অপর্ণা দাস
একটা পুরো বছর জুড়ে জীবনের পথে চলতে গিয়ে মানুষ কত হাসি-কান্না, সাফল্য-ব্যর্থতা আর উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। দিনশেষে মনে জমে থাকে হাজারো অনুভূতি, ভালো-মন্দের মিশেল। ঠিক সেই সময়, বছরের শেষ প্রান্তে এসে দরজায় কড়া নাড়ে এক উৎসব, ক্রিসমাস। এই উৎসব যেন মানুষকে একটু থামতে শেখায়, পেছনে ফেলে আসা কষ্টগুলো ভুলে নতুন করে আনন্দে শ্বাস নিতে শেখায়। বলা হয়, “যার শেষ ভালো, তার সব ভালো”, আর বছরের শেষটা যদি হাসি, ভালোবাসা আর উৎসবের আলোয় শেষ করা যায়, তবে সামনে আসা নতুন বছরও যে সুখ আর ইতিবাচকতায় ভরপুর হবে, সেই আশাই জাগিয়ে তোলে ক্রিসমাস। এই আনন্দঘন মুহূর্তগুলোকে আরও মিষ্টি ও উষ্ণ করে তুলতে কোথাও টার্কি, কোথাও কেক, কোথাও কুকিজ বা পুডিং, এই উৎসব ঘিরে নানা রকম খাবারের আয়োজন চলে। তবে এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও একটি উপাদান প্রায় সব দেশেই বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে, আর তা হলো চকোলেট। ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার প্রতীক হিসেবে, সুখের স্বাদ হিসেবে, চকোলেট তাই এই উৎসবে শুধু একটি খাবার নয়, নতুন বছরের পথে এগিয়ে যাওয়ার আগে মনভরা আনন্দ আর আশাবাদের মিষ্টি উপহার।
ডিসেম্বরের ঠান্ডা হাওয়া আর রঙিন আলোয় সাজানো পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রিসমাসে এক অন্যরকম উন্মাদনা দেখা যায়, চকোলেটকে ঘিরে। শহরের বাতাসে ভেসে আসে কেকের গন্ধ, রঙিন আলোয় সাজে চার্চ ও শপিং মল, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে চকোলেটের চাহিদা। ক্রিসমাস উৎসব যেন আজ আর শুধু সান্তা-ক্লজ বা ক্রিসমাস ট্রি-তেই সীমাবদ্ধ নয়, এই উৎসবের অন্যতম নায়ক হয়ে উঠেছে চকোলেট। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক, সবাই যেন এই সময়ে চকোলেটের ‘মুড’-এ।
প্রতীকী ছবি
ক্রিসমাসে চকোলেটের বিশেষ গুরুত্ব শুধুমাত্র আধুনিক অভ্যাস বা উৎসবের বাজারি ট্রেন্ডের ফল নয়; এর শিকড় ছড়িয়ে আছে ইতিহাস, ধর্মীয় ভাবনা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা শৈশবের স্মৃতিতে। খ্রিস্টধর্মে ক্রিসমাস মানে যিশু খ্রিস্টের জন্মোৎসব, যা ভালোবাসা, দান ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার বার্তা বহন করে। ইউরোপে প্রাচীনকাল থেকেই এই সময়ে মিষ্টি খাবার উপহার দেওয়ার রীতি চালু ছিল, যাতে উৎসবের আনন্দ সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরে কোকো ও চকোলেট জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ধীরে ধীরে ক্রিসমাসের মিষ্টির কেন্দ্রে চলে আসে।
তাছাড়া অন্যান্য প্রচলিত মিষ্টির তুলনায় চকোলেটে সাধারণত চিনি কম এবং কোকোর পরিমাণ বেশি থাকে, বিশেষ করে ডার্ক বা সেমি-সুইট চকোলেটের ক্ষেত্রে। ফলে সান্তা ক্লজের মাধ্যমে শিশুদের উপহার দেওয়ার সংস্কৃতির সঙ্গেও চকোলেট সহজে জুড়ে যায়, কারণ এটি ভাগ করা সহজ এবং শিশুদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে সহনীয় ও সহজপাচ্য বলে ধরা হয়। ধর্মীয় দিক থেকে চকোলেট কোনও আনুষ্ঠানিক আচার না হলেও, ক্রিসমাসের মূল শিক্ষা-ভালোবাসা ও উদারতা,চকোলেট আজ সেই ভাবনাকেই মিষ্টি রূপে প্রকাশ করে, যা একে এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছে।

