পেশা দুটি, হৃদয় এক; শিক্ষকতা ও ব্যবসার আয়ে মানুষের পাশে ড. সোনিয়া ইয়াসমিন

Story by  Aparna Das | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
পেশা দুটি, হৃদয় এক; শিক্ষকতা ও ব্যবসার আয়ে মানুষের পাশে ড. সোনিয়া ইয়াসমিন
পেশা দুটি, হৃদয় এক; শিক্ষকতা ও ব্যবসার আয়ে মানুষের পাশে ড. সোনিয়া ইয়াসমিন
 
অপর্ণা দাস / গুয়াহাটি

একজন মানুষ, দুটি পেশা; কিন্তু মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ একটাই। পরিচয় তাঁর এক, অথচ সেই পরিচয়ের মধ্যেই যেন মিশে রয়েছে একাধিক সত্তা। একদিকে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে জ্ঞানের আলোয় গড়ে তুলছেন আগামী দিনের মানুষ, অন্যদিকে নিজের হাতে গড়ে তোলা ব্যবসার উপার্জনের একটি অংশ ব্যয় করছেন আজকের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। কারও পড়াশোনার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন, কারও বিয়ের প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দিচ্ছেন, আবার কখনও নীরবে পাশে দাঁড়াচ্ছেন এমন মানুষের, যাঁদের কষ্টের কথা হয়তো কোনওদিন প্রকাশ্যে আসে না।
 
দুর্গাপুরের ড. সোনিয়া ইয়াসমিনের জীবন যেন এই দুই সত্তারই এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তাঁর গল্প তাই শুধুই সাফল্যের সরল পথে এগিয়ে যাওয়ার কাহিনি নয়; বরং একইসঙ্গে দুটি নদীর মতো বয়ে চলা এক জীবনের গল্প, একটির স্রোত শিক্ষকতা, অন্যটির ব্যবসা। পথ দুটি আলাদা হলেও গন্তব্য এক, মানুষের কাছে পৌঁছনো। তাঁর কাছে শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, আর ব্যবসাও শুধুমাত্র উপার্জনের মাধ্যম নয়। দুটিই তাঁর স্বপ্ন, ভালোবাসা এবং মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার দুটি আলাদা পথ।
 

এই দুই পথের সূচনা অবশ্য একই জায়গা থেকে, ছোটবেলার একটি স্বপ্ন থেকে। ‘আওয়াজ–দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে কথোপকথনে ড. সোনিয়া ইয়াসমিনের সেই যাত্রার নানা দিক উঠে এল। কীভাবে একজন নারী নিজের স্বপ্নকে শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং সেই স্বপ্নের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন অন্য মানুষের প্রয়োজনকেও, সেই গল্পই তাঁর জীবনযাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ছোটবেলার শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নের পাশে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছে ব্যবসা, আর নিজের সাফল্যের পাশে নিঃশব্দে যুক্ত হয়েছে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা।
 
দুর্গাপুরেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ড. সোনিয়া ইয়াসমিনের। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত দুর্গাপুরের একটি স্থানীয় বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই বাংলা বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং বি.এড. সম্পন্ন করেন। বি.এড. শেষ করার পরই একটি কলেজে শিক্ষকতার সুযোগ পান সোনিয়া। বর্তমানে দীর্ঘদিন ধরে সেই কলেজেই অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। তবে তাঁর শিক্ষাজীবনের পথ সেখানেই থেমে থাকেনি। চাকরির পাশাপাশি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেন। এরপর শিক্ষাবিজ্ঞানে জাতীয় যোগ্যতা পরীক্ষা দিয়ে অধ্যাপনার যোগ্যতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঝাড়খণ্ড থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয়ও ছিল সমাজের প্রান্তিক শিশুদের ঘিরে। অনাথ ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী শিশুদের ক্ষেত্রে সরকার এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি।
 
