলতেন, যদি তোমার সাফল্য দেশকে গর্বিত করতে পারে তবেই তুমি সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন। আমি মাসাদুর স্যারের কথা রাখতে পেরেছি বলে আজও নিজেকে আমি গর্বিত মনে করি।
 
শুধু ইংলিশ চ্যানেল নয়, তিনি পার করে ফেলেছেন অনেকগুলো চ্যানেল। তার মধ্যে আছে-
 
** সুইম বাংলা চ্যানেল সোলো ক্রস ২৩ নভেম্বর ২০১৮ ( ৩ ঘণ্টা ৯ মিনিটে রেকর্ড )
 
** সুইম বাংলা চ্যানেল ডবল ক্রস,১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ (টাইম ৮ ঘন্টা ১৩ মিনিট রেকর্ড)।
 
** জিব্রাল্টার চ্যানেল, ১১ আগস্ট ২০২২ (টাইম চার ঘন্টা তেইশ মিনিট)।
 
** ধরমতার গেটওয়ে সুইম, ৯ জানুয়ারি ২০২৬(টাইম ৯ ঘন্টা ১৯ মিনিট)।
 
প্রশিক্ষকের সঙ্গে তাহারিনা নাসরিন
 
এখন বাংলার এই জলপরীর লক্ষ্য আগামী বছরের মার্চ মাসে নিউজিল্যান্ডের কুক প্রণালী ট্রিট অতিক্রম করার। যেটা আছে পিক টন থেকে ওয়েলিংটন, দূরত্ব ২২ কিলোমিটার।
 
কিন্তু খুবই ভালো কথা, আনন্দের কথা আমাদের গর্বের মেয়ে তাহারিনা নারসিন সাত সমুদ্র অতিক্রম করবেন। কিন্তু কিভাবে চ্যানেল পেরোনোর জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা তিনি জোগাড় করবেন? এটা নিয়েই প্রশ্ন জাগছে।
 
২০১৪ সালে ইংলিশ চ্যানেল আর ২০২৬ সালের জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করেছেন সম্পূর্ণ নিজের অর্থ খরচ করে। ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করতে তার খরচ হয়েছিল ১২ লক্ষ টাকা। আর জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করতে তার খরচ হয়েছিল ৮ লক্ষ টাকা। এই খরচ সামলাতে তাহারিনার তার বাবার ব্যবসার জমানো টাকা, সেই সঙ্গে ব্যাংক লোন আর তার নিজের চাকরি থেকে উপার্জিত কিছু অর্থ দিয়ে এই দুটি চ্যানেলের খরচ সামলেছেন! সরকারি বা বেসরকারি কোন সংস্থাই তাকে তেমনভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি।
 
তাহারিনা নাসরিন
 
এরপরও দৃঢ়তার সঙ্গে দূরপাল্লার সাঁতারু তাহারিনা নাসরিন বলেছেন, এর জন্য কিছু স্পন্সর হলে ভালো হয়। এ নিয়ে চারিদিকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে দীর্ঘদিন পর তাহারিনার মুখে হাসি ফুটিয়েছে উলুবেড়িয়ার এক ক্রীড়া সংস্থা ফ্রেন্ডস এন্টারপ্রাইজ। যারা তাহারিনার এই কঠিন যাত্রা পথকে সুগম করার জন্য আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং আগামী দিনে ও তারা তাঁর পাশে থাকবে এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।


শেহতীয়া খবৰ