মাটির প্রতিমায় ঐতিহ্যের প্রাণ, আমিনগাঁওয়ে পূর্বপুরুষের শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই সন্দীপ পালের

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 17 h ago
মাটির প্রতিমায় ঐতিহ্যের প্রাণ, আমিনগাঁওয়ে পূর্বপুরুষের শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই সন্দীপ পালের
মাটির প্রতিমায় ঐতিহ্যের প্রাণ, আমিনগাঁওয়ে পূর্বপুরুষের শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই সন্দীপ পালের
 
সুদীপ শর্মা চৌধুরী ও আরিফুল ইসলাম / গুয়াহাটি

মাটি দিয়ে শুধু দেবদেবীর প্রতিমাই গড়েন না তাঁরা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু সেই শিল্পকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে মৃৎশিল্পীদের প্রতিদিনই সংগ্রাম করতে হচ্ছে। নতুন নতুন নকশার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া থেকে শুরু করে আর্থিক অনিশ্চয়তা, প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জের শেষ নেই। ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত অসমের আমিনগাঁওয়ে পূর্বপুরুষের পেশাকে আপন করে নিয়ে সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সন্দীপ পাল।
 
পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের এই ঐতিহ্যবাহী পেশায় যোগ দেন সন্দীপ। বংশপরম্পরায় চলে আসা প্রতিমা নির্মাণের এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তাঁর লক্ষ্য। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদের চাহিদাও বদলেছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে পুজোর উদ্যোক্তারা নতুন নতুন নকশা নিয়ে আসেন। সেই চাহিদা পূরণ করতে শিল্পীদেরও ক্রমাগত নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হয়। ফলে এই পেশায় টিকে থাকতে অভিজ্ঞতা, ধৈর্য এবং নতুন কিছু শেখার মানসিকতা অত্যন্ত জরুরি।
 

"আওয়াজ-দ্য ভয়েস"-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে সন্দীপ পাল বলেন, “মায়ের প্রতিমা তৈরি করতে আমার খুব ভালো লাগে। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণ আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। যুগ যুগ ধরে আমার বাবা, ঠাকুরদা, প্রপিতামহ, সকলেই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে আমি ও আমার বাবা একসঙ্গে এই কাজ করছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পছন্দও বদলেছে। ক্রেতারা যেভাবে প্রতিমা চান, আমরা তাঁদের সেই চাহিদা অনুযায়ী প্রতিমা তৈরি করে দিই।”
 
“আমাদের মৃৎশিল্পীরা ভারতের অত্যন্ত প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছেন। আমাদের মতো শিল্পীদের সরকারের সাহায্য করা প্রয়োজন। বর্তমানে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিমা তৈরির জন্য যেসব উপকরণের প্রয়োজন হয়, সেগুলির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমরা যথেষ্ট সমস্যায় পড়ছি। সরকার যদি বিষয়গুলির দিকে নজর দেয়, তাহলে আমরা অবশ্যই উপকৃত হব,” বলেন সন্দীপ পাল।
 
সন্দীপের মতে, যাঁরা ভবিষ্যতে মৃৎশিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চান, তাঁদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শেখা শুরু করা উচিত। প্রথম থেকেই হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারলে আগামী দিনে পেশাগত চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলা করা সহজ হবে। কারণ, প্রতিমা তৈরির কাজ শুধু শিল্পীসত্তার প্রকাশ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জীবিকা নির্বাহের কঠিন বাস্তবতাও। দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউনেস্কোর স্বীকৃত দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রতিমা নির্মাণশিল্পও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখার অর্থ ঐতিহ্যের ধারাকেও সচল রাখা।
 
সন্দীপ পালের পিতা
 
“বিসর্জনের সময় আমাদের খুব কষ্ট হয়। অনেক দিন ধরে পরিশ্রম করে, যত্ন নিয়ে আমরা একটি প্রতিমা তৈরি করি। সেই প্রতিমা যখন বিসর্জন দেওয়া হয়, তখন আমরা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। বর্তমানে প্রতিমার চাহিদা যথেষ্ট বেড়েছে। বহু দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতারা আমাদের এখান থেকে প্রতিমা কিনতে আসেন। অনেকেই আগাম অর্ডার দিয়ে রাখেন। গুয়াহাটি মহানগরের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও চাংসারি, বাইহাটা, রঙিয়া, মঙলদৈ, মির্জা, আজারা প্রভৃতি জায়গা থেকে মানুষ আমাদের প্রতিমা কেনেন,” বলেন সন্দীপ পাল।
 
বর্তমানে সন্দীপ পালের কর্মশালায় ১২ জন কর্মী নিযুক্ত রয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রতিদিন আমরা ৭-১০টি প্রতিমা তৈরি করি। একটি প্রতিমা একদিনেই সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে একটি প্রতিমা গড়ে ওঠে। কখনও কখনও আবহাওয়া আমাদের কাজে বাধা সৃষ্টি করে। বৃষ্টি হলে কাজ করতে অসুবিধা হয়। তবে অর্ডার অনুযায়ী আমরা ক্রেতাদের সময়মতো প্রতিমা সরবরাহ করি। হাতে সময় কম থাকলে আমরা নতুন অর্ডার নিই না। কারণ, প্রতিমার গুণমানের উপর আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিই।”
 
কিন্তু শিল্পের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও আর্থিক নিরাপত্তার অভাব তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। সন্দীপের মতে, সরকারি প্রকল্প বা পর্যাপ্ত সহায়তা ছাড়াই শিল্পীদের নিজেদের উদ্যোগে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাই মৃৎশিল্পীদের জন্য সরকারি সাহায্য, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
 
সন্দীপ পালের তৈরি মাটির প্রতিমা
 
তাই সন্দীপের এই লড়াই শুধু নিজের পেশাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই নয়, বরং পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এই শিল্পকে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার এক জীবনসংগ্রাম। শিল্পীদের পাশে সরকার ও সমাজ এসে দাঁড়ালে মাটির প্রতিমায় প্রাণ সঞ্চার করার এই ঐতিহ্য যেমন বেঁচে থাকবে, তেমনই সুরক্ষিত হবে তাঁদের জীবন ও জীবিকাও।
 
উল্লেখ্য, সন্দীপ পাল মৃৎশিল্পের মাধ্যমে নিজের পরিবারের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখলেও তিনি তাঁর সন্তানদের কোনওভাবেই এই পেশা বেছে নেওয়ার জন্য চাপ দেন না। সন্তানরা যা করতে চায়, সেটিকেই নিজেদের পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারবে।


শেহতীয়া খবৰ