উত্তমের মঞ্চে মুছে গেল দূরত্ব, এক ফ্রেমে বাংলা ছবির তিন মহাতারকা

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 2 h ago
উত্তমের মঞ্চে মুছে গেল দূরত্ব, এক ফ্রেমে বাংলা ছবির তিন মহাতারকা
উত্তমের মঞ্চে মুছে গেল দূরত্ব, এক ফ্রেমে বাংলা ছবির তিন মহাতারকা
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষের শেষ দিনের মঞ্চ যেন হয়ে উঠল বাংলা চলচ্চিত্রের এক আবেগঘন পুনর্মিলন। যেখানে অতীতের দূরত্ব, অভিমান কিংবা রাজনৈতিক পরিসরের বিভাজনকে ছাপিয়ে সামনে এল একটাই পরিচয়—বাংলা সিনেমা। একই মঞ্চে মিঠুন চক্রবর্তী, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দেব এবং জিৎ। আর তাঁদের সকলকে যেন অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রাখলেন একজনই—মহানায়ক উত্তম কুমার।
 
চার দিন ধরে মহানায়ককে ঘিরে চলেছে নানা অনুষ্ঠান। স্মৃতিচারণ, গান, আলোচনা, চলচ্চিত্রের নানা মুহূর্ত—সব মিলিয়ে কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিসর বারবার ফিরে দেখেছে সেই মানুষটিকে, যিনি শুধু অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন বাঙালির আবেগের নাম। কিন্তু জন্মশতবর্ষের শেষ দিনের মঞ্চে যে ছবি তৈরি হল, তার তাৎপর্য যেন আরও গভীর।
 
এক ফ্রেমে বাংলা চলচ্চিত্রের একাধিক প্রজন্মের জনপ্রিয় মুখ। মঞ্চে মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তী, ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম প্রবীণ মুখ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, তারকা দেব এবং জিৎ। দর্শকদের কাছে মুহূর্তটি তাই শুধুই একটি অনুষ্ঠান নয়, হয়ে উঠল প্রতীকী এক দৃশ্য।একসময় যে দূরত্বকে বাংলা চলচ্চিত্রের পরিসরে চোখে পড়ার মতো মনে করা হত, সেই দূরত্বই যেন মহানায়কের সামনে এসে হারিয়ে গেল।
 
মিঠুন চক্রবর্তীর উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানের আবেগকে আরও বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিনের অভিনয়জীবনে বাংলা ও সর্বভারতীয় সিনেমায় নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। ‘মহাগুরু’ হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ রাজনৈতিক পালাবদলের নানা সময়ে তাঁর সঙ্গে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরের সম্পর্ক নিয়েও নানা আলোচনা হয়েছে।
 
কিন্তু উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে সেই সব হিসাব যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি মনে করিয়ে দিল—শিল্পীর পরিচয় শেষ পর্যন্ত শিল্পেই। রাজনীতি কিংবা সময়ের টানাপোড়েনের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে বাংলা সংস্কৃতির বড় মঞ্চে আবারও স্বমহিমায় দেখা গেল মিঠুনকে।একইভাবে নজর কেড়েছে জিৎ-এর উপস্থিতিও। বাংলা ছবির অন্যতম জনপ্রিয় সুপারস্টার জিৎ সাধারণত নিজের কাজ এবং পর্দার উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পছন্দ করেন। তাঁকে নিয়ে নানা সময়ে নানা জল্পনা থাকলেও প্রকাশ্য সাংস্কৃতিক মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি সবসময় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।আর এবার সেই জিৎ-ই এলেন একেবারে অন্য আবহে। পাশে প্রসেনজিৎ, দেব এবং মিঠুন। ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়ল বাংলা চলচ্চিত্রের একাধিক সময়ের প্রতিনিধি।
 
 
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তো দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা ছবির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এক প্রজন্মের কাছে তিনি যেমন নায়ক, তেমনই পরের প্রজন্মের কাছে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতার প্রতীক। আর দেব বাংলা ছবির নতুন প্রজন্মের অন্যতম বড় মুখ। তাঁদের সঙ্গে একই মঞ্চে জিৎ—এই দৃশ্য তাই নিছক তারকাদের সমাবেশ নয়, বরং বাংলা সিনেমার বিভিন্ন প্রজন্মের একসঙ্গে দাঁড়ানোর ছবি।আর সেই ছবির কেন্দ্রে না থেকেও সবচেয়ে বেশি উপস্থিত ছিলেন উত্তম কুমার।
 
কারণ মহানায়কের মাহাত্ম্য এখানেই। তিনি চলে গিয়েছেন বহু বছর আগে, কিন্তু তাঁর নাম এখনও এমন একটি শক্তি, যা বাঙালিকে এক জায়গায় দাঁড় করাতে পারে। তাঁর জন্মশতবর্ষের মঞ্চে তাই ব্যক্তিগত পরিচয়, তারকাখ্যাতি কিংবা পুরনো দূরত্বের চেয়ে বড় হয়ে উঠল বাংলা সিনেমার সামগ্রিক পরিচয়।
 
শেষ দিনের অনুষ্ঠানে মঞ্চ যেন সত্যিই ‘মঞ্চ’ থাকল না। হয়ে উঠল বাংলা চলচ্চিত্রের আবেগের মিলনস্থল। দর্শকদের উচ্ছ্বাস, তারকাদের উপস্থিতি এবং উত্তম কুমারকে ঘিরে স্মৃতিচারণ—সব মিলিয়ে তৈরি হল এক বিশেষ মুহূর্ত।এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় বার্তাটিও সম্ভবত এখানেই—বাংলা সিনেমাকে আলাদা আলাদা ঘরে ভাগ করে রাখা যায় না।
 
সময়ের সঙ্গে শিল্পে প্রজন্ম বদলেছে। নায়ক বদলেছেন, দর্শকের রুচি বদলেছে, সিনেমার ভাষা বদলেছে। কিন্তু উত্তম কুমারের প্রতি বাঙালির ভালোবাসা বদলায়নি। সেই ভালোবাসাই যেন এবার চারদিনের অনুষ্ঠান শেষে সবাইকে একই মঞ্চে এনে দাঁড় করাল।মিঠুন থেকে প্রসেনজিৎ, জিৎ থেকে দেব—প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আলাদা ইতিহাস, আলাদা দর্শক, আলাদা সময়। কিন্তু মহানায়কের সামনে এসে সেই পার্থক্যগুলো যেন মিলেমিশে গেল একটিমাত্র পরিচয়ে—আমরা বাংলা সিনেমার মানুষ।
 
এ যেন উত্তম কুমারের শতবর্ষে মহানায়কের কাছ থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রকে দেওয়া এক শেষ উপহার—ভেদাভেদ নয়, একসঙ্গে এগিয়ে চলার ছবি।
চার দিনের অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। আলো নিভেছে মঞ্চের। দর্শকরাও হয়তো ধীরে ধীরে ফিরে গিয়েছেন নিজেদের ঘরে। কিন্তু শেষ দিনের সেই ছবি থেকে যাবে দীর্ঘদিন।এক ফ্রেমে মিঠুন, প্রসেনজিৎ, দেব আর জিৎ।আর তাঁদের পিছনে, দৃশ্যমান না হয়েও সবচেয়ে উজ্জ্বল উপস্থিতি—মহানায়ক উত্তম কুমার।শতবর্ষ পেরিয়েও যিনি শুধু মহানায়ক নন, বাংলা সিনেমাকে এক করে দেওয়ার এক অমোঘ নাম।