বর্তমানে বি.এড. কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি বিদ্যালয়স্তরের পড়ুয়াদেরও বাংলা পড়ান সোনিয়া। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের বাংলা ভাষার দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের পড়িয়ে আসছেন তিনি। দুর্গাপুরের বিভিন্ন ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের বহু পড়ুয়া দূরদূরান্ত থেকেও তাঁর কাছে বাংলা পড়তে আসে। কারণ শিক্ষকতা তাঁর কাছে নিছক একটি পেশা নয়। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। তাঁর কথায়, “প্রথম ভালোবাসা যদি বলতে হয়, অবশ্যই শিক্ষকতা। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষকতা আমার স্বপ্ন ছিল। তবে এখন দুটোকে আলাদা করতে পারি না, শিক্ষকতা আর আমার ব্যবসা, দুটোই আমার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গেছে।”
 
ড. সোনিয়া ইয়াসমিন তাঁর কলেজে
 
ছোটবেলায় সোনিয়ার তিনটি স্বপ্ন ছিল, তিনি শিক্ষক হবেন, নিজের একটি বুটিক থাকবে এবং একদিন নিজের একটি ক্যাফে তৈরি করবেন। আজ সেই তিনটি স্বপ্নের মধ্যে দুটি বাস্তবে রূপ পেয়েছে। শিক্ষকতা তাঁর পেশা, আর ‘SY Collections’ তাঁর নিজের হাতে গড়ে তোলা স্বপ্নের বাস্তব রূপ। তৃতীয় স্বপ্নটি এখনও ভবিষ্যতের অপেক্ষায়।
 
পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরির পরীক্ষার অনিশ্চয়তার সময় পেরিয়ে তিনি বেসরকারি বি.এড. কলেজে কাজের সুযোগ পান। সেই কর্মজীবনের মধ্যেই ধীরে ধীরে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়িয়েছেন, পদোন্নতি পেয়েছেন এবং নিজের পেশাগত অবস্থান তৈরি করেছেন। সরকারি চাকরিতে যেতে না পারার আক্ষেপ হয়তো কোথাও রয়ে গেছে, কিন্তু শিক্ষকতার পথ তিনি কখনও ছাড়েননি। তাঁর কথায়, “দুটো পেশায় আমি কোনও পরিস্থিতির কারণে নেই। দুটোই আমার খুব ভালো লাগার জায়গা। শিক্ষকতা আমার প্রথম ভালোবাসা, আর ব্যবসাটাও আমার খুব ভালোবাসার কাজ।”
 
ব্যবসার শুরুটা শুনলে আজকের অবস্থানের সঙ্গে তার কোনও মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে শুরু হয়েছিল সোনিয়ার উদ্যোগ। বাজার থেকে কয়েকটি কানের দুল কিনে এনে সেগুলিকে নিজের মতো করে সাজিয়ে বিক্রি করতেন তিনি। তাঁর প্রথম ক্রেতা ছিলেন তাঁরই এক ছাত্রী। এরপর দুর্গাপুরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর কয়েকজন মহিলা তাঁকে উৎসাহ দেন। তাঁদের অনুষ্ঠানের জন্য গয়না, কানের দুল, গলার সামগ্রী ইত্যাদি সরবরাহ করতে করতে ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়তে থাকে। এরপর ২০১৮ সালের শেষের দিকে ব্যবসায় যুক্ত হয় পোশাক। তারপর ধীরে ধীরে ছোট সেই উদ্যোগের পরিধি বাড়তে থাকে।
 
