পদ্মশ্রী নুরউদ্দিন আহমেদের জাদুকরি ছোঁয়ায় বিষ্ণুপুর বিমলা নগর পুজো মণ্ডপে জীবন্ত হয়ে উঠেছে ‘কিষ্কিন্ধা’ নগরী
Story by Ariful Islam | Posted by Aparna Das • 18 h ago
পদ্মশ্রী নুরউদ্দিন আহমেদের জাদুকরি ছোঁয়ায় বিষ্ণুপুর বিমলা নগর পুজো মণ্ডপে জীবন্ত হয়ে উঠেছে ‘কিষ্কিন্ধা’ নগরী
আরিফুল ইসলাম ও অপর্ণা দাস / গুয়াহাটি
মাটির কাঠামোয় যখন শিল্পীর কল্পনা মিশে যায়, তখন ইতিহাসের পাতায় থাকা এক প্রাচীন নগরীও যেন বাস্তবের রূপ পায়। সম্প্রীতি ও সৃজনশীলতার এমনই এক অনন্য নিদর্শন দেখা যাচ্ছে পদ্মশ্রী নুরউদ্দিন আহমেদের শিল্পকর্মে। তাঁর জাদুকরি ছোঁয়ায় গুয়াহাটির বিষ্ণুপুর বিমলা নগর সার্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রামায়ণের ঐতিহাসিক নগরী ‘কিষ্কিন্ধা’। সংগীতের মতো শিল্পেরও যে কোনও ধর্মীয় পরিচয় বা ভৌগোলিক সীমানা নেই, সেই বার্তাই যেন তুলে ধরেছে চানফ্লাওয়ার ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত এই পুজোর অভিনব মণ্ডপ।
বিগত বহু বছর ধরে শিল্পী নুরউদ্দিন আহমেদের অসাধারণ শিল্পকুশলতায় নির্মিত পুজো মণ্ডপগুলি অগণিত দর্শনার্থীর বিপুল প্রশংসা ও ভালোবাসা অর্জন করে আসছে। এ বছর বিষ্ণুপুর বিমলা নগর সার্বজনীন দুর্গাপুজোর মূল বিষয়বস্তু বা থিম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘কিষ্কিন্ধা’। পদ্মশ্রী নুরউদ্দিন আহমেদের অনবদ্য শিল্পকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা এই ‘কিষ্কিন্ধা’র শৈল্পিক রূপ উৎসবপ্রেমী মানুষকে এক ভিন্ন ধরনের আনন্দ ও নান্দনিক অভিজ্ঞতা উপহার দেবে।
রামায়ণের ঐতিহাসিক নগরী ‘কিষ্কিন্ধা’
বিষ্ণুপুর বিমলা নগর সার্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির সম্পাদক বিকি রায় বলেন, “নুরউদ্দিন দাদা প্রায় ৭-৮ বছর ধরে আমাদের পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তিনি আমাদের এই পুজোর কাজ একেবারে নিজের পুজো মনে করেই করেন। দুর্গাপুজোর কাজ শুরু হওয়ার প্রায় দু’মাস আগে থেকেই তিনি আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাঁর শিল্পকর্ম সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। প্রতিবারই তিনি আমাদের অবাক করে দেন।”
উল্লেখযোগ্য যে, বিষ্ণুপুর বিমলা নগর সার্বজনীন দুর্গাপুজোর থিম হিসেবে বেছে নেওয়া ‘কিষ্কিন্ধা’ রামায়ণের যুগের একটি ঐতিহাসিক নগরী। মহাকাব্য রামায়ণ অনুসারে, কিষ্কিন্ধা ছিল বানররাজ বালি ও তাঁর ভাই সুগ্রীবের রাজধানী তথা ঐতিহাসিক নগরী।
রামায়ণের ঐতিহাসিক নগরী ‘কিষ্কিন্ধা’
"আওয়াজ-দ্য ভয়েস"-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে পদ্মশ্রী নুরউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এবার আমাদের থিম ‘কিষ্কিন্ধা’। বালি ও সুগ্রীবের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল এবং বানর সেনা যেভাবে শ্রী রামচন্দ্রকে সাহায্য করেছিল, সেই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই এবার আমরা কাজ করছি। বানররাও যে মানুষকে সাহায্য করতে পারে, সেটাই আমরা তুলে ধরতে চাইছি। মণ্ডপের ভিতরে রাজসভাগুলি দেখানোর চেষ্টা করেছি। ভিতরে গুহা রয়েছে। গুহার মধ্যে কীভাবে বন্দি করে রাখা হতো, সেটাও দেখানোর চেষ্টা করেছি। প্রতি বছরই আমরা ভালো থিম নিয়ে কাজ করি, যাতে নতুন প্রজন্ম পুজো দেখতে এসে সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অন্তত কিছুটা হলেও শিখতে পারে। এ বছরের থিমটি যথেষ্ট কঠিন। তাই আমরা প্রায় দু’মাস আগে থেকেই কাজ শুরু করেছি।”
প্রতি বছরের মতো এবারও এই পুজোয় ব্যতিক্রমী ও নতুন ধরনের কারিগরি দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যাবে। পুজো মণ্ডপের প্রবেশদ্বারেই দেখা যাবে বানর সেনার দু’টি বিশালাকার দ্বাররক্ষী। এ ছাড়াও পুজো চত্বরের উপরে হনুমানকে উড়ে আসতে দেখা যাবে। নুরউদ্দিন আহমেদ বলেন, “গুহার ভিতরে সম্পূর্ণ দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়েছে। ভিতরে সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বালি ও সুগ্রীবের কাহিনি দেখা যাবে। বাইরে থেকে কিষ্কিন্ধা রাজ্যটি দেখতে পাবেন দর্শনার্থীরা।”
পদ্মশ্রী নুরউদ্দিন আহমেদ
উল্লেখযোগ্য যে, শিল্পী নুরউদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৪০ জন মানুষ এই কিষ্কিন্ধা নগরী নির্মাণের কাজ করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই স্থানীয় অসমিয়া শিল্পী। এ প্রসঙ্গে নুরউদ্দিন আহমেদ বলেন, “অসমিয়া শিল্পীদের নিয়েই আমি প্রায় ২২ বছর ধরে পুজোর কাজ করে আসছি। অনেক বড় বড় মণ্ডপ তৈরির জন্য বাইরে থেকে শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু স্থানীয় অসমিয়া শিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে অসমে বড় পুজোর কাজ করি আমরাই। অনেকেই ইচ্ছা প্রকাশ করেন, কিন্তু সাহস করে এগিয়ে আসেন না।”
আহমেদ আরও বলেন, “নির্মাণের উপকরণ হিসেবে প্যারিস ও ফাইবার ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি মাটির কাজও করা হয়েছে। প্লাইবোর্ডের ব্যবহার বেশি করা হয়েছে। এই থিমটি নতুন এবং যথেষ্ট কঠিন। রামায়ণে বানর সেনার ভূমিকা এখানে দর্শনার্থীরা দেখতে পাবেন। মণ্ডপের ভিতরে গুহার মধ্যে রাজপ্রাসাদ থাকবে। বাইরে গাছপালায় ঘেরা সুন্দর একটি পরিবেশ দেখা যাবে। দর্শনার্থীরা এক অনন্য অভিজ্ঞতা লাভ করবেন বলে আমরা আশা করছি।”
উল্লেখযোগ্য যে, এ বছর পুজোর বাজেট প্রায় ৩৫-৪০ লক্ষ টাকা। বাজেটের অধিকাংশ অর্থই মণ্ডপ নির্মাণে খরচ হবে। বিকি রায় বলেন, “আমাদের এখানে পুজো দেখতে অভাবনীয় ভিড় হয়। প্রতিদিনই ৭০-৮০ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। এক কথায়, ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের পক্ষে সমস্যার হয়ে দাঁড়ায়। প্রশাসনের নির্দেশিকা সম্পূর্ণভাবে মেনে পুজো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করব।”
উল্লেখযোগ্য যে, দুর্গাপুজোর মণ্ডপ নির্মাণের পাশাপাশি পদ্মশ্রী নুরউদ্দিন আহমেদের আরও বেশ কয়েকটি কাজ চলছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বর্তমানে আমরা নবগ্রহ মন্দিরের কাজ করছি। বটদ্রবা থান-এর কিছু কাজ বাকি রয়েছে, সেগুলিও করা হচ্ছে। বরপেটা সত্ৰের একটি কাজও আমরা করছি।”