পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ী গবেষণার সঙ্গে আলিগড়ের যোগ, IceCube-এ কাজ করছেন AMU-র গবেষকরা
আওয়াজ দ্য ভয়েস / আলিগড়
নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে ভারতের নাম জড়িয়ে পড়া বরাবরই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তবে ২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার এবার আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়কেও (AMU) আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চার এই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। IceCube Neutrino Observatory-কে কেন্দ্র করে পরিচালিত গবেষণা এবং তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের অংশগ্রহণই আলিগড়ের সঙ্গে এই সাফল্যের যোগসূত্র তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অধ্যাপক ফ্রান্সিস হেলজেন। IceCube Neutrino Observatory-তে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর এই পুরস্কার ঘোষণা করে।
এই খবরের সঙ্গে আলিগড়েরও সরাসরি যোগ রয়েছে। AMU-র পদার্থবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত গবেষকরা IceCube DeepCore-এর মাধ্যমে নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যা নিয়ে কাজ করছেন। প্রকাশিত গবেষণার নথিতে IceCube সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত গবেষণায় অনুজ কুমার উপাধ্যায় এবং গোপাল গর্গের নাম পাওয়া যায়। জে. কৃষ্ণমূর্তিও IceCube DeepCore-সম্পর্কিত গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।
এই সাফল্য আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ IceCube মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণের এক নতুন পথ খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন আর শুধু আলো বা রেডিও তরঙ্গের সাহায্যেই মহাকাশকে পর্যবেক্ষণ করেন না। নিউট্রিনোর মাধ্যমেও মহাবিশ্বের দূরবর্তী এবং অত্যন্ত শক্তিশালী উৎস সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
নোবেল পাওয়ার বহু আগেই শুরু হয়েছিল এই কাহিনি
অধ্যাপক ফ্রান্সিস হেলজেন কয়েক দশক আগে এমন একটি ধারণা দিয়েছিলেন, যা সেই সময় অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলে মনে করা হয়েছিল। তাঁর ধারণা ছিল, দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ ও বিশাল বরফের স্তরকে নিউট্রিনো শনাক্ত করার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
নিউট্রিনো অত্যন্ত ক্ষুদ্র উপপরমাণবিক কণা। পদার্থের সঙ্গে এদের মিথস্ক্রিয়া খুবই দুর্বল। সেই কারণেই এই কণাগুলিকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। এগুলি পৃথিবী এবং আমাদের শরীরের মধ্য দিয়েও অনায়াসে চলে যেতে পারে।
কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে এই বৈশিষ্ট্যই শক্তিতে পরিণত হয়েছে। নিউট্রিনো যখন পদার্থের সঙ্গে খুব কমই সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন তারা তাদের উৎস সম্পর্কে প্রায় সরাসরি তথ্য বহন করতে পারে। সেই কারণেই বিজ্ঞানীরা এই কণাগুলিকে মহাবিশ্বের দূরবর্তী স্থানে ঘটে চলা হিংস্র ও শক্তিশালী ঘটনার বার্তাবাহক হিসেবে দেখেন।
হেলজেনের সেই ভাবনা পরবর্তীকালে IceCube Neutrino Observatory-তে রূপ নেয়। দক্ষিণ মেরুর বরফের প্রায় এক ঘনকিলোমিটার এলাকায় হাজার হাজার আলোক-সংবেদী সেন্সর বসানো হয়। কোনও নিউট্রিনো বরফের মধ্যে থাকা পরমাণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করলে অত্যন্ত ক্ষীণ আলোর সৃষ্টি হতে পারে। IceCube-এর সেন্সরগুলি সেই সংকেতই রেকর্ড করে।
মহাবিশ্বের নতুন জানালা খুলে দিয়েছে IceCube
IceCube-এর নির্মাণকাজ ২০১১ সালে সম্পূর্ণ হয়। এরপর থেকে এই পর্যবেক্ষণকেন্দ্র উচ্চশক্তির নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১৩ সালে IceCube এমন উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর প্রমাণ দেয়, যেগুলি আমাদের সৌরজগতের বহু দূরের উৎস থেকে এসেছিল। এরপর বিজ্ঞানীরা এই কণাগুলির সম্ভাব্য উৎস খুঁজে বের করার কাজ আরও জোরদার করেন।
২০১৭ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। IceCube একটি উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করে এবং তার উৎসের দিক অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি সক্রিয় গ্যালাক্টিক নিউক্লিয়াস (AGN)-এর সন্ধান পাওয়া যায়। একই সময়ে ওই উৎস থেকে গামা রশ্মির বিকিরণেও সক্রিয়তা দেখা গিয়েছিল। এর ফলে নিউট্রিনো এবং মহাকাশের অত্যন্ত শক্তিশালী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলির মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে বিজ্ঞানীরা সাহায্য পান। এই ঘটনাই নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন পরিচিতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আলিগড়ের গবেষকদের ভূমিকা
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করছে। AMU-র সরকারি নথিতে অধ্যাপক মহম্মদ সজ্জাদ আথারকে বিভাগের প্রধান এবং নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যার বিশেষজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভাগের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির মধ্যে নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যাও রয়েছে।
AMU-র গবেষক অনুজ কুমার উপাধ্যায়ের নাম IceCube-সম্পর্কিত গবেষণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণায় IceCube DeepCore-এর সাহায্যে পৃথিবীর অভ্যন্তরে পদার্থের প্রভাব এবং বায়ুমণ্ডলীয় নিউট্রিনোর দোলন নিয়ে অধ্যয়ন করা হয়েছে। এই গবেষণায় তাঁকে IceCube সহযোগিতার হয়ে কাজ করতে দেখা যায়।
গোপাল গর্গও IceCube DeepCore-সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন। ২০২৬ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণায় নিউট্রিনোর দীর্ঘ-পাল্লার মিথস্ক্রিয়া নিয়ে অধ্যয়ন করা হয়েছে। তাঁর গবেষণার নথিতে AMU এবং ভুবনেশ্বরের ইনস্টিটিউট অফ ফিজিক্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার উল্লেখ রয়েছে।
ইনস্টিটিউট অফ ফিজিক্সের ওয়েবসাইটেও গোপাল গর্গের গবেষণাকে IceCube সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাঁর গবেষণার বিষয় হল, IceCube DeepCore-এ বায়ুমণ্ডলীয় নিউট্রিনোর সাহায্যে নতুন পদার্থবিদ্যার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা।
জে. কৃষ্ণমূর্তির নামও IceCube DeepCore-সম্পর্কিত গবেষণায় উঠে এসেছে। অনুজ কুমার উপাধ্যায় এবং অন্যান্য গবেষকের সঙ্গে তিনিও পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন ও বৈশিষ্ট্য বুঝতে নিউট্রিনোর দোলন নিয়ে গবেষণা করেছেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আলিগড়ের কাছে এই খবর শুধুমাত্র নোবেল পুরস্কারের খবর নয়। এটি এমন এক গবেষণা-পরম্পরার স্বীকৃতিও, যেখানে নিউট্রিনোর মতো জটিল বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা হচ্ছে।
অধ্যাপক সজ্জাদ আথারের গবেষণা কর্মসূচি
AMU-র অধ্যাপক মহম্মদ সজ্জাদ আথার নিউট্রিনো ও কণা পদার্থবিদ্যার পরিচিত গবেষকদের মধ্যে অন্যতম। AMU-র সরকারি প্রোফাইলে তাঁর বিশেষজ্ঞতার ক্ষেত্র হিসেবে নিউক্লিয়ার ও কণা পদার্থবিদ্যা এবং নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যার উল্লেখ রয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক নিউট্রিনো প্যানেল এবং একাধিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন।
AMU-র পদার্থবিদ্যা বিভাগ DUNE, MINERvA, NuSTEC-সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার সঙ্গেও যুক্ত। এর থেকে বোঝা যায়, আলিগড়ে নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যা শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠ্য বিষয় নয়। এখানকার গবেষণার সঙ্গে বিশ্বের বড় বড় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষারও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
নিউট্রিনো এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
সাধারণ পাঠকের মনে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। নিউট্রিনোকে প্রায়শই ‘ঘোস্ট পার্টিকল’ বা ‘ভূতকণা’ বলা হয়। এর কারণ, এই কণাগুলি পদার্থের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। প্রতি মুহূর্তে বিপুল সংখ্যক নিউট্রিনো পৃথিবীর মধ্য দিয়ে চলে যায়। কিন্তু তাদের শনাক্ত করা সহজ নয়।
এই কারণেই IceCube-এর মতো বিশাল পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের প্রয়োজন হয়। দক্ষিণ মেরুর বরফকে একটি বিশাল ডিটেক্টর বা শনাক্তকরণ যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হাজার হাজার সেন্সর নিউট্রিনোর বিরল মিথস্ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট আলোর সংকেত রেকর্ড করে।
এই কণাগুলির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা সুপারনোভা, সক্রিয় ছায়াপথ এবং কৃষ্ণগহ্বরের আশপাশে ঘটে চলা অত্যন্ত শক্তিশালী ঘটনাগুলি বুঝতে পারেন। অর্থাৎ, সাধারণ আলো দিয়ে যে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন, নিউট্রিনো আমাদের সেই মহাবিশ্ব সম্পর্কেও তথ্য দিতে পারে।
AMU-র কাছে এই খবর কেন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ?