ব্যবসার ক্ষেত্রেও সোনিয়ার ভাবনাটা শুরু থেকেই কিছুটা আলাদা। তাঁর কথায়, “আমরা যারা মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছি, কোনও কিছু কেনার আগে ভাবতে হয়, এটা কি আমরা কিনতে পারব? তাই আমি সবসময় চেষ্টা করি দামটা এমন রাখার, যাতে সবাই কিনতে পারে। বিশাল লাভ রেখে অল্প কিছু জিনিস বিক্রি করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া।” তাঁর পণ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য গুণমান ও দাম। বাজারদরের উপর তিনি নিজে নজর রাখেন। একই ধরনের পণ্য যেখানে বেশি দামে বিক্রি হয়, সেখানে তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের পণ্য দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তাঁর কাছে পণ্যের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে ক্রেতার বিশ্বাস।
 
ড. সোনিয়া ইয়াসমিনের বুটিক  ‘SY Collections’-এর কিছু দৃশ্য
 
২০১৭ সাল থেকেই ছোট পরিসরে অনলাইন ব্যবসা শুরু করেছিলেন সোনিয়া। ফলে মহামারির সময় অনলাইন ব্যবসা যখন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে, তখন তাঁর ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। মহামারির পর অনেকেই নতুন করে অনলাইন ব্যবসায় আসেন। কিন্তু সোনিয়াকে সেই সময় নতুন করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হয়নি। তাঁর কথায়, “২০-৩০ হাজার টাকা দামের শাড়িও মানুষ আমাকে মনে রেখে বা আমার উপর বিশ্বাস করে অর্ডার করেন। এই বিশ্বাসের জায়গাটা আমি অনলাইনে তৈরি করতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওনা।”
 
তবে সাফল্যের এই যাত্রা মোটেই কাঁটাহীন ছিল না। ব্যবসার শুরুর দিকে পরিচিত এক ক্রেতা বড় অঙ্কের পণ্য নেওয়ার কথা বলে তাঁকে সেগুলি রেখে দিতে বলেন। বারবার আশ্বাস পাওয়ায় সোনিয়াও বিশ্বাস করে পণ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। কিন্তু পরে সেই ক্রেতা জানান, সেই মুহূর্তে তাঁর পক্ষে পণ্য নেওয়া সম্ভব নয়। সেই অভিজ্ঞতা ব্যবসা সম্পর্কে তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তাঁর কথায়, “সেই ঘটনার পর থেকে টাকা না নিয়ে কারও জন্য কোনও পণ্য বুকিং নিই না। প্রথম দিকে একটা বড় ধাক্কা খেয়েছিলাম। তারপর বুঝেছি, বিশ্বাসের পাশাপাশি ব্যবসায় নিজের আর্থিক নিরাপত্তাটাও দেখতে হয়।”
 
ব্যবসা শুরু করতে বড় অঙ্কের ঋণ নিতেই হবে, এই ধারণার সঙ্গে একমত নন সোনিয়া। তাঁর মতে, “ব্যবসা করতে গেলে ঋণ নিতেই হবে, এই চিন্তাটা অনেকের মধ্যে থাকে। কিন্তু নিজের কাছে যতটুকু অর্থ আছে, সেটাকে বুদ্ধি খাটিয়ে ভালোভাবে ব্যবহার করে আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করা যায়। আমি আজ পর্যন্ত কোনও ঋণ নিয়ে ব্যবসা করিনি। নিজের টাকাকেই ঘুরিয়ে ব্যবসায় ব্যবহার করেছি।”
 
দুটি পেশাকে একসঙ্গে চালানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? ড. ইয়াসমিনের উত্তর খুবই সহজ, সময়। একজন শিক্ষক হিসেবে পড়ুয়াদের প্রতি তাঁর দায়িত্ব রয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা নিয়ে নানা সমস্যায় পড়লে তাঁকে পাশে পেতে চায়। অন্যদিকে ব্যবসায় রয়েছে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, অর্ডার নেওয়া, পণ্য নির্বাচন, গুণমান যাচাই, প্যাকিং এবং সরবরাহের কাজ। তিনি জানান, “আমাকে পড়াতে পড়াতে যদি বাড়িতে কোনও ক্রেতা চলে আসে, ছাত্রছাত্রীরা এখন সেটা বুঝে নেয়। তারা বলে, আগে ওঁদের সঙ্গে কথা বলো, তারপর ক্লাস শুরু করো। দুটো কাজ একসঙ্গে চালাতে গেলে একটু টানাপোড়েন তো থাকবেই।” তাঁর কথায়, “সময় খুব কম পাই নিজের জন্য। কিন্তু দুটো কাজকেই ভালোবাসি বলে এই সমস্ত কিছু আমার কাছে খুব একটা চাপ মনে হয় না।”
 
