দেবকিশোর চক্রবর্তী
ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ ৩ সেপ্টেম্বর। হিসেব বলছে, ১৯২৬-এর এই দিনেই কলকাতায় জন্মেছিলেন অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। বাংলা সিনেমা তাঁকে পরে চিনেছে অন্য নামে—উত্তম কুমার। আর বাঙালি? বাঙালি তাঁকে শুধু চিনেনি, নিজের করে নিয়েছে।
আজ তাঁর জন্মের একশো বছর। একশো বছর!
একজন অভিনেতার জন্মশতবর্ষে সাধারণত তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা, পুরস্কার, জনপ্রিয়তা, সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেব কষা হয়। উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে সেই হিসেব যেন অসম্পূর্ণ। কারণ উত্তম কুমারের গল্প আসলে একজন অভিনেতার গল্প নয়; এটি একটি সময়ের গল্প, একটি শহরের গল্প, একটি জাতির আবেগের গল্প।
আর সেই কারণেই শতবর্ষে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা নতুন করে করা যায়—উত্তম কুমারকে আমরা আসলে কতটা চিনি?
অরুণ থেকে উত্তম—শুরুটা মোটেই রূপকথার ছিল না
আজকের চোখে উত্তম কুমারের জীবনকে অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্প মনে হয়। কিন্তু শুরুটা ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। একের পর এক ছবিতে ব্যর্থতা, দর্শকের প্রত্যাখ্যান, পরিচিতি তৈরি করতে দীর্ঘ অপেক্ষা—কোনওটাই তাঁকে থামাতে পারেনি।১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ। কিন্তু তখনও তিনি ‘মহানায়ক’ তো দূরের কথা, নিশ্চিত নায়কও নন। বহু ছবির ব্যর্থতার পর ধীরে ধীরে তৈরি হল সেই মুখ, সেই কণ্ঠ, সেই শরীরী ভাষা—যাকে একদিন বাঙালি নিজের নায়ক বলে গ্রহণ করবে।
আজকের প্রজন্মের কাছে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে—যে মানুষটির নাম একদিন বাংলা ছবির সাফল্যের সমার্থক হয়ে উঠেছিল, তাকেও একসময় নিজেকে প্রমাণ করার জন্য লড়তে হয়েছিল। জন্মশতবর্ষের আগে উত্তমকে স্মরণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম, নিষ্ঠা এবং পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করেছেন।
উত্তম-সুচিত্রা: প্রেমের চেয়েও বড় এক সাংস্কৃতিক ঘটনাউত্তম কুমারকে নিয়ে কথা হবে, অথচ সুচিত্রা সেনের নাম আসবে না—এ অসম্ভব।
‘সাড়ে চুয়াত্তর’ যেন একটি দরজা খুলে দিয়েছিল। তারপর ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘সাগরিকা’, ‘পথে হল দেরী’—পর্দায় উত্তম-সুচিত্রা হয়ে উঠলেন বাঙালির প্রেমের নিজস্ব ভাষা।তাঁদের জনপ্রিয়তার রহস্য শুধু সৌন্দর্য বা রোম্যান্টিক দৃশ্যে ছিল না। ছিল চোখের অভিনয়ে, নীরবতায়, সংলাপের আগের মুহূর্তে, অভিমানে। দু’জন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়ালেই দর্শক বুঝে যেত—এখানে একটা গল্প শুরু হতে চলেছে।
এই জুটিকে অনুকরণ করার চেষ্টা বহুবার হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় উত্তম-সুচিত্রা আর তৈরি হয়নি। কারণ জুটি তৈরি হয় শুধু দুই অভিনেতা দিয়ে নয়; তৈরি হয় সময়, দর্শক, পর্দা এবং এক অদ্ভুত সামাজিক আবেগের মিলনে।কিন্তু উত্তম শুধু রোম্যান্টিক নায়ক ছিলেন না।এখানেই লুকিয়ে আছে উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় রহস্য।
