লখনউয়ের রসনাধারার উত্তরাধিকার: রহিমের নেহারি ও আকবরি গেটের সাংস্কৃতিক ভোজসভা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 Months ago
লখনউয়ের রসনাধারার উত্তরাধিকার: রহিমের নেহারি ও আকবরি গেটের সাংস্কৃতিক ভোজসভা
লখনউয়ের রসনাধারার উত্তরাধিকার: রহিমের নেহারি ও আকবরি গেটের সাংস্কৃতিক ভোজসভা
 
ড. রেশমা রহমান

লখনউ এমন এক শহর, যেখানে বাতাসের প্রতিটি শ্বাসে ইতিহাস কথা বলে, আর প্রতিটি গলির বাঁকে ভেসে আসে মশলার উষ্ণ আহ্বান। নবাবি ঐতিহ্যের এই নগরীতে রুচি ও রেওয়াজ আলাদা কিছু নয়, দুটো মিলেই লখনউ। এই স্বাদের জগতে এক নাম সময়ের পরীক্ষায় অবিচল, যা গত ১৩৫ বছর ধরে শুধু মানুষের ক্ষুধা মেটায়নি, বরং গঙ্গা–জমুনি সংস্কৃতির দীপ্ত উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে, ‘রহিম হোটেল’।
 
১৮৯০ সালে যাত্রা শুরু করা এই ছোট্ট খাবারের আস্তানা আজ আর শুধু একটি রেস্তোরাঁ নয়; এটি অবধের ইতিহাস, স্মৃতি ও স্বাদের এক জীবন্ত দলিল।
 

আকবরি গেট: যেখানে ইতিহাস নিঃশ্বাস নেয়
 
পুরনো লখনউয়ের আকবরি চকে অবস্থিত রহিম হোটেলে পৌঁছাতে হলে পেরোতে হয় কাঁচা-পাকা সরু গলির জটিল জাল, যে গলিগুলো নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রেখেছে শত শত বছরের গল্প। এই অঞ্চল লখনউয়ের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র। এখানকার বাসিন্দাদের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো এমন সব কাহিনি আছে, যা কোনো ইতিহাসের বইয়ের পাতায় লেখা নেই।
 
এখানে ‘ওরাল হিস্ট্রি’ বা মৌখিক ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন চোখে পড়ে। গলিপথে হাঁটতে হাঁটতে আপনি দেখতে পাবেন শতাব্দীপ্রাচীন চিকনকারির ঐতিহ্য এবং হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংস্কৃতির জীবন্ত ছবি। এই চকের মধ্যেই শ্যাম ও রোহিতের দোকানে পাওয়া যায় ‘পিলা মাখন’, যা এখানকার হিন্দু ও মুসলমান পরিবারে সমানভাবে প্রিয় এক বিশেষ মিষ্টান্ন, অতিথি আপ্যায়নের সম্মানসূচক নিদর্শন।
 
নেহারি-কুলচা: জিভে গলে যায় আভিজাত্যের স্বাদ
 
রহিম হোটেলের আসল পরিচয় তার কুলচা-নিহারি। নিহারি, লখনউয়ের ঐতিহ্যবাহী সকালের খাবার, এখানে একপ্রকার শিল্পের মতো করে প্রস্তুত করা হয়। মাটন নিহারি সারারাত ধরে ধীর আঁচে রান্না হয়, ফলে মাংস এতটাই নরম হয়ে ওঠে যে মুখে দিলেই যেন মালাইয়ের মতো গলে যায়।
 

এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয় সদ্য বানানো খামিরি কুলচা কিংবা কেশরিয়া (জাফরানি) শিরমাল। নিহারির ঘন, মশলাদার ঝোল যখন শিরমালের সূক্ষ্ম মিষ্টতার সঙ্গে মিশে যায়, তখন সৃষ্টি হয় এমন এক স্বাদের সম্মিলন, যা শুধু জিভ নয়, মনকেও তৃপ্ত করে। এ ছাড়া এখানকার চিকেন কোরমাও তার নিজস্ব স্বাদের জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
 
নিহারির যাত্রা: হাকিমের ওষুধ থেকে দস্তরখানের শান
 
নিহারির উদ্ভব নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে দিল্লির দাবিকেই সবচেয়ে শক্তিশালী বলে ধরা হয়। কথিত আছে, পুরনো দিল্লির নেহরের ধারে বসবাসকারী এক অঞ্চলে যখন চোখের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানকার এক হাকিম বিশেষ এক ধরনের ‘ওষুধ’ তৈরি করেন।
 
তিনি নির্দেশ দেন, এটি ‘নিহার মুখ’, অর্থাৎ খালি পেটে, খেতে হবে। ‘নেহর’ ও ‘নিহার’ শব্দের মিল থেকেই নাকি এই খাবারের নাম হয় ‘নিহারি’। চিকিৎসা হিসেবে শুরু হওয়া এই পদ ধীরে ধীরে রসনাবিলাসে পরিণত হয়। ইতিহাস সাক্ষী, প্রায় প্রতিটি বিখ্যাত খাবারের পেছনেই কোনো না কোনো প্রয়োজন বা পরিস্থিতির গল্প লুকিয়ে থাকে।
 
