স্কুটি শেখানোই মিশন: আত্মনির্ভরতার পথে শত শত নারীকে এগিয়ে দিচ্ছেন সালেহা তারান্নুম

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 11 h ago
স্কুটি শেখানোই মিশন: আত্মনির্ভরতার পথে শত শত নারীকে এগিয়ে দিচ্ছেন সালেহা তারান্নুম
স্কুটি শেখানোই মিশন: আত্মনির্ভরতার পথে শত শত নারীকে এগিয়ে দিচ্ছেন সালেহা তারান্নুম
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

কলকাতার রাস্তায় আজ অসংখ্য নারী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্কুটি চালিয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন, সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছেন কিংবা নিজের ছোট ব্যবসার কাজ সামলাচ্ছেন। এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে নীরবে কাজ করে চলেছেন এক মুসলিম নারী উদ্যোক্তা—সালেহা তারান্নুম। তাঁর প্রতিষ্ঠিত Aiza's Scooty Training Center আজ শুধু একটি স্কুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, বরং বহু নারীর স্বাধীনভাবে চলার স্বপ্ন পূরণের এক নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। 

 

 

সালেহা তারান্নুমের গল্প শুরু হয় একেবারে সাধারণ জীবন থেকে। সংসার, সন্তান এবং পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়েই তিনি উপলব্ধি করেন, নারীদের জন্য নিরাপদ ও সহজ যাতায়াত কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়া কিংবা নিজের প্রয়োজনের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হওয়া তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। সেই প্রয়োজন থেকেই তিনি নিজে স্কুটি চালানো শেখেন। কিন্তু নিজের দক্ষতাকে শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন—এই দক্ষতাই হবে অন্য নারীদের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার। 


এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় Aiza's Scooty Training Center। নিজের মেয়ের নামানুসারে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন তিনি। কলকাতার টপসিয়ায় শুরু হওয়া এই কেন্দ্রটি এমন এক উদ্যোগ, যেখানে নারীরাই নারীদের স্কুটি চালানো শেখান। এই ধারণাই প্রতিষ্ঠানটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। নিরাপদ পরিবেশ, নারী প্রশিক্ষক এবং ধৈর্যশীল প্রশিক্ষণ পদ্ধতির কারণে খুব অল্প সময়েই এটি বহু মহিলার আস্থার জায়গা হয়ে ওঠে। 

সালেহা তারান্নুমে ছাত্রীদের সাথে
 
 
শুরুর পথ অবশ্য মোটেও সহজ ছিল না। নতুন ধরনের এই উদ্যোগ নিয়ে অনেকের সন্দেহ ছিল। কেউ ভাবতেন, নারীরা স্কুটি শেখার জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আসবেন না। আবার অনেক পরিবারও প্রথমদিকে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কিন্তু সালেহা তারান্নুম বিশ্বাস হারাননি। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, প্রশিক্ষণের নিরাপত্তা সম্পর্কে আশ্বস্ত করেছেন এবং নারীদের স্বাধীনভাবে চলাচলের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর অধ্যবসায়ই শেষ পর্যন্ত সাফল্যের দরজা খুলে দেয়। 

বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি নারী তাঁর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে স্কুটি চালানো শিখেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কলেজছাত্রী, কর্মজীবী নারী, গৃহবধূ এমনকি পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলারাও। কেউ সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্কুটি চালানো শিখেছেন, কেউ চাকরিতে যাতায়াতের সুবিধার জন্য, আবার কেউ ছোট ব্যবসা পরিচালনার স্বার্থে। অনেকের কাছেই স্কুটি চালানো কেবল একটি দক্ষতা নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। 

সালেহার উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তাঁর প্রতিষ্ঠানে নারী প্রশিক্ষকরাই অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দেন। ফলে শুধু প্রশিক্ষণ নয়, কর্মসংস্থানেরও নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক নারী এখান থেকে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করে নিজের পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে সালেহার পথচলায় বড় ভূমিকা রেখেছে নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন । এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি বৃহত্তর পরিসরে নিজের উদ্যোগকে তুলে ধরার সুযোগ পান, নতুন গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান আরও দ্রুত পরিচিতি লাভ করে। Taajira-র পক্ষ থেকেও তাঁর উদ্যোগকে নারী ক্ষমতায়নের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। 
 
সালেহা তারান্নুম
 
২০২৩ সালে Aiza Scooty Training Center Private Limited আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয়। এই নিবন্ধনের মাধ্যমে তাঁর উদ্যোগ আরও সুসংগঠিত রূপ পায় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সালেহা তারান্নুমের সাফল্যের আসল শক্তি তাঁর ব্যবসায়িক লাভ নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নারীদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া। একজন নারী যখন প্রথমবার নিজের স্কুটির হ্যান্ডেল ধরে রাস্তায় বের হন, তখন তিনি শুধু একটি যানবাহন চালান না—তিনি নিজের স্বাধীনতারও নতুন পথ খুলে দেন। সেই পথচলার নেপথ্যে থেকে সালেহা আজ অসংখ্য নারীর জীবনে নীরব বিপ্লবের কারিগর।

একবিংশ শতাব্দীর বাংলায় নারী উদ্যোক্তার সংজ্ঞা নতুনভাবে লিখছেন সালেহা তারান্নুম। তিনি দেখিয়েছেন, বড় পুঁজি নয়—একটি সঠিক ভাবনা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন উদ্যোক্তাকে অসাধারণ করে তুলতে পারে। তাঁর এই সংগ্রাম ও সাফল্যের কাহিনি নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা।