শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
একটা গ্রামের নাম শুনলেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠত অন্ধকারের ছবি। অশিক্ষা, দারিদ্র্য আর অপরাধের নানা কাহিনিতে জড়িয়ে গিয়েছিল গ্রামের পরিচয়। এমনকী নিজের গ্রামের নাম বলতেও অস্বস্তি বোধ করতেন অনেকে। সেই পুনিশোলই এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। আর সেই বদলের প্রতীক হয়ে উঠেছেন গ্রামেরই তরুণ কালিমুল্লা মণ্ডল। সর্বভারতীয় স্তরের নিট পরীক্ষায় সাফল্য পেয়ে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
ওন্দা ব্লকের পুনিশোল বাঁকুড়ার অন্যতম বড় গ্রাম। সংখ্যালঘু-প্রধান এই এলাকায় বহু মানুষের জীবন এখনও অর্থনৈতিক অনটনের সঙ্গে লড়াই করে। বহু পরিবার নির্ভরশীল হকারি কিংবা ভিন্ রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজের উপর। নিজস্ব কৃষিজমি নেই অধিকাংশ পরিবারের। দীর্ঘদিন শিক্ষার সুযোগ ও সঠিক দিশার অভাবও ছিল প্রকট।
এই পরিস্থিতিতেই কয়েক দশক আগে গ্রামের কিছু মানুষের অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা পুনিশোলের নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জুড়ে দেয় নেতিবাচক একটি পরিচয়। ‘বাঁকুড়ার চম্বল’—এমন তকমাও জুটেছিল গ্রামের কপালে। কিন্তু সময় বদলেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন না এলেও শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরে ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে গ্রামের নতুন প্রজন্ম।
কালিমুল্লার সাফল্য সেই পরিবর্তনেরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।পুনিশোল বোর্ড হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্র কালিমুল্লা ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৬৪৬ নম্বর পান। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানাচ্ছেন, এখনও পর্যন্ত ওই স্কুলের সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত পড়ুয়া তিনি। পরে বাঁকুড়া বঙ্গ বিদ্যালয় থেকে ২০২৫ সালে ৪৪০ নম্বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন। উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় থেকেই নিটের প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। মূলত অনলাইন ক্লাসের উপর নির্ভর করেই এগিয়েছেন তিনি।
কালিমুল্লা মণ্ডল
নিটে তাঁর সর্বভারতীয় র্যাঙ্ক ৫ লক্ষ ৮৪ হাজার এবং রাজ্যের র্যাঙ্ক ৮ হাজার। এই ফলের সুবাদেই বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।কালিমুল্লার পথটা অবশ্য সহজ ছিল না। ছোট থেকেই তিনি ৬০ শতাংশ বিশেষভাবে সক্ষম। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে নিজের স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেননি। বরং সেটিকেই প্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
কালিমুল্লার কথায়, “অনলাইনে ক্লাস করতাম। প্রতিবন্ধকতা আমার ক্ষেত্রে বাধা হয়নি। বরং আমাকে মোটিভেট করেছে।”ছেলের সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত বাবা-মা। প্রাক্তন সরকারি কর্মী বুয়ালি কলন্দর মণ্ডলের নবম সন্তান কালিমুল্লা। বাবা মনে করেন, পুনিশোলে প্রতিভার অভাব নেই। অভাব মূলত সঠিক দিশা ও সুযোগের। তাঁর কথায়, গ্রামের অনেক মেধাবী ছেলে-মেয়ে রয়েছে। কিন্তু গাইডের অভাব এবং ঠিকমতো কোচিংয়ের সুযোগ না পাওয়ায় তারা পিছিয়ে পড়ে।
প্রাক্তন শিক্ষক বিবেকরঞ্জন মাজির চোখেও কালিমুল্লার সাফল্য শুধু একজন পড়ুয়ার সাফল্য নয়, বরং একটি গ্রামের মানসিক পরিবর্তনের সূচনা। তাঁর কথায়, পুনিশোল বললেই একসময় মানুষের মনে অন্ধকার জগতের ছবি ভেসে উঠত। কালিমুল্লার সাফল্য সেই অন্ধকার থেকে আলোর পথে গ্রামের আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার প্রমাণ। আগামী দিনে ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখা গ্রামের পড়ুয়াদের কাছে কালিমুল্লাই অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবেন বলে তাঁর বিশ্বাস।
কালিমুল্লা মণ্ডল
গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর খানও মনে করেন, বদলটা চোখে পড়ার মতো। একসময় পুনিশোলের পরিচয় দিতে অস্বস্তি হত। এখন সেই জায়গায় এসেছে গর্ব।কালিমুল্লা নিজেও অবশ্য নিজের সাফল্যকে খুব বড় করে দেখতে নারাজ। বরং তাঁর চিন্তা গ্রামের অন্য পড়ুয়াদের নিয়ে। তাঁর মতে, পুনিশোলের খারাপ দিকটাই এতদিন মানুষের কাছে বেশি পরিচিত হয়েছে। গ্রামের অনেক ভালো দিকও রয়েছে, যা সামনে আসেনি। শিক্ষার অভাব এখনও রয়েছে বলেই মনে করেন তিনি।
তাই গ্রামের পড়ুয়াদের জন্য তাঁর বার্তাও সরল—লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে, কোনওভাবেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া চলবে না। আর সৎভাবে পরিশ্রম করে যেতে হবে।একসময় যে গ্রামের নামের সঙ্গে জুড়ে ছিল অন্ধকারের গল্প, আজ সেই গ্রামেরই এক তরুণের সাফল্যের গল্প বলছে অন্য কথা। কালিমুল্লার হাতে এখন শুধু মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ নয়, রয়েছে একটি গ্রামের পরিচয় বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাও। পুনিশোলের নতুন প্রজন্মের কাছে তাই তাঁর সাফল্য নিছক একটি নিট-ফল নয়—অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক প্রতীকী পদক্ষেপ।