একটি প্রদর্শনীতে  ড. সোনিয়া ইয়াসমিন
 
সোনিয়ার ব্যবসা শুধু তাঁর নিজের উপার্জনের পথ নয়। ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থের একটি অংশ তিনি সামাজিক কাজেও ব্যয় করেন। দরিদ্র পরিবারের কোনও মেয়ের বিয়েতে প্রয়োজনীয় শাড়ি ও অন্যান্য সামগ্রী দেওয়া, কারও পড়াশোনার জন্য সাহায্য করা কিংবা কোনও পরিবার বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ানো, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্নভাবে মানুষের সাহায্য করেন তিনি।
 
দুর্গাপুজোর সময় তহবিল সংগ্রহও করেন। সেখানে কেউ ৫০ টাকা, কেউ ১০০ টাকা, যে যতটা পারেন, ততটাই দেন। যেহেতু সেই অর্থ অন্য মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়, তাই সেই কাজের কথা তিনি প্রকাশ্যে জানান। কিন্তু নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে করা অনেক সাহায্যের কথা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন না। তাঁর কথায়, “যাঁদের সত্যিই প্রয়োজন, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে আমার খুব ভালো লাগে। চাকরির টাকা বা পরিবারের দিক থেকে সবসময় সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ব্যবসা থেকে যা উপার্জন করি, তার একটা অংশ এই ধরনের সামাজিক কাজে ব্যবহার করি। সবকিছু প্রকাশ করি না।”
 
ড. ইয়াসমিনের দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর নিজের পরিশ্রমের পাশাপাশি পরিবারের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবা শুধু মানসিকভাবে পাশে থাকেন না, ব্যবসার প্রায় প্রতিটি ছোট-বড় কাজেই তাঁকে সহযোগিতা করেন। ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় প্যাকেট ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে আসা, পণ্য প্যাক করা, বাড়িতে ক্রেতা এলে তাঁদের পণ্য দেখানো, সবকিছুতেই তাঁরা সাহায্য করেন। সোনিয়ার কথায়, “পরিবারের সমর্থন না থাকলে হয়তো আমি আজ এতটা করতে পারতাম না। আমি যখন থাকি না, তখন মা-বাবাই আমার মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়ান। যে পরিমাণ পরিশ্রম আমাকে করতে হয়, তাঁদের সাহায্য ছাড়া দুটো কাজ একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না।”
 
আজকের তরুণ প্রজন্মকে সরাসরি চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নেমে পড়ার পরামর্শ দেন না সোনিয়া। বরং তাঁর মতে, সম্ভব হলে দুটো পথই খোলা রাখা উচিত। “চাকরি আর ব্যবসা, দুটোই একসঙ্গে চলুক। ভবিষ্যতে ব্যবসা যদি এত বড় হয় যে চাকরির সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তখন চাকরি ছাড়ার কথা ভাবা যাবে। কিন্তু শুরুতে দুটো পথ খোলা রাখা খুব জরুরি।” তাঁর মতে, ব্যবসায় ক্ষতি হলে চাকরি একটি নিরাপত্তার জায়গা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের বড় মূলধন নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পথ হতে পারে।
 
