“পুজোয় আমিষ নয়! নিদান ঘিরে উত্তাল বাংলা, শমিক বললেন—‘বাঙালি কী খাবে, বাঙালিই ঠিক করবে’”
দেবকিশোর চক্রবর্তী
পুজো মানেই বাঙালির কাছে শুধু ধূপ-ধুনো, মন্ত্রোচ্চারণ কিংবা অঞ্জলি নয়। পুজো মানে উৎসব, পরিবার, আড্ডা আর অবশ্যই খাবার। সেই খাবারের তালিকায় কোথাও নিরামিষ, কোথাও আবার মাছ-মাংস—দুই-ই বাঙালির দীর্ঘদিনের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে। তাই পুজোর সময় ‘আমিষ খাওয়া যাবে না’—এমন নিদান ঘিরে বিতর্ক তৈরি হওয়া হয়তো খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।
সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের নাগেশ্বরধামের এক ‘বাবার’ এমনই একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বাঙালি মহলে শুরু হয় তীব্র আলোচনা। পুজোর সময় আমিষ খাবার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ ঘিরে প্রশ্ন উঠতে থাকে—বাঙালির খাদ্যাভ্যাস এবং ধর্মাচরণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আদৌ কার?
বিতর্ক যখন ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, তখনই মুখ খুলেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, “এটা বিবেকানন্দের বাংলা। পশ্চিমবঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহ্যের ওপর উঠতে গেলে তা বিপজ্জনক। বাঙালি কী খাবে, সেটা বাঙালিই ঠিক করবে।”
এই বক্তব্য যেন আচমকাই আলোচনাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।কারণ, বাঙালির ধর্মীয় জীবন কখনও একরৈখিক নয়। এই বাংলায় একদিকে যেমন নিরামিষ ভোগ, উপবাস, অঞ্জলি ও কঠোর আচার রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে মাছের প্রতি গভীর ভালোবাসা। দুর্গাপুজোর ভোগের খিচুড়ি যেমন বাঙালির আবেগ, তেমনই পুজোর ছুটিতে বাড়ির রান্নাঘরে মাছের ঝোলও বহু পরিবারের ঐতিহ্যের অংশ।
আর এখানেই বাঙালির স্বাতন্ত্র্য
বাংলার ধর্মাচরণ বহু শতাব্দী ধরে স্থানীয় সংস্কৃতি, লোকাচার এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে তৈরি হয়েছে। কারও কাছে পুজো মানে নিরামিষ, কারও কাছে পুজোর দিনেও পারিবারিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা। কেউ উপবাস করেন, কেউ করেন না। কেউ মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করেন, কেউ বাড়িতে পুজো করেন। বিশ্বাসের এই বৈচিত্র্যই তো বাংলার সামাজিক চরিত্রের অন্যতম পরিচয়।
স্বামী বিবেকানন্দের ভাবনাতেও মানুষের স্বাধীনতা, যুক্তিবোধ ও উদারতার বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। তাঁর বাংলা কোনও একটি নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস বা আচারের মধ্যে আটকে থাকা বাংলা নয়; বরং প্রশ্ন করার, নিজের মতো করে ভাবার এবং অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করার বাংলা।
তাই ‘বাঙালি কী খাবে’—এই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু মাছ-মাংস বনাম নিরামিষের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, সংস্কৃতির বহুত্ব এবং নিজের জীবনযাপন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।
ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা। সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে কেউ নিরামিষ খাবেন, কেউ আমিষ খাবেন না—এটি তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের উপর বাইরের কোনও আচরণ বা খাদ্যনির্দেশ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।
বাংলার ইতিহাসও সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়
এই মাটিতে রামকৃষ্ণ পরমহংস থেকে বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল—বিভিন্ন মনীষীর চিন্তায় ধর্ম কখনও কেবল নিষেধের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং মানুষের মধ্যে ঐক্য, সহনশীলতা এবং বৃহত্তর মানবিকতার কথাই সামনে এসেছে।
তাই পুজোর সময় বাঙালির পাতে মাছ থাকবে কি থাকবে না—এই সিদ্ধান্ত কোনও ‘বাবা’, কোনও রাজনৈতিক দল কিংবা কোনও বাইরের নির্দেশের বিষয় হওয়ার কথা নয়। সেটা নির্ভর করবে ব্যক্তি ও পরিবারের বিশ্বাস, রীতি এবং পছন্দের উপর।
শমিক ভট্টাচার্যের বক্তব্য সেই জায়গাটিকেই সামনে এনে দিয়েছে—বাংলার সংস্কৃতিকে বুঝতে হলে বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য ও মানসিকতাকে বুঝতে হবে।
পুজো আসলে আনন্দের উৎসব। সেখানে কারও পাতে খিচুড়ি, কারও পাতে মাছ—দুইয়ের মধ্যেই যদি নিজের বিশ্বাস ও আনন্দ থাকে, তবে সেই বৈচিত্র্যকেই সম্মান করাই হয়তো বাঙালিয়ানার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
কারণ শেষ পর্যন্ত বাঙালির পাতে কী থাকবে, তার থেকেও বড় প্রশ্ন—বাঙালি নিজের পছন্দের অধিকারটুকু ধরে রাখতে পারবে কি না।
আর সেই অধিকারেই হয়তো লুকিয়ে আছে বিবেকানন্দের সেই উদার বাংলার প্রকৃত চেতনা—যেখানে বিশ্বাস থাকবে, ভক্তি থাকবে, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাটুকুও থাকবে।