কাশ্মীরের পাহাড়-ঘেরা উপত্যকায় একসময় নারীদের সঙ্গীতচর্চা ছিল সামাজিক কুসংস্কার, নিষেধাজ্ঞা ও রক্ষণশীলতার কঠোর বেড়াজালে আবদ্ধ। সেই সমাজেই আজ এক নারীর কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয় সাহস, স্বপ্ন আর সাফল্যের প্রতীক হয়ে। তিনি শাহি মুমতাজ, যিনি সঙ্গীতজগৎ এবং তাঁর অনুরাগীদের কাছে "কাশ্মীরের লতা মঙ্গেশকর" নামে সমাদৃত। নিজের কোমল ও সুরেলা কণ্ঠে তিনি কাশ্মীরি লোকসঙ্গীত ও সুফিয়ানা কালামকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি, নারীদের সঙ্গীতচর্চা থেকে দূরে রাখার বহুদিনের সামাজিক রীতিনীতিকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ভেঙে দিয়েছেন।
যখন শাহি মুমতাজ সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন তাঁকে একটি রক্ষণশীল সমাজের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেই সময় কাশ্মীরের বহু মানুষ মনে করতেন, একজন মহিলার মঞ্চে উঠে অনুষ্ঠান পরিবেশন করা গ্রহণযোগ্য নয়। জীবনের সেই অধ্যায়ের কথা বলতে গিয়ে মুমতাজ খোলাখুলিভাবে জানিয়েছেন, কীভাবে সমাজ, আত্মীয়স্বজন, এমনকি তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষদের কাছ থেকেও তাঁকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। বিরোধিতা এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, পরিবারের কিছু ঘনিষ্ঠ সদস্য তাঁর সঙ্গে কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। নিজের শিল্পীসত্তার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে তাঁকে আপনজনদের বিরুদ্ধেই দীর্ঘ এবং মানসিকভাবে ক্লান্তিকর এক লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছিল।
শিল্পীদের প্রায়ই গোপনে নিজেদের প্রতিভা লালন করতে হতো, কিন্তু একজন নারী হওয়ার কারণে মুমতাজের সংগ্রাম ছিল আরও কঠিন। তবুও তিনি কখনও পিছিয়ে যাননি। বরং সমাজের উপহাসকেই তিনি নিজের শিল্পীজীবনের যাত্রার শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। মুসলিম সমাজে, বিশেষ করে কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কাঠামোর মধ্যে নারীদের জন্য সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা কখনও সহজ ছিল না। তাঁর পরিবারে সঙ্গীতের কোনো ঐতিহ্য ছিল না, ঘরে কোনো পরামর্শদাতা ছিলেন না, এমনকি শিল্পচর্চাকে উৎসাহিত করার মতো পরিবেশও ছিল না।
প্রকৃতি শাহি মুমতাজকে এমন এক অসাধারণ কণ্ঠস্বর উপহার দিয়েছিল, যা কখনও লুকিয়ে থাকতে রাজি ছিল না। ছোটবেলায় তিনি সঙ্গীতের কারিগরি দিক সম্পর্কে কিছুই জানতেন না, কিন্তু ভারতের কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তিনি প্রায়ই নিজেকে বাথরুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখতেন, একটি স্টিলের গ্লাস হাতে নিয়ে সেটিকে মাইক্রোফোন ভেবে লতা মঙ্গেশকরের গান প্রাণভরে গাইতেন।
স্কুলজীবনে বন্ধুদের সঙ্গে অন্তাক্ষরী খেলতে গিয়ে সবাই তাঁর গান শুনে বিস্মিত হয়ে যেত। তাঁরা বলতেন, তাঁর কণ্ঠ একেবারেই সাধারণ নয় এবং তাঁর আসল জায়গা মুম্বই। সেই কথাগুলোই তাঁর মনে এমন এক স্বপ্নের বীজ বপন করেছিল, যা ধীরে ধীরে জীবনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
একটি অনুষ্ঠানে শাহি মুমতাজ
মুমতাজের জীবনের সবচেয়ে ইতিবাচক অধ্যায় শুরু হয়েছিল প্রখ্যাত কাশ্মীরি সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক রাজা বিলালের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর। বিয়ের আগে তিনি প্রায়ই মজা করে বলতেন, তিনি ইতিমধ্যেই "সঙ্গীতকে বিয়ে করেছেন" এবং আর কোনো মানুষকে বিয়ে করবেন না। কিন্তু ভাগ্যের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। সেটিই তাঁকে এমন একজন মানুষের কাছে নিয়ে যায়, যিনি হয়ে ওঠেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস।
বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই হয়ে ওঠে তাঁর প্রকৃত "সঙ্গীতের পরিবার"। রাজা বিলাল শুধু একজন সহায়ক স্বামীই নন, বরং একজন নিবেদিতপ্রাণ পথপ্রদর্শক হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করেন। যখনই সামাজিক চাপের কারণে মুমতাজ গান ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতেন, তখনই তিনি দৃঢ়ভাবে তাঁর পাশে দাঁড়াতেন। তিনি সবসময় তাঁকে উৎসাহ দিতেন এবং বলতেন, তিনি পবিত্রতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে গান গেয়ে চলেছেন, তাঁর কণ্ঠস্বর ঈশ্বরের উপহার, যা কখনও ত্যাগ করা উচিত নয়।
"কাশ্মীরের লতা মঙ্গেশকর" উপাধিটি শাহি মুমতাজকে এমনিই দেওয়া হয়নি। এর পেছনে রয়েছে এক গভীর আবেগঘন মুহূর্ত। রেডিও কাশ্মীরের প্রবীণ কর্মকর্তা এবং প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক প্রয়াত গুলাম নবী শেখ যখন প্রথমবার তাঁর গান শুনেছিলেন, তখন তাঁর চোখ অশ্রুতে ভরে উঠেছিল।
তিনি মন্তব্য করেছিলেন, শাহি মুমতাজের গান শুনে তাঁর মনে হয়েছে, যেন লতা মঙ্গেশকর নিজেই কাশ্মীরের উপত্যকায় পুনর্জন্ম নিয়েছেন। আজও সেই কথাগুলো স্মরণ করলে মুমতাজ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। যখনই তিনি লতা মঙ্গেশকরের কালজয়ী গান "তেরা সাথ হ্যায় তো মুঝে ক্যা কমি হ্যায়" পরিবেশন করেন, দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে যান।
শাহি মুমতাজের লাভ করা সন্মাননা
শাহি মুমতাজ কাশ্মীরের প্রথম পেশাদার মহিলা শিল্পী, যিনি শিশুদের জন্য ঐতিহ্যবাহী এবং সমসাময়িক, উভয় ধরনের কাশ্মীরি ঘুমপাড়ানি গান রেকর্ড করেছেন। প্রখ্যাত কাশ্মীরি কবি সাগর নাজির রচিত এমনই একটি ঘুমপাড়ানি গান, মুমতাজের মাতৃসুলভ কণ্ঠের উষ্ণতা ও মমতায় অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
আজও কাশ্মীরে কোনো ট্র্যাজেডি বা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে, অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে শ্রদ্ধাঞ্জলি ভিডিওতে সেই ঘুমপাড়ানি গানটিকেই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করেন। একজন মায়ের বেদনা ও অনুভূতির এই হৃদয়স্পর্শী প্রকাশ আজও অসংখ্য মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
তাঁর অন্যান্য প্রশংসিত কাজের মধ্যে রয়েছে রাজা বিলালের সঙ্গে গাওয়া 'রাওয়ান যশোধন' এবং শহীদ শবনমের কবিতার একাধিক সঙ্গীতায়োজন, যা এখনও সামাজিক মাধ্যমে ট্রেন্ডিং। তাঁর প্রতিভা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী লেখক সৈয়দ আমির জাফরের উর্দু গজলের অ্যালবাম 'বহরে তরন্নুম'-এ তাঁর কণ্ঠ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। কাশ্মীরের প্রথম রিমিক্স অ্যালবাম 'সাদা'-তেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছিলেন, যা তাঁর জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
ক্রমবর্ধমান খ্যাতির পরও শাহি মুমতাজ অত্যন্ত ব্যক্তিগত জীবনযাপন করতে ভালোবাসেন। তিনি নিজের জন্মতারিখ ও শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ ব্যক্তিগত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পছন্দ করেন না। বরং তিনি চান, তাঁর শিল্পই যেন তাঁর প্রকৃত পরিচয় হয়ে ওঠে।
শাহি মুমতাজ
বর্তমানে তাঁর দুই সন্তানই তাঁর সবচেয়ে বড় অনুরাগীদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর ছেলে প্রতি রাতে মায়ের মুখে ঘুমপাড়ানি গান শুনেই ঘুমিয়ে পড়ে। এই মুহূর্তটিকেই মুমতাজ যেকোনো পুরস্কার বা সম্মানের চেয়েও বেশি মূল্যবান বলে মনে করেন।
আগামী দিনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শাহি মুমতাজের কণ্ঠে সমৃদ্ধ একাধিক নতুন সঙ্গীত প্রকল্প প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রখ্যাত কবি বশীর জোগিয়ারি, ড. আমিন তাবিশ এবং সাগর নাজিরের সৃষ্টিকর্ম।
শাহি মুমতাজের জীবনযাত্রা প্রমাণ করে, অটল দৃঢ়সংকল্প সামাজিক রক্ষণশীলতার সবচেয়ে অন্ধকার কোণকেও আলোকিত করতে পারে। তাঁর গল্প শুধু কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়ই নয়, বরং নিজের স্বপ্ন পূরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আগামী প্রজন্মের নারী শিল্পীদের জন্যও এক উজ্জ্বল পথপ্রদর্শক।