একটি প্রদর্শনীতে  ড. সোনিয়া ইয়াসমিন
 
ভবিষ্যতে ব্যবসা আরও বড় হলে চাকরির সঙ্গে ব্যবসার সময় মেলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে, এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সোনিয়া। তিনি জানান, “ভবিষ্যতে হয়তো চাকরির জায়গাটা বদলাতে পারে। হয়তো অন্য কোথাও কাজ করব। কিন্তু শিক্ষকতা ছাড়ব না। কারণ এটা আমার প্রথম ভালোবাসা।”
 
নয় বছর ধরে অনলাইন ব্যবসা করার পর গত দুই বছর ধরে অফলাইন প্রদর্শনীও করছেন সোনিয়া। সম্প্রতি নিজের একটি অফলাইন বুটিক ‘SY Collections’ শুরু করেছেন। তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না তিনি। ভবিষ্যতে একটি পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র তৈরি করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। এমন একটি জায়গা, যেখান থেকে নতুন উদ্যোক্তারা ভালো মানের পণ্য তুলনামূলক কম দামে কিনে নিজেদের ব্যবসা শুরু করতে পারবেন। অর্থাৎ নিজের ব্যবসাকে বড় করার পাশাপাশি অন্যদেরও ব্যবসায় আসার সুযোগ তৈরি করতে চান সোনিয়া।
 
ড. সোনিয়া ইয়াসমিনের গল্পের শেষটা তাই কোনও সাফল্যের সংখ্যায় টানা যায় না। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেন। আর ব্যবসায়ী হিসেবে উপার্জিত অর্থের একটি অংশ দিয়ে কখনও কোনও দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়ের প্রয়োজন মেটান, কখনও কারও পড়াশোনার পাশে দাঁড়ান, আবার কখনও এমন কারও হাতে সাহায্য পৌঁছে দেন, যার কথা হয়তো কোনওদিন খবরের শিরোনাম হয় না। তাঁর কাছে সাফল্যের সংজ্ঞায় তাই শুধু ‘আমি কতটা পেলাম’, এই প্রশ্নটি নেই; বরং জায়গা করে নিয়েছে ‘আমার কারণে আর কে একটু পেল’, এই ভাবনাটিও।
 
হয়তো এখানেই তাঁর গল্পটি অন্যরকম হয়ে ওঠে। তিনি একইসঙ্গে মানুষ গড়েন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ান। শ্রেণিকক্ষে তাঁর শ্রমের ফল তৈরি হয় আগামী দিনে, আর ব্যবসার আয়ের একটি অংশ দিয়ে তাঁর মানবিকতার স্পর্শ পৌঁছে যায় আজকের প্রয়োজনের মানুষের কাছে। একদিকে শিক্ষা, অন্যদিকে সহায়তা, দুটি পথের গন্তব্য যেন শেষ পর্যন্ত একই।
 
ছোটবেলায় দেখা তিনটি স্বপ্নের মধ্যে দুটি ইতিমধ্যেই বাস্তব, শিক্ষকতা এবং নিজের ব্যবসা। তৃতীয় স্বপ্নটি এখনও অপেক্ষায়, নিজের একটি ক্যাফে। হয়তো সেটিও একদিন বাস্তবে রূপ নেবে। কারণ সোনিয়ার গল্প আমাদের অন্তত এই শিক্ষা দেয় যে, স্বপ্ন পূরণের জন্য সবসময় বড় পুঁজির প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও মাত্র ৫০০ টাকাও যথেষ্ট, যদি তার সঙ্গে থাকে সাহস, পরিশ্রম, ধৈর্য এবং মানুষের বিশ্বাস।
 
শেষ পর্যন্ত তাই ড. সোনিয়া ইয়াসমিনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো অধ্যাপক নয়, উদ্যোক্তাও নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়,তিনি নিজের স্বপ্নের ভেতর অন্য মানুষের জন্যও একটু জায়গা রেখেছেন। আর সেই ছোট্ট জায়গাটুকুই তাঁর গল্পকে নিছক সাফল্যের গল্প থেকে মানবিকতার গল্পে পরিণত করেছে।