যাঁরা তাঁকে শুধু ‘রোম্যান্টিক হিরো’ বলে থামিয়ে দেন, তাঁরা উত্তমের অর্ধেকও দেখেননি।‘নায়ক’-এর অরিন্দম মুখোপাধ্যায়কে মনে করুন। রাতের ট্রেন। পাশে অপরিচিত মানুষ। সাফল্যের আড়ালে অপরাধবোধ। তারকার জীবনের ভেতরের ভয়। নিজের জনপ্রিয়তার সঙ্গে নিজেরই দ্বন্দ্ব।
এই চরিত্রে উত্তম যেন নিজের তারকা-সত্তাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন।সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ তাই উত্তম কুমারের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। সেখানে মহানায়কের চকচকে মুখোশের পিছনে দেখা যায় এক ক্লান্ত, দ্বিধাগ্রস্ত, আত্মজিজ্ঞাসায় আক্রান্ত মানুষকে।প্রধানমন্ত্রীও জন্মশতবর্ষের আগে ‘নায়ক’-এ উত্তমের অভিনয়ের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেছেন।সৌমিত্রের উত্তম: প্রতিদ্বন্দ্বী নন, দাদা।
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে ‘উত্তম বনাম সৌমিত্র’ একটি বহুচর্চিত প্রসঙ্গ। কিন্তু দুই অভিনেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকে তাকালে সেই দ্বন্দ্ব অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে উত্তমকে বলেছিলেন তাঁর “ভীষণ বড় বন্ধু” এবং “দাদা”। এমনকি মৃত্যুর শোকের সঙ্গে অন্য কোনও অভিজ্ঞতার তুলনা করা কঠিন বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
এই একটি তথ্যই অনেক প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেয়।কারণ দুই মহান অভিনেতাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে আমরা যে প্রতিযোগিতার গল্প বানিয়েছি, তাঁদের নিজেদের সম্পর্ক হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি মানবিক ছিল।একজন তৈরি করেছিলেন তারকার অন্য সংজ্ঞা। অন্যজন অভিনয়ের অন্য ব্যাকরণ। বাংলা সিনেমা দু’জনকেই পেয়েছিল—এটাই ছিল সৌভাগ্য।
ব্যোমকেশ থেকে অ্যান্টনি—আরও এক উত্তম
‘চিড়িয়াখানা’-র ব্যোমকেশকে দেখলে কি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর সেই উত্তমকে মনে পড়ে?না।‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-তে কি ‘হারানো সুর’-এর রোম্যান্টিক নায়ককে খুঁজে পাওয়া যায়?না।আর সেখানেই অভিনেতা উত্তমের জয়।তিনি জানতেন জনপ্রিয়তা কীভাবে তৈরি করতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে জানতেন, জনপ্রিয়তার খাঁচা ভাঙতেও হয়।
‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-র চরিত্রে তাঁর অন্য শরীরী ভাষা, অন্য উচ্চারণ, অন্য জীবনবোধ। ‘নায়ক’-এ একেবারে অন্য মানুষ। ‘চিড়িয়াখানা’-য় রহস্যের কেন্দ্রে দাঁড়ানো গোয়েন্দা। আবার ‘সপ্তপদী’-তে প্রেম ও ধর্মের সংঘাতের মধ্যে আটকে থাকা কৃষ্ণেন্দু।
