বিশ্বশাসন নয়, বিবেকজাগরণই ইসলামের সত্য

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
ভারতের হায়দ্রাবাদে জামিয়া নিজামিয়ার সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত স্নাতকরা সেলফি তোলার  একটি মুহূর্ত
ভারতের হায়দ্রাবাদে জামিয়া নিজামিয়ার সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত স্নাতকরা সেলফি তোলার একটি মুহূর্ত
 
আমির সুহাইল ওয়ানী

আধুনিককালে ইসলামের রাজনৈতিক কল্পনা, যা আবুল আ‘লা মওদূদী, সৈয়দ কুতুব এবং তাঁদের আদর্শিক উত্তরসূরিদের মাধ্যমে সবচেয়ে প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে, মুসলিম বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুতর বিপর্যয়। এ প্রকল্প কেবল ভুল নয়, গভীরভাবে বিপর্যস্ত, কারণ এটি ইসলামকে, যা এক নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সভ্যতাগত পরম্পরা, তাকে আধুনিক রাজনৈতিক মতাদর্শের ছাঁচে জোর করে ঢোকাতে চায়।
 
মুসলমানদের উপনিবেশিক অপমান ও ঐতিহাসিক পতনের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে রাজনৈতিক ইসলাম ইসলামের মহত্ত্বকেই আধুনিক ক্ষমতার সংকীর্ণ ব্যাকরণে বন্দি করে ফেলেছে। ত্রান্সসেন্ডেন্স পরিণত হয়েছে প্রশাসনে, আস্থা হয়ে গেছে মতাদর্শে, আর নৈতিক গভীরতা সঙ্কুচিত হয়েছে রাজনৈতিক উচ্চারণে।
Weekly Essay
 
মূলত, রাজনৈতিক ইসলাম কোনো প্রাচীনত্বে প্রত্যাবর্তন নয়; এটি পুরোপুরি একটি আধুনিক নির্মাণ। শাস্ত্রীয় ইসলাম কখনো নিজেকে ‘‘ইজম’’ হিসেবে ভাবেনি, যেন প্রতিদ্বন্দ্বী মতাদর্শের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি কঠোর কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বরং এটি ছিল এক নৈতিক দিকনির্দেশনা, আধ্যাত্মিক পথ এবং বহুবিধ রাজনৈতিক কাঠামো ধারণ করতে সক্ষম এক সভ্যতাগত স্বভাব। প্রাচীন মুসলিম ফকিহ, ধর্মতাত্ত্বিক ও সুফিরা রাজনীতির ব্যাপারে বিস্ময়কর সংযম দেখিয়েছেন। তাঁরা ন্যায়, নৈতিক দায়িত্ব, দয়া ও মানবিক ভঙ্গুরতা নিয়ে বিস্তর লিখেছেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পবিত্র করে তুলতে দৃশ্যত অনীহা দেখিয়েছেন। আধুনিক ইসলামবাদ এ সংযমকে ভেঙে দিয়ে ঘোষণা করেছে, ইসলাম মূলত এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যার পরিপূর্ণতা রাষ্ট্রশক্তি ছাড়া অসম্ভব। 
 
প্রতীকী ছবি
 
হান্না আরেন্ট যাকে মতাদর্শগত চিন্তার রোগ বলে চিহ্নিত করেছেন, রাজনৈতিক ইসলামের এ প্রবণতা তারই প্রকাশ। আরেন্টের মতে, মতাদর্শ কেবল রাজনৈতিক বিশ্বাসের সমষ্টি নয়; এটি এমন এক সর্বগ্রাসী মানসিক কাঠামো, যা একটিমাত্র ভিত্তি থেকে সমগ্র বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে চায়। একবার গ্রহণ করলে এটি নৈতিক বিচারের দরকার ফেলে দেয়; যুক্তি ও নৈতিকতা প্রতিস্থাপিত হয় দৃঢ় মতাদর্শিক নিশ্চিততায়।
 
মওদূদীর ‘‘হাকিমিয়্যাহ’’, দৈব সার্বভৌমত্বকে সর্বব্যাপী রাজনৈতিক নীতি হিসেবে প্রতিস্থাপন, ঠিক এরকমই একটি কাঠামো। এই একটি ধারণা থেকেই পুরো এক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে, যেখানে আইন, সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এমনকি ব্যক্তিগত বিবেকও এক নির্ধারিত রাজনৈতিক যুক্তির অধীন। ইসলাম আর ঈশ্বরমুখী নৈতিক সাধনার জীবন নয়; এটি পরিণত হয় এমন এক মতাদর্শে, যা দাবি করে কেবল ঈশ্বরের নয়, মানুষের ব্যাখ্যাতেও সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ।
 
