পরিচালক ও উত্তম কুমারের মৃত্যুর ছায়ায় তৈরি ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’, মুক্তির পরও কেন ব্যর্থ হয়েছিল ছবি?

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
পরিচালক ও উত্তম কুমারের মৃত্যুর ছায়ায় তৈরি ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’, মুক্তির পরও কেন ব্যর্থ হয়েছিল ছবি?
পরিচালক ও উত্তম কুমারের মৃত্যুর ছায়ায় তৈরি ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’, মুক্তির পরও কেন ব্যর্থ হয়েছিল ছবি?

কলকাতা:

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কিছু ছবি শুধু গল্প বা অভিনয়ের জন্য নয়, বরং নির্মাণের নেপথ্যে ঘটে যাওয়া একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনার জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকে। উত্তম কুমার, শর্মিলা ঠাকুর, সুপ্রিয়া দেবী, মিঠুন চক্রবর্তী, সন্তু মুখোপাধ্যায়, সমিত ভঞ্জ, অসিতবরণ ও লিলি চক্রবর্তী অভিনীত ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ তেমনই এক ছবি। ড. নীহাররঞ্জন গুপ্তের গল্প অবলম্বনে পীযূষ বসুর পরিচালনায় তৈরি এই ছবির সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন আর ডি বর্মন।

ছবিটির নির্মাণপর্বেই ঘটে যায় বড় বিপর্যয়। শুটিং চলাকালীন পরিচালক পীযূষ বসুর মৃত্যু হয়। এরপর ছবিটি শেষ করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন উত্তম কুমার। কিন্তু ছবির কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই প্রয়াত হন মহানায়কও। মাত্র কয়েকটি দৃশ্যের শুটিং বাকি থাকলেও উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর ছবির কাজ দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত ১৯৮১ সালের আগস্টে মুক্তি পায় ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’। সেই সময় উত্তম কুমারের প্রয়াণে গোটা বাংলা শোকস্তব্ধ। স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়েছিল, মহানায়কের শেষদিকের এই ছবিকে ঘিরে দর্শকদের আবেগ বিপুল সাড়া ফেলবে। কিন্তু বাস্তবে ছবিটি বক্স অফিসে সাফল্য পায়নি।

ছবির গল্প মূলত জমিদারি প্রথা, অত্যাচার, নিষিদ্ধ প্রেম ও প্রতিশোধের পুরনো কাঠামোকে কেন্দ্র করে। উত্তম কুমার অভিনয় করেন অত্যাচারী জমিদার রাজশেখরের চরিত্রে। তাঁর স্ত্রী সুরেশ্বরী দেবীর ভূমিকায় সুপ্রিয়া দেবী। অন্যদিকে শর্মিলা ঠাকুর দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন—অপর্ণা এবং কঙ্কাবতী। অপর্ণার প্রেম রঘুবীরের সঙ্গে, যার চরিত্রে সন্তু মুখোপাধ্যায়। রাজশেখর তাঁদের সম্পর্ক মেনে নিতে না পেরে রঘুবীরকে বন্দি করার চেষ্টা করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যুর জন্যও রাজশেখর দায়ী হন।

এরপর অপর্ণার সন্তান কঙ্কাবতীকে রাজশেখরের প্রাসাদে লুকিয়ে রাখা হয়। বহু বছর পরে রাজশেখরের ছেলে শশাঙ্কের সঙ্গে কঙ্কাবতীর প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। শশাঙ্কের চরিত্রে ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। অতীতের অপরাধ ও বর্তমানের সম্পর্কের সংঘাত থেকেই ছবির শেষপর্বে তৈরি হয় আবেগঘন নাটকীয় পরিস্থিতি।

তবে ছবিটির অন্যতম বড় সমস্যা ছিল সময়ের সঙ্গে গল্পের অসামঞ্জস্য। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তনের পর বাংলা সিনেমায় তখন শহুরে জীবন, বেকারত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক অস্থিরতা ও সমকালীন বাস্তবতা গুরুত্ব পাচ্ছে। সেই সময়ে জমিদার-নির্যাতন ও নিষিদ্ধ প্রেমকেন্দ্রিক চেনা মেলোড্রামা অনেকটাই পুরনো বলে মনে হয়েছিল।

অভিনয়শিল্পীদের তালিকা অবশ্য ছবিটিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছিল। বিশেষ করে উত্তম কুমারের রাজশেখর চরিত্রটি একজন নৈতিকভাবে জটিল ও ত্রুটিপূর্ণ মানুষের গভীর মনস্তত্ত্ব তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করতে পারত। কিন্তু চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত অনেকটাই প্রচলিত অত্যাচারী জমিদারের আদলে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। শর্মিলা ঠাকুরের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় তুলনামূলকভাবে বেশি সম্ভাবনাময় হলেও ছবির মেলোড্রামাটিক কাঠামো সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।

ছবিটির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য হয়ে ওঠে আর ডি বর্মনের সঙ্গীত। ‘বেঁধেছি বীণা’, ‘না না কাছে এসো না’ এবং বিশেষ করে ‘আধো আলো ছায়াতে’-র মতো গান ছবির সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে আজও শ্রোতাদের মনে জায়গা করে রয়েছে। অনেকের কাছেই ছবির সঙ্গীতই ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’-র সবচেয়ে স্মরণীয় দিক।

উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষের আবহে ছবিটির দিকে ফিরে তাকালে তার নির্মাণ ইতিহাস আরও বেশি আবেগঘন হয়ে ওঠে। পরিচালক পীযূষ বসুর মৃত্যু, এরপর উত্তম কুমারের নিজে ছবিটি শেষ করার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরও প্রয়াণ—সব মিলিয়ে ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ বাংলা সিনেমার এক অদ্ভুত ট্র্যাজিক অধ্যায়ের সাক্ষী।

আজ ছবিটিকে নিখুঁত ক্লাসিকের চেয়ে বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে। একদিকে বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি শিল্পীদের সমাবেশ, অন্যদিকে আর ডি বর্মনের স্মরণীয় সঙ্গীত—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা গল্প ছবিটিকে বাঁচাতে পারেনি। যেন দুই যুগের মাঝখানে আটকে থাকা এক চলচ্চিত্র—উত্তম কুমার যেখানে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ সেখানে রয়ে গিয়েছিল অতীতের ছায়ায়।