শা‘বান মাস: এর গুণ, তাৎপর্য ও সঠিক ব্যবহার

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 10 d ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
ইমান সাকিনা 

ইসলামি ক্যালেন্ডারে এমন কিছু মাস আছে, যেগুলো নীরবে আসে, রমজান বা অন্যান্য পবিত্র মাসের মতো উচ্চকিত গুরুত্ব তারা দাবি করে না। কিন্তু যারা গভীরভাবে ভাবেন, তাদের কাছে এই মাসগুলোর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অসীম। শা‘বান তেমনই এক মাস। রজব ও রমজানের মাঝখানে অবস্থান করা এই মাসটি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়, অথচ বাস্তবে এটি এক সেতুর মতো কাজ করে, যে সেতু হৃদয়, মন ও আত্মাকে রমজানের কঠোর সাধনার জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
 
হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শা‘বান মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর জীবনাচরণই প্রমাণ করে, এই মাসকে অবহেলা করার নয়; বরং আত্মিক নবীকরণ, প্রস্তুতি ও বিকাশের জন্য ব্যবহার করার। ‘শা‘বান’ শব্দটি আরবি মূল শা‘বা থেকে এসেছে, যার অর্থ “বিস্তৃত হওয়া” বা “প্রসারিত হওয়া”।
 

আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এটি সৎকর্মের বিস্তারের দিকেই ইঙ্গিত করে, অর্থাৎ এই মাসে নেক আমল কীভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রাচীনকালে মানুষ যেমন পানি ও খাদ্যের সন্ধানে ছড়িয়ে পড়ত, তেমনি আধ্যাত্মিক অর্থে শা‘বান হলো সেই সময়, যখন আল্লাহর রহমত বিস্তৃতভাবে নেমে আসে এবং হৃদয়সমূহ আবেগ ও ভালোবাসায় তাঁর দিকে ধাবিত হয়।
 
শা‘বান মাসের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে, এটি আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের সময়। রমজান শুরু হওয়ার আগেই মুমিনদের তাদের হৃদয় প্রস্তুত করার আহ্বান জানানো হয়। শা‘বানের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো এর ১৫তম রাত, যা লাইলাতুন নিসফে শা‘বান নামে পরিচিত। বহু আলেমের মতে, এই রাতে বিশেষভাবে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা প্রাচুর্যের সঙ্গে নাজিল হয়।
 
হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, “শা‘বানের মধ্যরাতে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির দিকে দৃষ্টি দেন এবং শিরককারী ও অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।” (ইবনে মাজাহ)
 
প্রতীকী ছবি
 
এই হাদিস মুমিনদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ক্ষমা কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের বিষয় নয়; বরং অন্তরের ক্ষোভ, হিংসা ও বিদ্বেষ ত্যাগ করাও সমান জরুরি। কারণ ঘৃণায় ভরা হৃদয়ে ইবাদতও নিষ্ফল হয়ে পড়ে।
 
শা‘বান: আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির মাস
 
শা‘বান মাসের উদ্দেশ্য কখনোই রমজানের স্থান দখল করা বা তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়; বরং এটি মুমিনদের রমজানের জন্য প্রস্তুত করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।
 
১. রোজার মাধ্যমে শরীরকে প্রস্তুত করা
 
শা‘বান মাসে নিয়মিত নফল রোজা রাখলে শরীর ক্ষুধা ও সংযমের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এতে রমজানের রোজা সহজ হয় এবং মুমিনরা আধ্যাত্মিক বিষয়ে আরও মনোযোগী হতে পারেন।
 
২. হৃদয়কে জাগ্রত করা
 
এই মাসে নিয়মিত ইবাদত আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া হৃদয়কে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। জিকির, রোজা ও দোয়ার মাধ্যমে কোমল হৃদয়ের মানুষ রমজানে অভ্যাসের তাড়নায় নয়, বরং আন্তরিকতা নিয়ে প্রবেশ করেন।
 
৩. নিয়ত শুদ্ধ করা
 
শা‘বান মুমিনদের নিজেদের নিয়ত নিয়ে ভাবার সুযোগ দেয়। আমি কেন রমজানে রোজা রাখি? আমি আল্লাহর কাছে প্রকৃতপক্ষে কী চাই? রমজানের আগে স্পষ্ট নিয়ত প্রতিটি ইবাদতকে অর্থবহ করে তোলে।
 
প্রতীকী ছবি
 
শা‘বান মাসের সর্বোত্তম ব্যবহার
 
নফল রোজা বৃদ্ধি করুন

সুন্নাহ অনুসরণ করে, বিশেষ করে সোমবার ও বৃহস্পতিবার বেশি রোজা রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি, নিজের উপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়।
 
বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন
 
শা‘বান হলো ক্ষমা প্রার্থনার মাস। সারাদিনে, বিশেষ করে নিরিবিলি মুহূর্তে নিয়মিত ইস্তিগফার করলে হৃদয় কোমল হয় এবং অতীতের পাপ থেকে মুক্তির পথ সুগম হয়।
 
সম্পর্ক মেরামত করুন
 
যেহেতু বিদ্বেষ ও ক্ষোভ আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে, তাই ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর জন্য শা‘বান সর্বোত্তম সময়। একটি আন্তরিক বার্তা বা ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগও আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দিতে পারে।
 
কুরআনের সঙ্গে পুনঃসংযোগ গড়ে তুলুন

রমজানের অপেক্ষায় না থেকে শা‘বানেই কুরআন তিলাওয়াত শুরু করা উচিত। প্রতিদিন কয়েকটি আয়াত পড়লেও আল্লাহর বাণীর প্রতি নতুন ভালোবাসা জেগে উঠতে পারে।
 
প্রতীকী ছবি
 
রমজানের প্রস্তুতির অনুশীলন
 
শা‘বান হলো ব্যবহারিক প্রস্তুতির মাস। ঘুমের সময়সূচি ঠিক করা, মনোযোগ নষ্টকারী অভ্যাস থেকে দূরে থাকা এবং অর্থবহ ইবাদতের পরিকল্পনা করা, এসবই রমজানকে আরও ফলপ্রসূ করে তোলে।
 
শা‘বান আমাদের শেখায় নীরব ও গোপন ইবাদতের গুরুত্ব। এটি মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহ ক্ষণিকের আবেগের চেয়ে ধারাবাহিকতাকে বেশি পছন্দ করেন। এই মাস নম্রতা শেখায় এবং দেখায়, বড় আধ্যাত্মিক পুরস্কার অনেক সময় ছোট, নীরব ও অচেনা আমলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
 
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, শা‘বান আমাদের শেখায়, প্রস্তুতিও নিজেই এক ধরনের ইবাদত। যারা শা‘বান মাসে আন্তরিক প্রস্তুতি নিয়ে রমজানে প্রবেশ করে, তাদের রমজানের শেষে আত্মিকভাবে রূপান্তরিত হয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।