রহিম হোটেলে তোলা একটি ছবি
 
শিরমালের কাহিনি: নাসিরউদ্দিন হায়দার ও নানবাই মামদু

নিহারির সঙ্গে পরিবেশিত শিরমালেরও রয়েছে এক আকর্ষণীয় ইতিহাস। অবধের নবাব নাসিরউদ্দিন হায়দারের সময়ে ‘মামদু’ নামের এক প্রসিদ্ধ নানবাই ছিলেন। তাঁকেই শিরমালের উদ্ভাবক বলা হয়। ‘শির’ অর্থ দুধ এবং ‘মাল’ অর্থ উপকরণ, অর্থাৎ দুধ দিয়ে মেখে তৈরি করা রুটি। ময়দা দুধ ও দেশি ঘিতে মেখে তন্দুরে সেঁকা হয়, পরে তার ওপর জাফরান দিয়ে নকশার মতো পালিশ দেওয়া হয়। এই জাফরানি শিরমালই রহিমের নিহারির সবচেয়ে উপযুক্ত সঙ্গী।
 
সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক
 
রহিম হোটেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে শুধু মুসলমান নয়, বিপুল সংখ্যায় হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের মানুষও প্রতিদিন সকালে নাশতা করতে আসেন। এই প্রবাহ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এখানকার দস্তরখানে ধর্মের সব দেওয়াল ভেঙে যায়। ডাক্তার, আইনজীবী, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী, পর্যটক, এমনকি বলিউডের তারকারাও এই ভিড়ের অংশ। হুমা কুরেশি, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি, হিনা খান, মাধুরী দীক্ষিত ও আলি জাফরের মতো শিল্পীদের এখানে শুটিংয়ের পাশাপাশি টুন্ডে কাবাব ও রহিমের নিহারি উপভোগ করতে দেখা গেছে।
 
ডিজিটাল দুনিয়ায় রহিমের খ্যাতি
 
আজকের যুগে সোশ্যাল মিডিয়া রহিমের নামকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিয়েছে। ‘হিস্ট্রি টিভি ১৮’-এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘রোডট্রিপ উইথ রকি অ্যান্ড ময়ূর’-এ রকি এখানকার মাটন নিহারি ও জাফরানি শিরমালের ভূয়সী প্রশংসা করেন। ‘দিল্লি ফুড ওয়াকস’-এর অভিজ্ঞ সাপরার ভিডিও এই স্বাদের কারণেই ২৫ লক্ষেরও বেশি বার দেখা হয়েছে।
 
রহিম হোটেলের কুলচা-নিহারি
 
বিশিষ্ট অভিনেতা আশিস বিদ্যার্থী তাঁর ভ্লগে এখানকার নিহারি, গুরদা ও পায়াকে ‘অসাধারণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া ‘ভার্চুয়াল বঞ্জারা’ ও ‘হিস্ট্রি প্রিজারভার’-এর মতো বহু ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর রহিমের গল্প বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন।
 
খাদ্য: এক অনুভূতি, এক পরিচয়
 
সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে খাবার ও নন-ভেজ দোকানকে ঘিরে আক্রমণের খবর সামনে আসছে, তা ভারতের মতো বহুত্ববাদী দেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। খাবার কেবল জিভের স্বাদ নয়, এটি এক গভীর অনুভূতি। এটি আমাদের অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে এবং আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করে। পাঞ্জাবি, সিন্ধি, অবধি, মৈথিলি কিংবা আফগানি খাবারের কথা বললে আমরা আসলে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলি। কারও খাদ্যাভ্যাসে আঘাত মানে তার ঐতিহ্য ও পরিচয়ের ওপর আঘাত হানা।
 
খাবারই সেই অদৃশ্য সুতো, যা মানুষকে হৃদয় দিয়ে যুক্ত করে। আজকের সময়ে যখন ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে, তখন রহিমের মতো প্রতিষ্ঠান এবং আকবরি গেটের মতো গলিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের আসল স্বাদ লুকিয়ে আছে ‘সবার চুল্লি’তে। দিল্লি না লখনউ, কার নিহারি শ্রেষ্ঠ, সে বিতর্ক যুগের পর যুগ চলতেই পারে; কিন্তু একথা নিশ্চিত, রহিমের নিহারি শুধু পেটই ভরায় না, বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের মাধুর্যও ছড়িয়ে দেয়। এই ঐতিহ্য শুধু লখনউয়ের নয়, এ সমগ্র ভারতের, আর তাকে রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
 
(লেখিকা ড. রেশমা রহমান, ইউএসটিএম (USTM)-এর সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক।)