ক্রিসমাসে চকোলেটের জনপ্রিয়তার পিছনে রয়েছে আবহাওয়া ও আবেগ-দুটোরই বড় ভূমিকা। শীতকালে শরীর বেশি শক্তি চায়, আর চকোলেট দ্রুত ক্যালোরি জোগায়। তার পাশাপাশি, চকোলেট খাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আনন্দের অনুভূতি। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, বিশেষ করে ডার্ক চকোলেটে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং শরীরের ‘গুড কোলেস্টেরল’ বাড়াতে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে এতে থাকা ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এছাড়া চকোলেটে থাকা থিওব্রোমিন ও ফেনাইলইথাইলামিন মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়, যা মানসিক চাপ কমাতে এবং ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করতে সহায়ক।
যেমন সব কিছুরই ভালো ও খারাপ-দু’টি দিক থাকে, তেমনই চকোলেটের ক্ষেত্রেও উপকারিতার পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে। অতিরিক্ত চিনি ও ফ্যাটযুক্ত চকোলেট নিয়মিত খেলে ওজন বাড়ার ঝুঁকি থাকে, ডায়াবেটিস ও দাঁতের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে উৎসবের মরশুমে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চকোলেট খাওয়ার প্রবণতা পরবর্তী সময়ে অভ্যাসে পরিণত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

আজকের প্রজন্মের মধ্যে চকোলেটের প্রতি আকর্ষণ আরও আলাদা মাত্রা পেয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল রিল, চকলেট-থিমড ক্যাফে, আর্টিসান ও সুগার-ফ্রি চকোলেট, সব মিলিয়ে চকোলেট এখন শুধু খাবার নয়, বরং একটি লাইফস্টাইল স্টেটমেন্ট। তরুণদের কাছে চকোলেট মানে সেলফ-গিফট, স্ট্রেস বাস্টার কিংবা বন্ধুত্বের প্রতীক। তাছাড়া ছোটদের মধ্যে এক বহুল প্রচলিত বিশ্বাস ও আনন্দের ট্রেন্ড হলো; সান্তা ক্লজ ভালো শিশুদের জন্য ব্যাগভর্তি চকোলেট নিয়ে আসেন। তাই ক্রিসমাসের আগের রাতে বালিশের পাশে মোজা ঝুলিয়ে রাখা থেকে শুরু করে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সান্তার কথা ভাবা, সবকিছুর সঙ্গেই চকোলেটের স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে। ক্রিসমাসে তাই চকোলেট কেনা বা উপহার দেওয়া যেন এক ধরনের ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ক্রিসমাসের রঙিন মুহূর্তগুলোকে আরও মধুর করে তুলতেই চকোলেটের এই বিশেষ যাত্রা। আনন্দ, শৈশবের স্মৃতি, আধুনিক লাইফস্টাইল আর সামান্য বিজ্ঞান, সবকিছু মিলিয়েই উৎসবের টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে চকোলেট। তবে মনে রাখতে হবে, উৎসবের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে ভারসাম্যে-আনন্দে ভরপুর, কিন্তু সচেতনতায় বাঁধা। এই ক্রিসমাসে তাই চকোলেট থাকুক, হাসি থাকুক, আর থাকুক প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার উষ্ণতা।