প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে কলমের প্রতিবাদ: সেরা বাঙালির সম্মানে ভূষিত কবি ও সাহিত্যিক ফিরোজা বেগম

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 19 h ago
কবি ও সাহিত্যিক ফিরোজা বেগম
কবি ও সাহিত্যিক ফিরোজা বেগম
 
দেব কিশোর চক্রবর্তী 

গ্রামীণ সমাজের সীমাবদ্ধতা, লিঙ্গবৈষম্য ও পারিবারিক প্রতিকূলতার কঠিন বাস্তবতাকে অতিক্রম করে যিনি কলমকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তিনি কবি ও সাহিত্যিক ফিরোজা বেগম। তাঁর জীবন একদিকে সংগ্রামের দলিল, অন্যদিকে মানবিক চেতনা ও সাহিত্যসাধনার উজ্জ্বল নিদর্শন।
 
১৯৫৮ সালের ৩১ মার্চ (বাংলা ১৩৬৪ সালের ১৭ চৈত্র) পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার রামপুরহাট মহকুমার যুবুনী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মল্লিক পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা আব্দুল হাকিম মল্লিক ও মাতা আরেস্তুন বিবির সন্তান ফিরোজা বেগম শৈশব থেকেই গ্রামীণ জীবনের দারিদ্র্য, রোগব্যাধি ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। বসন্ত রোগের ভয়াবহ সময়ে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের আত্মত্যাগ তাঁর মানবিক চেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
 

যে সময় গ্রামীণ সমাজে নারীশিক্ষা ছিল প্রায় অবহেলিত, সেই সময় প্রবল সামাজিক বাধা অতিক্রম করে তিনি প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবনে বৈষম্য ও অবহেলার অভিজ্ঞতা তাঁর লেখনীর ভাষাকে করেছে তীক্ষ্ণ, প্রতিবাদী ও সংবেদনশীল। প্রিয় শিক্ষকদের উৎসাহ ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিই ছিল তাঁর প্রধান শক্তি।
 
১৯৭৪ সালে বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক শিক্ষক নুরুল হক মল্লিকের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। স্বামীর উদার মানসিকতা ও প্রেরণায় সংসার ও সাহিত্য, দু’দিকই সমানভাবে সামলে এগিয়ে চলেন তিনি। চার কন্যাসন্তানকে শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে তোলার মধ্য দিয়ে নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করেন। ২০১৬ সালে স্বামীর প্রয়াণ তাঁর জীবনে গভীর শূন্যতা এনে দিলেও সাহিত্যচর্চায় তিনি থেমে যাননি।
 
ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। ১৯৯২ সাল থেকে নিয়মিত কবিতা, গান ও প্রবন্ধ রচনায় তিনি নিজস্ব সাহিত্যভাষা গড়ে তুলেছেন। মুর্শিদাবাদ, রামপুরহাট ও কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা, প্রগতি, ত্রিনয়নী, কলম, ভাবনা, সংবাদ দর্পণ, রোদ্দুর, অর্পণ প্রভৃতিতে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি বেতার ও রেডিও অনুষ্ঠানে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পরিচিত করে তোলে।
 
কবি ফিরোজা বেগম
 
২০১০ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “নয়নতারা” এবং ২০১৪ সালে “অপরাজিতা”, এই দুই গ্রন্থে নারীর সংগ্রাম, জীবনের প্রতিকূলতা ও মানবিক চেতনার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। অসুস্থতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজ হাতে প্রুফ সংশোধন করে গ্রন্থ প্রকাশ তাঁর অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল উদাহরণ।
 
সাহিত্যসাধনায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে কবি ফিরোজা বেগম একাধিক সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। রামপুরহাটের ভাবনা ও অনুভবের ডানা পত্রিকার সংবর্ধনা, রোদ্দুর পত্রিকার রকেয়া পুরস্কার, কলকাতা ও বহরমপুরের বিভিন্ন বেতার কেন্দ্রের শংসাপত্র, নিউ ব্যারাকপুর থেকে প্রাপ্ত আম্বেদকর শিল্পী রত্ন পুরস্কার, এর পাশাপাশি সম্প্রতি আশা ফাউন্ডেশন থেকে “সেরা বাঙালি” সম্মানে ভূষিত হওয়া তাঁর সাহিত্য ও মানবিক কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
 
কবি ফিরোজা বেগমের জীবন কেবল একজন সাহিত্যিকের আত্মকথা নয়, এটি এক সংগ্রামী নারীর সাহসী দলিল। তাঁর কলম আজও সাক্ষ্য দেয়, প্রতিকূলতার গভীর অন্ধকারেও শিক্ষা, মানবিকতা ও সাহিত্য মানুষের পথ আলোকিত করতে সক্ষম।