আনায়া আয়াত / গুয়াহাটি
১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময়কার সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত নেটফ্লিক্সের সিরিজ ‘অপারেশন সফেদ সাগর’ এই যুদ্ধে ভারতীয় বায়ুসেনার ভূমিকা পুনরায় তুলে ধরেছে। অনি সেন পরিচালিত এই সিরিজে অতিরিক্ত অ্যাকশন বা উগ্র জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে যুদ্ধের আগে হওয়া প্রস্তুতি, কূটনীতি এবং নাটকীয় পরিস্থিতির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ওয়েস্টার্ন এয়ার কমান্ডের এয়ার অফিসার কমান্ডিং-ইন-চিফ (AOC-in-C) এয়ার মার্শাল বিনোদ পাটনির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করা আদিল হুসেইন বলেন, এই অভিজ্ঞতা তাঁকে একজন ব্যক্তি এবং একজন শিল্পী হিসেবে নিজেকে পুনর্মূল্যায়ন করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
অসমীয়া, বাংলা, হিন্দি এবং আন্তর্জাতিক ছবিতে নিজের কেরিয়ার গড়ে তোলা আদিল আং লি-র ‘লাইফ অব পাই’ এবং মীরা নায়ারের ‘দ্য রিলাকট্যান্ট ফান্ডামেন্টালিস্ট’-এর মতো ছবির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি লাভ করেছেন।
অপারেশন সফেদ সাগরের একটি দৃশ্যে আদিল হুসেইন
এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে ‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় আদিল এই সিরিজে কাজ করার নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।
অনুপ্রেরণা ও আত্ম-উপলব্ধি
প্রশ্ন: প্রতিটি প্রজেক্টই আপনাকে কিছু না কিছু শেখায়। ‘অপারেশন সফেদ সাগর’ থেকে আপনি কী শিক্ষা লাভ করেছেন?
আদিল হুসেইন: আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর দেশের প্রতি নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, সততা, পরিশ্রম, সংগ্রাম, শারীরিক সক্ষমতা এবং গভীর ভক্তি সম্পর্কে আমি আগে থেকেই অবগত ছিলাম। কিন্তু প্রকৃত বায়ুসেনা ও সামরিক বাহিনীতে কর্মরত মানুষদের সঙ্গে কাজ করার সময় সেগুলি বাস্তবে দেখে আমার চোখ খুলে গেল এবং এক গভীর অনুপ্রেরণা ও গর্বে আমার বুক ভরে উঠল।
তাঁদের নিষ্ঠার গভীরতা এবং ক্যাম্পাসের ভিতরে তাঁদের কাটানো নম্র ও সাধারণ জীবনযাপন আমাকে আমার নিজের কাজ সম্পর্কেও প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছিল। আমি ভাবতে বাধ্য হয়েছিলাম, অভিনয়কে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া একজন ব্যক্তি হিসেবে আমি কি তাঁদের মতোই শারীরিক পরিশ্রম, বিনিদ্র রাত এবং কঠোর প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি?
তাঁরা দেশের সেবা করছেন, আর আমি শিল্পের সেবা করছি। এটি আমাকে নিজেকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছিল যে আমি কেন শিল্পের সেবা করি। তাঁদের মতো একই স্তরের নিষ্ঠা কি আমারও রয়েছে? আমার শিল্পকলার গভীরে যাওয়ার জন্য এবং আমি যে কাজ করি তার পিছনে থাকা দার্শনিক কারণগুলি বোঝার জন্য আমি কি যথেষ্ট পরিশ্রম করি?
এই সমস্ত বিষয় আমার মনে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং আমাকে একজন ব্যক্তি ও একজন শিল্পী হিসেবে নিজেকে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছিল।
প্রশ্ন: আপনি যখন প্রথমবার ‘অপারেশন সফেদ সাগর’-এর কথা শুনেছিলেন, তখন কাহিনিটির কোন দিকটি আপনাকে এর অংশ হতে আকৃষ্ট করেছিল?
আদিল: একটি বৈরী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে বায়ুসেনাকে যেভাবে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছিল, সেই কাহিনি আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। কয়েক মাস আগে পরিচালিত পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে বাহিনীকে যে সীমাবদ্ধতা ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তার মধ্যেও তাঁদের নিষ্ঠা আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
এটি আমার জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা ছিল এবং আমি ভেবেছিলাম যে আমার এর অংশ হওয়া উচিত। সমস্ত পর্ব পড়ার পর আমি উপলব্ধি করলাম যে এখানে নাটকীয়তা খুবই কম। এটি একটি সম্পূর্ণ সত্য কাহিনি এবং লেখায় কোনো অপ্রয়োজনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদ (jingoism) নেই।
এটি আবেগগতভাবে আকর্ষণীয় এবং কারিগরি দিক থেকে একটি নিখুঁত কাহিনি, যা লিখেছেন কুশল শ্রীবাস্তব। স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার আগে তিনি ভারতীয় বায়ুসেনায় কাজ করেছেন। কাহিনি বলার প্রতি তাঁর আগ্রহ ও আন্তরিকতা আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম এবং সেই কারণেই আমি এর অংশ হতে চেয়েছিলাম।
অপারেশন সফেদ সাগরের দৃশ্যগ্রহণের সময় আইএএফ প্রধান বি ডি ধানোয়ার সঙ্গে আদিল হুসেইন
প্রশ্ন: এই সিরিজটি বায়ুসেনার যোদ্ধাদের শুধুমাত্র অসাধারণ নায়ক হিসেবে তুলে ধরার পরিবর্তে তাঁদের মানবিক দিক, পরিবার, বন্ধুত্ব এবং ভয়কে দেখানোর জন্য যথেষ্ট সময় নিয়েছে। একজন অভিনেতা হিসেবে এটি কি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
আদিল: একজন অভিনেতা হিসেবে প্রজেক্টটি যাই হোক না কেন, প্রতিটি চরিত্রের মানবিক প্রকৃতি ও মানবিক দিকটি পরীক্ষা করা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা বীরত্বপূর্ণ কাজ করেন, তাঁদের নিয়ে কাজ করার সময় এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমি নিশ্চিত যে তাঁরা নিজেদের কখনও ‘নায়ক’ বলে মনে করেন না।
কোনো প্রকৃত নায়ক নিজের দিকে তাকিয়ে কখনও বলেন না, “আমি একজন নায়ক।” তাঁদের কাজ এবং সেই দার্শনিক উপলব্ধিই তাঁদের নায়ক করে তোলে, যা তাঁদের দেশকে রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করেও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করতে অনুপ্রাণিত করে।
এই বিষয়গুলি আমরা সাধারণত সিনেমা এবং অন্যান্য যুদ্ধের কাহিনিতে দেখতে পাই। কিন্তু এর পিছনে তাঁরাও আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ। তাঁরা দেশকে সেবা করার জন্য এই বিশেষ ধর্ম, এই ‘স্বধর্ম’ বেছে নিয়েছেন।
দেশকে রক্ষা করার জন্য তাঁরা নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত থাকেন, এই বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করে। একজন অভিনেতা এবং একজন মানুষ হিসেবে কী তাঁদের এই কাজগুলি করতে অনুপ্রাণিত করে, সেটাই আমার অনুসন্ধানের একটি প্রধান বিষয়।
প্রশ্ন: আমি জানতে পেরেছি যে চরিত্রটির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় আপনি ভারতীয় বায়ুসেনার প্রাক্তন আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। অভিজ্ঞতাটি কেমন ছিল? তাঁরা কি এমন কিছু বলেছিলেন, যার কারণে আপনার চরিত্রটিকে উপস্থাপনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়েছিল?
আদিল: হ্যাঁ, আমি এয়ার মার্শাল বিনোদ পাটনির পাশাপাশি আমার পরিচিত অন্যান্য বায়ুসেনা কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেছিলাম। সিরিজটি তৈরি করা কুশল শ্রীবাস্তব এবং অভিজিৎ পরমারও সেই আলোচনাগুলিতে যুক্ত ছিলেন।
আমরা কর্মশালাও করেছিলাম এবং একটি বায়ুসেনা ঘাঁটিতে গিয়েছিলাম, যেখানে আমরা গ্রুপ ক্যাপ্টেনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছিলাম। আমি তাঁদের শারীরিক ভঙ্গিমা, তাঁরা কীভাবে ব্রিফিং করেন, কীভাবে হাঁটেন এবং নিজেদের পরিচালনা করেন, পাশাপাশি তাঁরা নিজেদের পরিবারের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বজায় রাখেন, সেগুলি বোঝার চেষ্টা করেছিলাম।
এই সমস্ত বিষয় আমার অনুশীলনের অংশ হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে সেই চরিত্রগুলির ক্ষেত্রে যাদের পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন কাহিনিতে দেখানো হয়েছে। আমার চরিত্রটির পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময় খুব বেশি নেই, কারণ তিনি অত্যন্ত উচ্চ পদে রয়েছেন। তিনি মূলত কৌশলগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত এবং যুদ্ধক্ষেত্র বা আকাশপথে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন না। তাই হ্যাঁ, সেই কথোপকথনগুলি আমার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ছিল।
অপারেশন সফেদ সাগরের কলাকুশলীদের সঙ্গে আদিল হুসেইন
প্রশ্ন: সামরিক জীবনকে অত্যন্ত সংযতভাবে উপস্থাপন করার জন্য সিরিজটি বায়ুসেনার প্রাক্তন আধিকারিকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছে। একজন অভিনেতা হিসেবে আপনি কি মনে করেন যে অতিরঞ্জিত দৃশ্যের তুলনায় সংযম কখনও কখনও একটি যুদ্ধের কাহিনিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে?
