মাঠে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ, মসজিদে ইমামতি, সেখান থেকেই ইউজিসি-নেটে আরবিতে দেশের সেরা আবদুল হামিদ
তরুণ নন্দী / কলকাতা
মনে একরাশ স্বপ্ন আঁকড়ে সকালে বাবার সঙ্গে চলত মাঠে কৃষিকাজ। কখনও তিনি ব্যস্ত থেকেছেন গরু- ছাগল চরানো, ঘাস কাটা নিয়ে। আর সেইসঙ্গে অবসর মিললেই চলত বই-খাতা খুলে পড়াশুনো। পরে এই যুবকই মসজিদে ইমামতি করতে করতে প্রস্তুতি নিয়েছেন ইউজিসি-নেটের জন্য। ফল প্রকাশ হতেই হইচই কাণ্ড। দেখা গেল, আরবি বিষয়ে গোটা দেশের মধ্যে তিনিই শীর্ষে। এই খবরের জেরে বীরভূমের নলহাটি থানার কুখুড়া গ্রামের আবদুল হামিদ আজ সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
জানা গেছে, ইউজিসি-নেট জুন ২০২৬-এ আরবি বিষয়ে ৩০০-র মধ্যে ২৬৬ নম্বর পেয়ে ১০০ পার্সেন্টাইল অর্জন করেছেন তিনি। ১৬৪৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে তিনিই হয়েছেন প্রথম। একই সঙ্গে জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ (JRF) এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদের যোগ্যতাও অর্জন করে ফেলেছেন তিনি।
আবদুল হামিদের জীবনে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। বাবা আব্দুত তোয়াব সংসারের হাল ধরতে স্বল্প বেতনে শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজও করতেন। বাবা চাইতেন, অর্থের টানাটানি থাকলেও সন্তানদের পড়াশোনায় যাতে কোন ব্যাঘাত না ঘটে।
ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করার পাশাপাশি লক্ষ্য স্থির রেখে ঠিকমত পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছেন এই পরিবারের মেধাবী সন্তান আবদুল হামিদ। মাদ্রাসায় পড়াশোনা, কুরআন হিফজ, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবিতে স্নাতক হয়ে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া থেকে ৮.৭৫ CGPA-তে স্নাতকোত্তর।
সাফল্যের প্রতিটি ধাপেই ছিল আবদুল হামিদের সংগ্রাম। উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লিতে গিয়ে থাকার খরচ জোগাড় করাও ছিল তাঁর কাছে কঠিন। টিকে থাকার জন্য কখনও এক ঘরে চারজন থেকে, কখনও বন্ধুর সঙ্গে নিজেরাই রান্না করে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছেন তিনি।
ইউজিসি-নেট ছিল না শুরু থেকেই তাঁর মূল লক্ষ্য। নতুন করে প্রস্তুতি শুরু করেন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন একটি মিশনে পড়ানোর পাশাপাশি মসজিদে ইমামতিও করতেন। পড়াশুনোয় জোর দিতে এক সময় মিশনের কাজ ছেড়ে দেন। না কোন দামি কোচিং-এ তিনি ভর্তি হননি। কয়েকটি বই, ইউটিউবের ক্লাস, নিজের তৈরি নোট আর বিগত বছরের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণই ছিল তাঁর ইউজিসি-নেট প্রস্তুতির হাতিয়ার।
আবদুল হামিদ
২৯ জুন সিউড়িতে পরীক্ষাকেন্দ্রে বসে ইউজিসি-নেট পরীক্ষা দেন। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে ২৮ আগস্ট ফল প্রকাশিত হলে স্কোরকার্ডের দিকে তাকিয়ে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আরবি বিষয়ে ১০০ পার্সেন্টাইল। ১৬৪৯ পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম। খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁকে অভিনন্দন জানাতে ছুটে আসেন সকলে। যে বাবা একদিন ছেলেকে নিয়ে মাঠে কৃষিকাজ করতে যেতেন, সেই বাবার ছেলের সাফল্যআজ গোটা গ্রামের গর্বের কারণ। আসলে কুখুড়ার সেই মাটির ছেলে দেশের মধ্যে সবার উপরে।
আবদুল হামিদের জানালেন, এখন তাঁর লক্ষ্য আরও বড়। আরবি নিয়ে গবেষণা করে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় বা JNU থেকে পিএইচডি করা। তিনি মনে করেন, সুযোগ কম হতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন আর পরিশ্রমের জোর কম হওয়া চলবে না।