জেবা নাসিম / মুম্বাই
২০০০-এর দশকের শুরুতে গানের রিয়্যালিটি শোগুলি ভারতীয় সঙ্গীতের জগতে নতুন এক যুগের সূচনা করেছিল। এই মঞ্চ থেকেই একাধিক গায়ক রাতারাতি তারকা হয়ে ওঠেন। তাঁদের মধ্যে কেউ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে দীর্ঘ কেরিয়ার গড়েছেন, আবার কেউ বা কোটি মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার পর ধীরে ধীরে সরে গিয়েছেন প্রচারের আলো থেকে।
কাশ্মীরি গায়ক কাজি তৌকির রিয়্যালিটি টেলিভিশনের সেই প্রথম দিকের যুগেরই একজন শিল্পী, যিনি এখনও ১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের গোড়ার দিকে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। সেই সময়ের বহু স্কুল ও কলেজ পড়ুয়ার কাছে তাঁর গান ‘ইয়ে পল’ হয়ে উঠেছিল এক আবেগের সঙ্গীত, যা যেন গোটা একটি প্রজন্মের অনুভূতিকে ধারণ করেছিল।
'Bigg Boss 20' - এর মঞ্চে কাজি তৌকির সালমান খানের সঙ্গে
২০০৫ সালে ‘ফেম গুরুকুল’ (Fame Gurukul) শো জেতার প্রায় দুই দশক পর, ৪০ বছর বয়সি শ্রীনগরের এই গায়ক ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬-এ ‘বিগ বস ২০’ (Bigg Boss)-এর নতুন সিজন শুরু হওয়ার সময় ১৬ জন মূল প্রতিযোগীর একজন হিসেবে ঘরে প্রবেশ করেন। কালার্স টিভি ও জিওহটস্টারে সম্প্রচারিত এই সিজনের সঞ্চালক সলমন খান।
‘ছোটবেলায় আমি বিজ্ঞানী ছিলাম’, এমন দাবি-সহ তাঁর রসিক মন্তব্য এবং তাঁর প্রাণবন্ত, বড়সড় ব্যক্তিত্ব দর্শকদের হাসাচ্ছে ও নানা আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। পাশাপাশি র্যাপার ইয়ুং ডিএসএ এবং অভিনেত্রী কানিকা মান্নের সঙ্গে শুরুর দিকের সংঘাত শো-তে উত্তেজনাও বাড়িয়ে তুলেছে। কেউ তাঁকে স্বতঃস্ফূর্ত বিনোদনদাতা হিসেবে দেখুন বা তাঁর আচরণকে অতিরঞ্জিত মনে করুন, দ্বিতীয় দিন থেকেই কাজি তৌকিরের উপস্থিতি শো-টিকে অনেকটা তাঁর ব্যক্তিগত মঞ্চের মতো করে তুলেছে।
নতুন সিজনের প্রিমিয়ার হয় রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর। বলিউড অভিনেতা সলমন খান আবারও সঞ্চালকের ভূমিকায় ফিরেছেন। ‘এক্সট্রা জীবন দান’ থিমকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে এই সিজন, যেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের ব্যক্তিত্বরা অংশ নিয়েছেন। শো-তে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় ঘোষণা করা হয়, “প্রতিযোগী নম্বর ৩, কাজি তৌকির! আইকনিক ‘আফগান জালেবি’-র কণ্ঠ। কী অসাধারণ কণ্ঠ! কী দুর্দান্ত এন্ট্রি!”
কাজি তৌকিরের জন্য ‘বিগ বস’-এর ঘরে প্রবেশ প্রায় ২০ বছর পর মূলধারার টেলিভিশনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তন। একই সঙ্গে এটি সারা দেশের দর্শকদের সঙ্গে ফের সংযোগ স্থাপনের এবং নতুন প্রজন্মের কাছে নিজের ব্যক্তিত্ব ও শিল্পীসত্তাকে তুলে ধরার একটি সুযোগও এনে দিয়েছে।
তাঁর প্রত্যাবর্তন কাশ্মীরেও বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে অনুসরণ করা হচ্ছে। শ্রীনগরের এক তরুণ গায়ক থেকে জাতীয় স্তরের রিয়্যালিটি শো-এর বিজয়ী হয়ে ওঠার তাঁর যাত্রা এখনও বহু মানুষের কাছে গর্বের বিষয়।
শ্রীনগরে জন্ম নেওয়া কাজি তৌকির কাশ্মীরের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তাঁর বাবা এম. এ. কাজি ছিলেন একজন সুফি সাধক ও আইনজীবী, যিনি তাঁর মধ্যে শিল্প ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি করেছিলেন। পরিবারেও সঙ্গীতের চর্চা ছিল; তাঁর কাকা কাজি রাফি কাশ্মীরের একজন পরিচিত গায়ক ছিলেন।
ছোটবেলা থেকেই গান গাওয়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় কাজির। তিনি ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের সঙ্গে সমকালীন শৈলীর মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর স্বতন্ত্র শিল্পী-পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। তাঁর লম্বা চুল এবং ব্যতিক্রমী চেহারাও জনপ্রিয় হয়ে ওঠার আগেই তাঁকে অন্যান্য উদীয়মান গায়কের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
২০০৫ সালে কাজি তৌকির সনি এন্টারটেনমেন্ট টেলিভিশনের ‘ফেম গুরুকুল’-এর অডিশন দেন। এটি ছিল ভারতের প্রথম দিকের অন্যতম বড় গানের রিয়্যালিটি শো। এই প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিভাবান গায়কেরা অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অরিজিৎ সিং, যিনি পরবর্তীকালে বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। রূপ রেখা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন এই প্রতিযোগিতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রতিযোগী।
কাজির শক্তিশালী কণ্ঠ, আবেগঘন গায়নশৈলী এবং দর্শকদের সঙ্গে সহজে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা খুব দ্রুতই তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। শেষ পর্যন্ত তিনি রূপ রেখা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথভাবে ‘ফেম গুরুকুল’-এর শিরোপা জয় করেন এবং প্রায় রাতারাতি ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
তাঁর এই জয় শুধু একটি রিয়্যালিটি শো জয়ের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; বরং এর মাধ্যমে তিনি জাতীয় সঙ্গীত জগতে একটি পরিচিত মুখ হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করেন। তাঁর মায়াবী কণ্ঠ, বৈচিত্র্যময় গায়নশৈলী এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব তাঁকে একনিষ্ঠ অনুরাগীদের একটি বড় পরিসর এনে দেয়। অরিজিৎ সিংয়ের মতো গায়কদেরও যে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে দেখা গিয়েছিল, সেই প্রতিযোগিতায় তাঁর সাফল্য আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের মধ্যে স্মরণীয় এবং আলোচিত।
‘ফেম গুরুকুল’-এর পর কাজি তৌকিরকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল অনেক। তিনি প্লেব্যাক গায়ন ও অভিনয়ের ক্ষেত্রে সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন এবং বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করার স্বপ্ন দেখেন।
পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পীজীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি উল্লেখযোগ্য গান হল ২০১৫ সালের ছবি ‘ফ্যান্টম’-এর জনপ্রিয় গান ‘আফগান জালেবি’। ‘বিগ বস ২০’-এর মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর জাতীয় টেলিভিশনের আলোয় তাঁর ফিরে আসা সেই গায়কের যাত্রার আরও একটি নতুন অধ্যায়, যার স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও ব্যক্তিত্ব এখনও একটি গোটা প্রজন্মের স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে।