কলকাতা
বিধানসভায় সম্প্রতি পাস হওয়া ‘গুন্ডাদমন বিল’-এর পর রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ দমনে কড়া অবস্থানের আবহের মধ্যেই বারুইপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের মামলার অন্যতম অভিযুক্তের পুলিশি অভিযানে মৃত্যু ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন রাজ্য পুলিশের দুই অফিসার অর্ঘ্য মণ্ডল ও রনি সরকার। পুলিশ সূত্রের দাবি, অভিযুক্তের হামলার মুখে পড়ে আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালাতে বাধ্য হন তাঁরা।
পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, বুধবার ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে দুই অফিসারই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, নাবালিকাকে যৌন নির্যাতন ও খুনের ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে নিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সূর্যপুরের নাচনগাছা গ্রামে যাওয়া হয়েছিল। সেই সময় আচমকাই প্রভাস পুলিশ অফিসার রনি সরকারের কোমর থেকে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেয় এবং পালানোর চেষ্টা করে।
জবানবন্দি অনুযায়ী, অভিযুক্তকে আটকানোর চেষ্টা করলে সে পুলিশকে লক্ষ্য করে একটি গুলি চালায়। রনি সরকার দ্রুত মাথা নিচু করে প্রাণে রক্ষা পান। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বুঝেই অপর অফিসার অর্ঘ্য মণ্ডল নিজের সার্ভিস রিভলভার থেকে পরপর দু'রাউন্ড গুলি চালান। একটি গুলি অভিযুক্তের বুকের ডান দিকের নিচে এবং অন্যটি কোমরের উপরের অংশে লাগে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কিছুটা দূর দৌড়ে যাওয়ার পর প্রভাস মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
পুলিশের দাবি, ঘটনার পর গুরুতর আহত অবস্থায় প্রভাস প্রাণভিক্ষা চেয়ে বারবার "বাঁচান স্যার" বলে চিৎকার করছিল। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন।
ঘটনার বিষয়ে রাজ্য পুলিশের আইজি (প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ) কঙ্করপ্রসাদ বারুই, জেলা পুলিশ সুপার এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের উপস্থিতিতে ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে ঘটনাস্থলের পুনর্নির্মাণ ও প্রাথমিক তদন্তের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
রনি সরকার বর্তমানে ক্যানিং থানার আইসি। এর আগে তিনি নরেন্দ্রপুর, বারুইপুর ও জয়নগর-সহ একাধিক থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন। কনস্টেবল হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে দক্ষতার ভিত্তিতে সাব-ইন্সপেক্টর পদে উন্নীত হন তিনি।
অন্যদিকে, ২০১৪ ব্যাচের অফিসার অর্ঘ্য মণ্ডল বর্তমানে বারুইপুর থানার অ্যান্টি-রাউডি (গুন্ডাদমন) শাখার দায়িত্বে রয়েছেন। জয়নগর, সোনারপুর ও কুলতলি থানায় দীর্ঘদিন কাজ করার পাশাপাশি তিনি বারুইপুর এসওজি-র ইনচার্জ হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন।
এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা মেনে এই পুলিশি গুলিকাণ্ডে একটি এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) নাকি সিআইডি নেবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের বাধ্যতামূলক তদন্ত ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনাটি মানবাধিকার কমিশনকেও জানানো হবে। পাশাপাশি দুই পুলিশ অফিসারের ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। নিহত প্রভাস মণ্ডলের রক্তের নমুনা, আঙুলের ছাপ এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা অন্যান্য আলামত সংরক্ষণ করে তদন্তের স্বার্থে পরীক্ষা করা হবে।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে পুলিশের দাবি, এটি ছিল সম্পূর্ণ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর ঘটনা; অন্যদিকে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখার ওপর জোর দিচ্ছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।