বিতর্কের ঊর্ধ্বে সত্যের অনুসন্ধান: বিশ্ব গ্রন্থমেলায় ইসলামিক গ্রন্থের চাহিদা বৃদ্ধি
মালিক আসগর হাসমি / নয়া দিল্লি
ডিজিটাল স্ক্রিনের দাপটের মাঝেও যে বই এখনো মানুষের চিন্তা, প্রশ্ন আর আত্মঅনুসন্ধানের প্রধান আশ্রয়, তারই স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে নতুন দিল্লির প্রগতি ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব গ্রন্থমেলা ২০২৬–এ। জ্ঞানপিপাসু পাঠক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ বইপ্রেমীদের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে এই মেলা। নানা ভাষা, মত ও সংস্কৃতির বইয়ের ভিড়ে বিশেষভাবে নজর কাড়ছে কিছু ইসলামিক প্রকাশনা( MMI Publishers)-এর স্টল, যেখানে পাঠকদের কৌতূহল শুধু কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং সত্য জানার আন্তরিক আগ্রহে পরিণত হয়েছে অনুসন্ধানে।
মেলায় ঘুরে দেখলেই বোঝা যায়, এই স্টলে সারাক্ষণই পাঠকের ভিড় লেগে আছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিশ্ব গ্রন্থমেলায় আগত পাঠকদের আগ্রহ মূলত সেইসব বইয়ের প্রতিই বেশি দেখা যাচ্ছে, যেসব বিষয় নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমাজ ও রাজনীতিতে ধারাবাহিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
এই তালিকায় রয়েছে নিমরান আহমেদের জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘মিলাদ’, মাওলানা আমিন আহসানি ইসলাহির ‘বহুঈশ্বরবাদ ও বাস্তবতা’, জিহাদ, হিন্দু উগ্রবাদ, আরএসএস, ইসলামি জীবনব্যবস্থা এবং হজরত মুহাম্মদ- এর জীবনভিত্তিক নানা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।
স্টলের ব্যবস্থাপক আদিল গৌর জানিয়েছেন, এই বইগুলোর প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে একটি বড় কারণ রয়েছে। তাঁর কথায়, “সাম্প্রতিক সময়ে সমাজে এই বিষয়গুলোকে ঘিরে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ও নেতিবাচক প্রচার চালানো হচ্ছে।” মানুষ এখন নিজেরাই পড়ে, বুঝে এবং সত্য জানতে আগ্রহী হচ্ছেন। এই গ্রন্থগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভুল ধারণা ও কুসংস্কার ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই স্টলটি পরিচালনা করছে জামাত-ই-ইসলামি হিন্দ, দিল্লি। আদিল গৌরের মতে, জামাত-ই-ইসলামির পক্ষ থেকে এবারের মেলায় দুটি স্টল দেওয়া হয়েছে, একটি মারকাজি মকতবা ইসলামি পাবলিশার্স–এর নামে এবং অন্যটি সবকি সেবা পাবলিশার্স অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটরস–এর নামে। দুটি স্টলই হল নম্বর ২–এ পাশাপাশি অবস্থিত এবং উভয়টিই পাঠকদের মধ্যে সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
এই প্রসঙ্গে জামাত-ই-ইসলামি হিন্দ এক বিবৃতিতে জানায়, প্রগতি ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব গ্রন্থমেলা একটি বিশ্বখ্যাত শিক্ষা ও সাহিত্যভিত্তিক মেলা, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিশিষ্ট প্রকাশকরা তাঁদের শ্রেষ্ঠ ও মূল্যবান সৃষ্টিসমূহ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। এই মেলা কেবল বইয়ের বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্র নয়; বরং এটি জ্ঞান, চিন্তাধারা, সংস্কৃতি ও সংলাপের এক শক্তিশালী বৈশ্বিক মঞ্চ।
বিবৃতিতে বিশেষভাবে সবকি সেবা পাবলিশার্স অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটরস–এর স্টলের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এখানে হিন্দি ভাষায় ইসলামি সাহিত্যের এক বিস্তৃত সংগ্রহ পাওয়া যাচ্ছে, যা পাঠক, ছাত্রছাত্রী, যুবসমাজ এবং অমুসলিম পাঠকরাও ব্যাপক আগ্রহের সঙ্গে ক্রয় করে পড়ছেন।
এই স্টলে রয়েছে ভাবনাউদ্দীপক ও তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ যেমন, আজান ও নামাজ কী, মানব সমতা, নারী সুরক্ষা ও ইসলাম, ইসলামি জিহাদের বাস্তবতা, কোরআন সবার জন্য, হজরত মুহাম্মদ সবার জন্য এবং ইসলাম, সবার জন্য রহমত।
এই সব বই সহজ ও প্রাঞ্জল হিন্দি ভাষায় লেখা, যার মাধ্যমে ইসলামের মানবিক, নৈতিক ও শান্তিপ্রিয় দিকগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। জামাত-ই-ইসলামির মতে, দাওয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকেও এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত শান্তি ও মানবতার বার্তা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
নয়াদিল্লির বিশ্ব বইমেলায় জামাত-ই-ইসলামীর বইয়ের দোকান
এছাড়াও, বাণিজ্যিক দিক থেকেও এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়, কারণ এটি আরও বেশি মানুষকে বইয়ের সঙ্গে যুক্ত করার এক আন্তরিক প্রয়াস। ওয়ার্ল্ড বুক ফেয়ারের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই স্টলগুলোর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে, আজও বই সামাজিক সংলাপ, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ইতিবাচক চিন্তাভাবনা গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।