আদিল: আমি মনে করি শিল্পে সংযম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার কাছে শিল্পের সংজ্ঞা হল, সেই সমস্ত অপ্রাসঙ্গিক ও অর্থহীন বিষয়কে সরিয়ে দেওয়া, যেগুলি সাধারণ দর্শককে দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
শিল্পের উচিত মানুষকে নিজের কর্তব্য পালন করার পাশাপাশি মানব প্রকৃতির সর্বোচ্চ গুণগুলি, অর্থাৎ সংযম, শান্ত স্বভাব, সম্মান এবং সহানুভূতি, গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করা।
সিরিজে ব্যবহৃত “রেজর ব্লেডস” শব্দবন্ধটি সেই ধারণাকেই প্রতিফলিত করে। যখন আমাদের কর্তব্যের জন্য ডাকা হয়, তখন আমাদের রেজরের মতো তীক্ষ্ণ হতে হবে। সেখানে কোনো আপস চলে না। তবুও অহংকার বা দম্ভ দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ সেটি মানবিক আচরণের অন্যতম অর্থহীন দিক।
এইগুলি এমন ধারণা, যেগুলি সম্পর্কে শ্রী অরবিন্দ এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসের মতো মহান চিন্তাবিদ ও আধ্যাত্মিক গুরু কথা বলে গিয়েছেন। শিল্পের উচিত মানুষকে তাঁদের প্রবৃত্তিগত, আবেগপ্রবণ এবং প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে উৎসাহিত করা। আমাদের কর্তব্য পালন করার সময় আমাদের মর্যাদাপূর্ণ, মার্জিত, শান্ত এবং সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত।
উদাহরণস্বরূপ, সিরিজে যখন আমরা একজন পাকিস্তানি সৈনিককে বন্দি করি, তখন আমরা তাঁর সঙ্গে সেই আচরণ করি না, যেভাবে পাকিস্তান আমাদের একজন জওয়ান অজয় আহুজার সঙ্গে করেছিল। আমরা আরও সভ্য। আমাদের শত্রুকে পরাজিত করার জন্য আমরা কখনও আমাদের শত্রুর মতো হতে পারি না।
শুধু যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার কারণেই আমাদের নিষ্ঠুর বা হিংস্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত নয়। যুদ্ধ অবশ্যই একটি হিংসাত্মক কাজ, কিন্তু শুধুমাত্র সেই পর্যায় পর্যন্ত, যেখানে হিংসার প্রয়োজন হয়। এটিকে মহিমান্বিত করা উচিত নয়, কারণ কেউই হিংসা চায় না।
শিল্পে হিংসা দেখানো যেতে পারে শুধুমাত্র এমন একটি পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য, যেখানে আর হিংসার প্রয়োজন নেই। মানব প্রকৃতির সর্বোচ্চ দিক হিসেবে এটিকে উদযাপন করার মতো কোনো বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
প্রশ্ন: নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়ায় আপনার দুটি কাজ যথাক্রমে ১ ও ২ নম্বরে ট্রেন্ডিংয়ে থাকায় সত্যিই খুব ভালো লাগছে। সেগুলি হল ‘সফেদ সাগর’ এবং ‘মুসাফির ক্যাফে’। আপনার অনুভূতি কেমন?
আদিল: এটি যথেষ্ট আত্মসন্তুষ্টিদায়ক। দুটি সিরিজেরই অংশ হতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে। ‘মুসাফির ক্যাফে’-কেও দর্শকরা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন এবং দুটির সঙ্গেই যুক্ত থাকতে পেরে আমি গর্বিত।
দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সিরিজ এবং এগুলি সমাজ ও মানবিক অবস্থার ভিন্ন ভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করে। এগুলি নির্মাণ করার জন্য আমি নির্মাতাদের পাশাপাশি নেটফ্লিক্সের কাছেও কৃতজ্ঞ।
আমি আশা করি, মানবিক আবেগ এবং সমাজের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণকে কেন্দ্র করে এমন ধরনের আরও গল্প উপস্থাপনের জন্য নেটফ্লিক্স অনুপ্রাণিত হবে।
(আনায়া আয়াত গুয়াহাটির একজন লেখিকা)