মাটির ঘর থেকে জাতীয় মঞ্চে: মুর্শিদাবাদের সানা আজমি এখন আইএএস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 15 h ago
সানা আজমি
সানা আজমি
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

মুর্শিদাবাদের সাগরাড়িঘি। পাঙ্কলপাড়া নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামের মাটির ঘর থেকে উঠে আসা এক তরুণীর স্বপ্ন এখন জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। তার নাম সানা আজমি।

এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের দশ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সানা প্রথমবারের মতো ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (ইউপিএসসি) সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ৭৬৪তম স্থান অর্জন করেছেন। ২০২৫ সালের এই পরীক্ষার ফলাফল ৬ মার্চ, ২০২৬ তারিখে ঘোষণা করা হয় এবং সরকারি ফলাফলে সানার নাম ও স্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।

কিন্তু সানা এখানেই থেমে থাকছে না। তার লক্ষ্য এখন আরও বড়: ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা (আইএএস)-এ যোগদান করা। সে ইতোমধ্যেই তার পড়াশোনা আবার শুরু করেছে। প্রথম চেষ্টাতেই এই সাফল্য তার জন্য চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং এক বিশাল স্বপ্নের পথে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সানা আজমি

এক দরিদ্র কৃষক পরিবার থেকে শুরু হওয়া একটি যাত্রা

সানা পাঙ্কালপাড়ার এক অতি সাধারণ কৃষক পরিবারে বড় হয়েছেন। তাঁর বাবা মইজউদ্দিন শেখ একজন গরীব কৃষক, যাঁর নামে সামান্যই জমি আছে। যদিও তাঁর নিজের পড়াশোনা নবম শ্রেণি পর্যন্তই শেষ হয়েছিল, তিনি তাঁর সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারে কখনো আপোস করেননি।

তার দশ সন্তানের মধ্যে সাতজনই মেয়ে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা অসচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও, তিনি প্রতিটি সন্তানের পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

তার দুই মেয়ে চিকিৎসাবিদ্যায় কর্মজীবন বেছে নিয়েছেন। সানার বোন বিউটি খাতুন বর্ধমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কর্মরত এবং আরেক বোন উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ছেন।

গ্রামের স্কুল থেকে জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া পর্যন্ত

সানার নিজের শিক্ষাজীবনও ছিল নানা প্রতিবন্ধকতায় পূর্ণ। গ্রামের কাবিলপুর হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তিনি আল-আমিন মিশনের আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন।

পরবর্তীতে তিনি হাওড়ার একটি উচ্চ মাদ্রাসা থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেন এবং জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেন বলে জানা যায়।

মনে বড় স্বপ্ন নিয়ে সানা এরপর দ্রুত দিল্লিতে ছুটে গেলেন। তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সিভিল সার্ভিস কোচিং সেন্টারে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্যও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এরপর এলো সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
সানা আজমির বাবা-মা

সারাদেশ থেকে আসা হাজার হাজার প্রতিভাবান তরুণ প্রার্থীর সাথে প্রতিযোগিতা করে সানা প্রথম চেষ্টাতেই সফল হয়েছে। সর্বভারতীয় স্তরে তার ৭৬৪তম স্থান তাকে ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিস সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় গ্রুপ এ সার্ভিসে নিয়োগের জন্য যোগ্য করে তুলেছে। কিন্তু তার স্বপ্ন এখানেই শেষ নয়।

আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য একজন আইএএস অফিসার হওয়া

সানা বলেছেন, ইউপিএসসি পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন এবং পরিবারের সমর্থনের জন্য তিনি সত্যিই কৃতজ্ঞ। প্রথম চেষ্টাতেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি খুশি, তবে তিনি তার ভাবি বিউটি খাতুনের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

সানার ভাষ্যমতে, বিউটির সমর্থন ছাড়া পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দিল্লি যাওয়া তার পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না। সানা আরও জানান যে, তিনি বর্তমানে যে চাকরিতে নির্বাচিত হয়েছেন সেখানেই যোগ দেবেন, কিন্তু তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একজন আইএএস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা। তিনি তার ভাই মোহাম্মদ ইমরানের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে এ কথা জানান।

তার মা, ফুলবানু বিবিও একই স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেন, সানার সাফল্যে পরিবার আনন্দিত হলেও সানা নিজে তার অবস্থানে সন্তুষ্ট নয়। তিনি একজন আইএএস অফিসার হওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করেছেন।

৭৬৪ হলো পদমর্যাদার ঊর্ধ্বে এক স্বপ্ন

সম্ভবত এটাই সানার গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি। সাফল্যের দরজা খুলে গেলেও সে সেই দোরগোড়ায় থেমে থাকেনি। বরং, সে আরও বড় লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে।
 
 
সানা আজমি

এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে দশ ভাইবোনের মাঝে বেড়ে ওঠা এই তরুণী গ্রামের স্কুল থেকে দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভারতের অন্যতম কঠিন একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

হয়তো, পাঙ্কলপাড়ার সেই মাটির বাড়ির ভেতরে এত বড় একটা স্বপ্নের কথা কল্পনা করা একসময় মানুষের পক্ষে কঠিন ছিল। কিন্তু সানার পরিবার তাদের মেয়েদের শিক্ষার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিল। সেই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফল এখন সকলের সামনে।

এক মেয়ে ডাক্তার, আরেকজন চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে এবং সানা নিজেও দেশের প্রশাসনিক চাকরির দোরগোড়ায় পৌঁছেছেন। তবুও সামনের পথ এখনও অনেক দীর্ঘ।

৭৬৪ র‍্যাঙ্ক সানার প্রথম সাফল্য। তার পরবর্তী লক্ষ্য আরও উচ্চতর: পুনরায় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন আইএএস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা।

সাগরাড়িঘির পাঙ্কালপাড়ার মাটির বাড়ি থেকে সানার সর্বভারতীয় র‍্যাঙ্ক ৭৬৪ পর্যন্ত পৌঁছানোর যাত্রাটি কেবল একটি পরীক্ষা পাশ করার গল্প নয়। এটি একটি কৃষক পরিবারের শিক্ষার প্রতি বিশ্বাস, বোনের সমর্থন এবং প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এক তরুণীর নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে রাখার দৃঢ় সংকল্পের গল্প।

সাগরদিঘির পাঙ্কলপাড়ার মাটির বাড়ি থেকে সর্বভারতীয় র‍্যাঙ্কিংয়ে ৭৬৪তম স্থান পর্যন্ত সানার এই যাত্রা শুধু একটি পরীক্ষায় পাশ করার গল্প নয়। এটি একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারের শিক্ষার প্রতি অটল বিশ্বাস, বোনের নিঃস্বার্থ সমর্থন এবং হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এক তরুণীর নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে রাখার দৃঢ় সংকল্পের গল্প।

সানা সাফল্যের প্রথম দরজা খুলেছে। এখন তার একমাত্র ও সুস্পষ্ট লক্ষ্য হলো আইএএস।


শেহতীয়া খবৰ