দিল্লিতে শব্দদূষণের প্রতিবাদ করায় মণিপুরি সঙ্গীতশিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার ৭

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 h ago
দিল্লিতে শব্দদূষণের প্রতিবাদ করায় মণিপুরি সঙ্গীতশিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার ৭
দিল্লিতে শব্দদূষণের প্রতিবাদ করায় মণিপুরি সঙ্গীতশিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার ৭

নয়াদিল্লি:

বাড়ির সামনে ধাবায় উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও হইচইয়ের প্রতিবাদ করায় দিল্লিতে এক মণিপুরি সঙ্গীতশিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহতের নাম চোংথম বিক্রম সিং। বয়স ৫৪ বছর। গত ১৭ বছর ধরে দিল্লিতে বেসরকারি সঙ্গীতশিক্ষক হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। রবিবার গভীর রাতে কিলোকরি গ্রামের বাড়ির সামনে ঘটনাটি ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও সোমবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর।

এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত সাতজন প্রাপ্তবয়স্ককে গ্রেফতার করেছে দিল্লি পুলিশ। পাশাপাশি ১৫ বছরের এক কিশোরকেও আটক করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং স্থানীয় সূত্রের তথ্য ব্যবহার করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

 

ঘটনার সূত্রপাত রবিবার রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ। কিলোকরি গ্রামের একটি বহুতলের তৃতীয় তলায় স্ত্রী জোশনা চোংথম এবং ২০ বছরের ছেলে ইয়াইফাবা চোংথমের সঙ্গে থাকতেন বিক্রম সিং। মণিপুরি সমাজকর্মী বি রুচিদা শর্মার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাতে বাড়ির বাইরে আবর্জনা ফেলতে তৃতীয় তলা থেকে নিচে নেমেছিলেন তিনি। সেই সময় বাড়ির কাছে থাকা দুটি ধাবার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মীকে উচ্চস্বরে কথা বলা ও হইচই করতে দেখেন।

অভিযোগ, বিক্রম সিং তাঁদের এই শব্দ ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে আপত্তি জানান। বিষয়টি নিয়ে প্রথমে বচসা শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্রম সিং যখন নিজের বাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন একদল ব্যক্তি তাঁকে ধাওয়া করে বলে অভিযোগ।

রুচিদা শর্মার দাবি, অভিযুক্তরা তাঁকে তাড়া করে তৃতীয় তলা পর্যন্ত উঠে যায়। এরপর বাড়ির করিডরে তাঁকে ঘিরে ধরে মারধর করা হয়। একাধিক ব্যক্তি মিলে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে সেখান থেকে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ।

ঘটনার পর রাত ১টা ৩৮ মিনিট নাগাদ দিল্লি পুলিশ খবর পায়। বিক্রমের ছেলে তাঁকে দ্রুত ওখলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। তাঁর অবস্থা গুরুতর ছিল। পরে সোমবার সকাল প্রায় ৭টা নাগাদ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন রুচিদা শর্মা।

ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে। সেই ফুটেজে আটজনকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে দেখা যায়। অভিযোগ, হামলার পরেই তারা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। এই ফুটেজ-সহ অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়।

গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ১৯ বছরের ভারত কুমার, ২৬ বছরের প্রমোদ, ২২ বছরের রমজান খান, ৩৬ বছরের বিজয়, ২১ বছরের দীপাংশু, ৩২ বছরের মোহন বিশ্বকর্মা এবং ২৬ বছরের মান্নু। পুলিশের দাবি, অভিযুক্তদের মধ্যে চারজন কাছের ধাবায় ডেলিভারি কর্মী হিসেবে এবং দু’জন প্যাকেজিং কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। মান্নু একটি পিৎজা কিয়স্কে কাজ করতেন বলে জানা গিয়েছে।

এই ঘটনায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩(২) এবং ৩(৫) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাঁচ বা তার বেশি মানুষের একটি দল নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একসঙ্গে হত্যাকাণ্ড ঘটালে ১০৩(২) ধারা প্রযোজ্য হয়। অন্যদিকে ৩(৫) ধারা একাধিক ব্যক্তির অভিন্ন উদ্দেশ্যে সংঘটিত অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ঘটনার পর প্রাক্তন মণিপুরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি দিল্লি পুলিশকে দ্রুত এবং যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে তদন্ত সম্পূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

কংগ্রেস সাংসদ পবন খেরাও এই ঘটনাকে শুধুমাত্র মদ্যপ অবস্থায় হঠাৎ হিংসার ঘটনা হিসেবে দেখার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চস্বরে গান-বাজনা, প্রকাশ্যে হইচই এবং নিয়ম না মানার প্রবণতার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, বিক্রম সিংকে যে ব্যাট দিয়ে মারা হয়েছে তা হয়তো সরকারের হাতে ছিল না, কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি হওয়ার দায় সরকার এড়াতে পারে না।

কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈও বিক্রম সিংয়ের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন। তিনি বিক্রমকে শান্ত স্বভাবের, সঙ্গীতপ্রেমী একজন মানুষ হিসেবে স্মরণ করে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং ন্যায়বিচারের দাবি করেছেন।

সোমবার সন্ধ্যায় কিলোকরি গ্রামে প্রায় ১০০ জন মানুষ মোমবাতি মিছিল করেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে দিল্লিতে বসবাসকারী উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

মণিপুরের বাসিন্দা বিক্রম সিং দিল্লিতে দীর্ঘদিন ধরে সঙ্গীতচর্চা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একজন গিটারবাদক এবং সঙ্গীতশিক্ষক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল। কিন্তু বাড়ির সামনে শব্দ ও হইচইয়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হল তাঁকে। পুলিশ এখন ঘটনার সম্পূর্ণ ক্রম, হামলার প্রকৃত কারণ এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।