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণা-পরম্পরা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগও নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যাকে তার প্রধান গবেষণার ক্ষেত্রগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিভাগের ওয়েবসাইটে নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যা-সম্পর্কিত একাধিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উল্লেখ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সিস হেলজেনের নোবেল পুরস্কার লাভ এবং একই বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার সঙ্গে AMU-র গবেষকদের যুক্ত থাকা আলিগড়ের জন্য গর্বের বিষয়। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি—নোবেল পুরস্কারটি পেয়েছেন ফ্রান্সিস হেলজেন।
AMU-র গবেষকরা নোবেল পুরস্কার পাননি। তাঁদের কৃতিত্ব হল, তাঁরা সেই আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং তার সঙ্গে যুক্ত গবেষণায় অংশ নিচ্ছেন, যা নিউট্রিনো বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই পার্থক্যটি বুঝলেই খবরটির যথাযথ প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয়।
ভবিষ্যতের পথ আরও বিস্তৃত
IceCube-এর গবেষণার কাহিনি এখনও শেষ হয়নি। বিজ্ঞানীরা এর উন্নত সংস্করণ তৈরির কাজও করেছেন। নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হল কম শক্তির নিউট্রিনোকে আরও ভালোভাবে শনাক্ত করা এবং সেগুলির আগমনের দিক আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা। ভবিষ্যতে প্রস্তাবিত IceCube Gen2 প্রকল্পের মাধ্যমে এই ডিটেক্টরের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এর অর্থ স্পষ্ট, নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান এখনও বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আর এই গবেষণার কাহিনিতে আলিগড়ের ভূমিকাও আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
প্রশ্ন ও উত্তর
২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার কে পেয়েছেন?
অধ্যাপক ফ্রান্সিস হেলজেন ২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। IceCube Neutrino Observatory-তে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে।
IceCube কী?
এটি দক্ষিণ মেরুর বরফের মধ্যে তৈরি একটি বিশাল নিউট্রিনো শনাক্তকরণ যন্ত্র। এর আয়তন প্রায় এক ঘনকিলোমিটার।
এর সঙ্গে AMU-র কী সম্পর্ক রয়েছে?
AMU-র গবেষকরা IceCube DeepCore-সম্পর্কিত নিউট্রিনো গবেষণায় অবদান রাখছেন। অনুজ কুমার উপাধ্যায় এবং গোপাল গর্গের গবেষণায় IceCube সহযোগিতার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
নিউট্রিনোকে ‘ঘোস্ট পার্টিকল’ বা ‘ভূতকণা’ বলা হয় কেন?
কারণ, এই কণাগুলি পদার্থের সঙ্গে খুব কম মিথস্ক্রিয়া করে এবং বিপুল সংখ্যায় পৃথিবীর মধ্য দিয়ে চলে যেতে পারে।
এই সাফল্যের আলিগড়ের কাছে কী গুরুত্ব রয়েছে?
এই ঘটনা AMU-র নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণের পরিধি তুলে ধরে।