এক হাতে কাস্তে, অন্য হাতে বই, পড়াশুনার দিনগুলো এভাবেই কেটেছে। বীরভূমের নলহাটি থানার প্রত্যন্ত কুখুড়া গ্রামের সাধারণ এক যুবকের সাফল্য নিয়ে এখন তোলপাড় গোটা দেশে। ইউজিসি-নেটে আরবিতে দেশের সেরা হয়ে আবদুল হামিদ গোটা বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছে।
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
এক হাতে কাস্তে, অন্য হাতে বই, পড়াশুনার দিনগুলো এভাবেই কেটেছে। বীরভূমের নলহাটি থানার প্রত্যন্ত কুখুড়া গ্রামের সাধারণ এক যুবকের সাফল্য নিয়ে এখন তোলপাড় গোটা দেশে। ইউজিসি-নেটে আরবিতে দেশের সেরা হয়ে আবদুল হামিদ গোটা বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছে।
কখনও বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে হাত লাগানো তো কখনও গরু-ছাগল চরানো ছিল রোজনামচা। তারপরও নিজের পড়াশুনায় কখনও থমকে যেতে দেননি। অর্থাভাবের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও প্রতিবার সব প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে এই ইতিহাস গড়েছেন বীরভূমের মেধাবী ছাত্র আবদুল হামিদ। ২০২৬-এর ইউজিসি-নেট (UGC-NET) পরীক্ষায় আরবি বিষয়ে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করেছেন হামিদ।
একশ শতাংশ স্কোর অর্জন করেছেন তিনি। ৩ শত নম্বরের মধ্যে ২৬৬ পেয়ে ১৬৪৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে শীর্ষ স্থান দখল করে অর্জন করেছেন জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ (JRF) ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হওয়ার যোগ্যতা। যে রেজাল্ট হয়েছে তাতে বহু শিক্ষাবিদ বলছেন, কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতা না থাকলে এই স্থান অর্জন করা অসম্ভব।
পরিবার সূত্রে খবর, বীরভূমের মেধাবী ছাত্র আবদুল হামিদের পথচলা কখনও মসৃণ ছিল না। বাবা আব্দুত তোয়াব গ্রামের পরিচিত আলেম। প্রায় দুই দশক ধরে মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্রে (এমএসকে) স্বল্প বেতনে শিক্ষকতা করছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি বছরের বিভিন্ন সময়ে কৃষিকাজ করে চালাতে হয় সংসার। আব্দুল হামিদের মা মাসুদা বিবি গৃহিণী। প্রথাগত শিক্ষাজীবন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হলেও সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কতটা, তা বোঝা গেল ছেলের এই সাফল্যে।
আবদুল হামিদের কথা থেকে জানা যায়, মায়ের কাছেই বাংলা, ইংরেজি ও আরবির প্রাথমিক পাঠ নিয়ে গ্রাম্য মাদ্রাসার গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষায় গিয়েছেন হামিদ। ২০১৭-য় আলিম ও ২০১৯-এ ফাজিল পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্যের পর কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক অর্জন করেন। এরপর দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া থেকে ৮.৭৫ CGPA পেয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। রামকৃষ্ণ মিশন থেকেও আয়ত্ত করেন ইংরেজি ভাষার দক্ষতা। তাঁর সহজ সরল ব্যক্তিত্ব যেন তাঁর প্রতিভাকে আরও কয়েক কদম এগিয়ে নিয়ে গেছে।
জানা গেছে, সাময়িক অর্থকষ্ট ও জীবনের নানা টানাপোড়েনে পড়ে গিয়ে মাঝে পড়াশোনায় ছেদ পড়েছিল তাঁর। তবে ২০২৫-এ বিয়ের পর স্ত্রী ও শ্বশুরের উৎসাহে ফের নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেন আবদুল। অর্থাভাব জাঁকিয়ে বসলেও লক্ষ্য স্থির রেখে কোনো দামি কোচিং ছাড়াই সিউড়ির কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন এই মেধাবী ছাত্র। আবদুলের কথায়, একটি মসজিদে ইমামতি করার পাশাপাশি ইউটিউব সহ কয়েকটি বই ও নিজস্ব নোটসের ওপর ভরসা রেখেই দিনের পর দিন চলেছে রাত জেগে পড়াশোনা। অবশেষে ২৮ আগস্ট ফল প্রকাশ হতেই মুখে চওড়া হাসি ফুটেছে। বলা ভালো, আবদুলের অদম্য ইচ্ছা আর পরিশ্রমের কাছে হার মেনেছে সব প্রতিবন্ধকতা।
ভবিষ্যতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় বা জেএনইউ (JNU) থেকে পিএইচডি করে আরবি ভাষায় উচ্চতর গবেষণা করতে চান আবদুল হামিদ। তিনি মনে করেন, যদি মানসিক প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম এবং লক্ষ্যের প্রতি সততা থাকে তবে কোচিং ছাড়াও সফলতা পাওয়া যায়।