সৈয়দ কুতুব এ মতাদর্শিক সংকোচনকে আরও কঠোর করে ‘‘জাহিলিয়্যাহ’’ ধারণাকে অস্ত্র বানালেন। ইতিহাসে ‘‘জাহিলিয়্যাহ’’ ছিল নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অজ্ঞতার প্রতীক। কুতুব সেটিকে রূপ দিলেন আধুনিক সমাজের পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক নিন্দায়। তাঁর ধারণা অনুযায়ী, যে সব সভ্যতা তাঁর ভাবনার ‘‘দৈব সার্বভৌমত্ব’’ মানে না, সেগুলো বৈধই নয়।
 
এই বিভাজন আরেন্টের বর্ণনা করা ‘‘আদর্শগত দুইভাগ’’, জ্ঞানী অগ্রদূত বনাম পতিত গণসমষ্টি, এর প্রতিধ্বনি। এ ধরনের বিভাজন গ্রহণ করলে বাদ দেওয়া হয় পুণ্য, জবরদস্তি হয় কর্তব্য, আর সহিংসতা হয় মুক্তির পথ। এভাবে ইসলামের সার্বজনীন নৈতিক আহ্বান পরিণত হয় স্থায়ী বৈরিতার রাজনৈতিক চর্চায়।
 
এরিক ফোগেলিনের ‘‘ইম্মানেন্টাইজ দ্য এস্ক্যাটন’’ সমালোচনা রাজনৈতিক ইসলামের আরেকটি মূল ভ্রান্তি ব্যাখ্যা করে: আধ্যাত্মিক মুক্তিকে ইতিহাসের রাজনীতিতে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাই আধুনিক মতাদর্শের বিপদ। কুরআনের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে পরকালের হিসাব-নিকাশের দিকে মুখ করে, রাজনৈতিক ইসলাম সেটিকে রূপ দেয় ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রকল্পে। মুক্তি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রগঠনের ফলাফল, মানুষের নৈতিক যাত্রা নয়। এটি সরাসরি এক বিপুল ধর্মতাত্ত্বিক ভুল।
 
প্রতীকী ছবি
 
ক্লাসিক্যাল ইসলাম এ ভুল স্বতঃসিদ্ধভাবে এড়িয়েছে। ইমাম গাজ্জালি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নৈতিক উদ্বেগের সময়ে লিখেও, ক্ষমতাকে কখনো পবিত্র করেননি। তাঁর কাছে রাষ্ট্র কেবল বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর উপায়, মুক্তির পথ নয়। আলোকপ্রাপ্তি আসে নৈতিক সংশোধনে, রাজনৈতিক দখলে নয়। তিনি বারবার সতর্ক করেছেন, শাসন ও উপদেশকে গুলিয়ে ফেললে, বাহ্যিক অনুশীলনকে অন্তর্গত রূপান্তর ভেবে নিলে ধর্ম দুর্নীতিগ্রস্ত হয়।
 
ইবন তাইমিয়্যাহ, যাকে আধুনিক ইসলামপন্থীরা প্রায়ই ভুলভাবে উদ্ধৃত করেন, আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: ঈশ্বর ন্যায়ী অমুসলিম রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারেন অন্যায় মুসলিম রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। ন্যায়ই ছিল তাঁর কাছে ঈশ্বরের অনুগ্রহের মানদণ্ড, মতাদর্শিক পবিত্রতা নয়।
 
ইদ্রিসি-সুফি ঐতিহ্য রাজনৈতিক ইসলামের আরেকটি প্রতিস্পর্ধী পথ দেখায়। ইবনে আরাবির ওয়াহদাতুল-উদূদ ভাববাদ মানব সত্যগ্রহণের পরম সীমাবদ্ধতা ও বৈচিত্র্যকে উদ্‌ঘাটন করে। সত্যকে একদল মানুষের রাজনৈতিক দখলে কুক্ষিগত করা তাঁর মতে ছিল অশুদ্ধ আত্মার লক্ষণ। কুতুব যেখানে বিশ্বকে দুই শিবিরে ভাগ করেন, ইবনে আরাবি সেখানে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা আলোর লক্ষণ দেখেন।
 
রুমির এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও মানবিক, তাঁর ইসলামে প্রেম কেন্দ্রবিন্দু, ক্ষমতা নয়; রূপান্তর লক্ষ্য, শাসন নয়। পরিচয়, জাতি বা ধর্মকে তিনি কখনোই চূড়ান্ত করে দেখেননি। রাজনৈতিক ইসলাম এ জায়গায় এসে আধ্যাত্মিকতার মর্মশূন্যতা প্রকাশ করে।
 