একজন অভিনেতার ভিতরে এতগুলো মানুষ—এটাই উত্তমের বড় সম্পদ।ক্যামেরার সামনে থামেননি,উত্তম কুমারের আরেক পরিচয় আজ অনেকটাই বিস্মৃত—তিনি শুধু অভিনেতা ছিলেন না।পরিচালনা করেছেন, প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, সিনেমা নির্মাণের নানা দিক নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। ‘বন পলাশীর পদাবলী’ তাঁর সৃষ্টিশীল উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।অর্থাৎ, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে হাততালি পাওয়াই তাঁর শেষ লক্ষ্য ছিল না। তিনি সিনেমাকে ভিতর থেকেও বুঝতে চেয়েছিলেন।
সম্ভবত সেই কারণেই তাঁর অভিনয়ের মধ্যে পরিচালকসুলভ সচেতনতা দেখা যায়—কোথায় থামতে হবে, কোথায় চোখ নামাতে হবে, কোথায় সংলাপ না বলেও দৃশ্যকে নিজের করে নিতে হবে।
আজকের উত্তম: প্রসেনজিৎ থেকে নতুন প্রজন্ম
সময়ের সঙ্গে বাংলা সিনেমার নায়ক বদলেছে। তবু উত্তমের প্রভাব মুছে যায়নি।প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, মিঠুন চক্রবর্তী, জিৎ, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত থেকে আজকের প্রজন্ম—উত্তমের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে বহু শিল্পীর উপস্থিতিই দেখিয়ে দেয়, তাঁর উত্তরাধিকার এখনও জীবন্ত। জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বছরভর নানা কর্মসূচির পরিকল্পনাও করা হয়েছে।এটা নিছক শ্রদ্ধা নয়।এটা এক ধরনের উত্তরাধিকার স্বীকার করে নেওয়া।বাংলা সিনেমায় আজ যে ‘স্টার’ শব্দটি আমরা ব্যবহার করি, তার সামাজিক অভিধান তৈরি করতে উত্তম কুমারের ভূমিকা অনস্বীকার্য।একশো বছর পরে শেষ প্রশ্ন উত্তম কুমারের জন্মের একশো বছর পরেও তাঁর ছবির দৃশ্য দেখে কেন বুকের ভিতর অদ্ভুত একটা নরম আলো জ্বলে?
কেন তাঁর হাসি এখনও পুরনো দিনের কলকাতাকে ফিরিয়ে আনে?কেন তাঁর পরা শার্ট, তাঁর চুলের স্টাইল, তাঁর হাঁটার ভঙ্গি, তাঁর সংলাপ—সবকিছু এখনও বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ?সম্ভবত কারণ উত্তম কুমার কখনও শুধু ‘অন্য কেউ’ ছিলেন না।তিনি ছিলেন আমাদের কল্পনার সেই মানুষ—যিনি একটু বেশি সুন্দর, একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী, একটু বেশি রোম্যান্টিক; কিন্তু আবার তিনিই একসময় ভীষণ একা, ভীষণ অসহায়, ভীষণ মানবিক।
তাই তাঁর শতবর্ষে দাঁড়িয়ে ‘মহানায়ক’ শব্দটিও যেন ছোট মনে হয়।উত্তম কুমার শুধু মহানায়ক নন।তিনি বাঙালির স্মৃতির এক দীর্ঘস্থায়ী চরিত্র।যে চরিত্রের কোনও শেষ দৃশ্য নেই।সিনেমা হল বদলেছে। পর্দা বদলেছে। দর্শক বদলেছে। নায়কের সংজ্ঞাও বদলেছে।শুধু বদলায়নি উত্তম।আজও কোনও পুরনো টেলিভিশনে হঠাৎ তাঁর মুখ ভেসে উঠলে বাঙালি একটু থেমে যায়।চোখ আটকে থাকে।মনে হয়—এই মানুষটাকে আমরা কোথাও যেন আগে দেখেছি।হয়তো আমাদেরই স্বপ্নে।হয়তো আমাদের বাবা-মায়ের প্রেমের গল্পে।হয়তো আমাদের নিজেদের অপ্রকাশিত কোনও আকাঙ্ক্ষায়।আর সেখানেই উত্তমের চূড়ান্ত জয়।একশো বছর পরেও তিনি অতীত নন।তিনি এখনও ‘উত্তম’।
আর বাঙালির কাছে—চিরকালই মহানায়ক।