ভারতের প্রেক্ষাপটে শাহ ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তিনি গভীরভাবে শরিয়ত-আনুগত হলেও আইনকে দেখেছেন নৈতিক পরিবেশতত্ত্ব হিসেবে, মতাদর্শিক অস্ত্র হিসেবে নয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল নৈতিক সামঞ্জস্য, সামাজিক সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিক নবায়ন, একক রাজনৈতিক রাষ্ট্র নির্মাণ নয়।
 
কুরআনও এই শাস্ত্রীয় সংযমকে সমর্থন করে। ‘‘ধর্মে জবরদস্তি নেই’’ (২:২৫৬) কেবল নীতিগত ঘোষণা নয়, এটি ইসলামের মৌল নৈতিক কাঠামো। ‘‘আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে এক জাতি বানাতে পারতেন’’ (৫:৪৮), এ বহুত্বকে ঈশ্বরের ইচ্ছা বলে ঘোষণা করে। কুরআন ন্যায়, দয়া, আমানত ও পরামর্শ নিয়ে ধারাবাহিক শিক্ষা দিয়েছে, কিন্তু কখনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করেনি। এ নীরবতা ইঙ্গিত করে, নৈতিক অভিমুখই মুখ্য, রাষ্ট্ররূপ নয়।
 
প্রতীকী ছবি
 
তালাল আসাদের নৃতত্ত্ব দেখায় রাজনৈতিক ইসলাম ইসলামের জীবন্ত ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুতি। ইসলাম ছিল এক জীবন্ত, অনুশীলিত, নৈতিক পরম্পরা, রাজনৈতিক কোড নয়। রাজনৈতিক ইসলাম ঐ জীবন্ত ঐতিহ্যকে পরিণত করেছে নিয়মবদ্ধ ব্যবস্থায়, যেখানে আইন হয়ে যায় নিয়ন্ত্রণ, বিশ্বাস হয়ে যায় মতাদর্শ, আর উম্মাহ হয়ে যায় রাজনৈতিক সম্প্রদায়।
 
ভারতে এই বিচ্যুতির মূল্য আরও ভয়াবহ। ভারতীয় ইসলাম ঐতিহাসিকভাবে গড়ে উঠেছিল সুফি সংস্কৃতি, স্থানীয় ভাষা, সামাজিক আদানপ্রদান ও নৈতিক সহাবস্থানের ভিত্তিতে। সেটি ছিল পরিচয়ের নয়, পরিচয়ের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক জানাশোনার ধর্ম। মওদূদী–কুতুবের কল্পনা সেই জৈব ঐতিহ্যকে ভেঙে দিয়ে মুসলমানকে রূপান্তর করেছে অবরুদ্ধ মতাদর্শিক সংখ্যালঘুতে, নৈতিক নাগরিকত্ব নয়, রুদ্ধ রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ে।
 
আন্তর্জাতিক পরিসরেও রাজনৈতিক ইসলাম বিপর্যয় ডেকে এনেছে, চরমপন্থীদের অস্ত্র দিয়েছে, স্বৈরশাসকদের ধর্মীয় ঢাল দিয়েছে, আর ইসলামবিদ্বেষীদের প্রস্তুত উপকরণ সরবরাহ করেছে। যখন ইসলামকে রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে রূপ দেওয়া হয়, মুসলমানরাও রাজনৈতিক সন্দেহভাজন হয়ে ওঠে। যে চিন্তাবিদেরা মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তারাই সন্দেহকে আরও গভীর করেছেন।
 
শেষ পর্যন্ত, রাজনৈতিক ইসলামের ব্যর্থতা রাজনৈতিকের আগে দার্শনিক। এটি শক্তিকে সত্য ভেবে ভুল করে, নিয়ন্ত্রণকে দিশা ভাবে, মতাদর্শকে ধর্মের জায়গায় বসায়। আরেন্ট সতর্ক করেছিলেন, মতাদর্শ নৈতিক বিচার ধ্বংস করে; ফোগেলিন বলেছিলেন, আধ্যাত্মিকতাকে ইতিহাসে ঠেলে দিলে বিপর্যয় হয়; আসাদ বলেছিলেন, ঐতিহ্য টিকে থাকে জীবন্ত অনুশীলনে, বিমূর্ততায় নয়। শাস্ত্রীয় ইসলাম তা সহজেই বুঝেছিল।
 
রাজনীতি সে কারণে সংক্ষিপ্তভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে; নৈতিকতা সুবিশদভাবে। ইসলাম সত্য হতে হলে বিশ্ব দখল করতে হয় না, মানুষের বিবেক আলোকিত করলেই যথেষ্ট। ভারতে ইসলামের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হলে দরকার মতাদর্শের কারাগার ছেড়ে এমন এক ইসলামকে ফিরিয়ে আনা, যে ইসলাম আধিপত্য ছাড়াই আত্মবিশ্বাসী, আর বর্জন ছাড়াই গভীর।