শবে বরাত: আশা, করুণা ও আত্মশুদ্ধির পবিত্র রজনী

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 21 h ago
শবে বরাতের দিন পূর্বপুরুষদের কবরে মানুষের মোমবাতি জ্বালানোর দৃশ্য
শবে বরাতের দিন পূর্বপুরুষদের কবরে মানুষের মোমবাতি জ্বালানোর দৃশ্য
 
ইমান সাকিনা

শবে বরাত, যার অর্থ ক্ষমার রাত বা নরকের শাস্তি থেকে মুক্তির রাত, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বহু মুসলমানের আধ্যাত্মিক চেতনায় একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ইসলামি চন্দ্রবর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শাবানের ১৫ তারিখের রজনী হিসেবে পরিচিত এই রাতটি আত্মসমালোচনা, অনুশোচনা এবং আল্লাহর অশেষ রহমতের প্রত্যাশার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
 
যদিও অঞ্চলভেদে শবে বরাত পালনের রীতি কিছুটা আলাদা দেখা যায়, এর মূল তাৎপর্য সর্বত্রই একই। ইসলামের শিক্ষা, আল্লাহর অনন্ত করুণা এবং রমজানকে সামনে রেখে আত্মিক প্রস্তুতির মর্ম এই রাতেই ফুটে ওঠে। শবে বরাত কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; বরং এটি নবীকরণের, আশাবাদের এবং করুণাময়তার রজনী।
 

এই রাত অগণিত মুসলমানকে উৎসাহিত করে নিজের ভুলত্রুটি শোধরানোর জন্য ক্ষমা চাইতে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির চেষ্টা করতে। সঠিক উপলব্ধি ও আন্তরিক চিত্তে পালন করলে শবে বরাত মনে করিয়ে দেয়, প্রত্যেক মানুষই ক্ষমার যোগ্য, আর আল্লাহর দয়া মানুষের সকল ভুলের ঊর্ধ্বে।
 
‘বরাত’ শব্দটি আরবি ‘বারাআত’ থেকে এসেছে, যার অর্থ স্বাধীনতা, ক্ষমা অথবা মুক্তি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, শবে বরাত হলো এমন এক রজনী যখন আল্লাহ তাঁর রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং মানুষ আন্তরিকতার সঙ্গে অতীতের পাপের জন্য ক্ষমা চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেন।
 
ইসলামি বর্ণনায় শাবান মাসের ১৫ তারিখের রজনীর গুরুত্ব নিয়ে উল্লেখ রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, অহংকার, হিংসা বা শিরকের মতো গুরুতর পাপকারীদের বাদ দিয়ে আল্লাহ তাঁর সকল সৃষ্টিকে ক্ষমা করেন এবং যারা আন্তরিক তাওবা করে, তাঁদের তিনি ক্ষমা দান করেন। যদিও কিছু বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে, তবুও অধিকাংশের মত, এই রাত ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করে এবং গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে।
 
শবে বরাতের দিন মক্কা মসজিদে মানুষের নামাজ পড়ার দৃশ্য
 
ইসলামি ইতিহাসের প্রথম থেকেই এই রাতকে রমজানের পূর্বপ্রস্তুতির সময় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কারণ এই রাত সাধারণ সময় থেকে রমজানের কঠোর আত্মসংযম ও ইবাদতের মাসে প্রবেশের একটি সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, রমজানের মতো মহিমান্বিত এক মাসের পূর্বে হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা আবশ্যক। বহু শতাব্দী ধরে শবে বরাত বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশে, সংস্কৃতির প্রভাবে নানা সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক প্রথার বিকাশ ঘটিয়েছে।
 
রাত্রির ইবাদত
 
অগণিত মুসলমান এই রাতটি নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত এবং ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে অতিবাহিত করে। অনেক মসজিদ দীর্ঘ সময় খোলা থাকে, যা মানুষের মধ্যে ভক্তি, শান্তি এবং ধ্যানমগ্ন পরিবেশ সৃষ্টি করে।
 
রোজা
 
কেউ কেউ আধ্যাত্মিক অনুশাসনের ধারাবাহিকতায় পরদিন রোজা রাখেন। নবী মুহাম্মদ (সা.) শাবান মাসে অধিক রোজা রাখতেন, এই সুন্নত থেকেই এ চর্চার উৎপত্তি।
 
দান ও দয়া
 
শবে বরাত উপলক্ষে বা এর আশপাশের দিনে দান-খয়রাত করা সাধারণ রীতি। দরিদ্রকে খাদ্য দান, প্রতিবেশীকে সাহায্য করা কিংবা কলহ নিরসন, এসবকেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
 
কবর জিয়ারত
 
অনেক এলাকায় মানুষ মৃত স্বজনদের জন্য দোয়া করতে কবরস্থানে যায়। এই প্রথা জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের স্মরণ করিয়ে দেয় এবং নম্রতা ও নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।
 
সম্প্রদায় ও পারিবারিক আচার
 
কিছু সংস্কৃতিতে ঘরবাড়ি সাজানো হয় আলো দিয়ে, বিশেষ উপাদেয় খাবার প্রস্তুত করা হয় এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে খাদ্য ভাগাভাগি করা হয়। এগুলো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, তবে রাতের সঙ্গে যুক্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতিফলন বহন করে।
 
শবে বরাতের দিন পূর্বপুরুষদের কবরে মানুষের মোমবাতি জ্বালানোর দৃশ্য
 
ইসলামিক পণ্ডিতরা শবে বরাত পালনে সবসময় সংযম ও আন্তরিকতার পরামর্শ দিয়েছেন। অতিরিক্ত ইবাদত বা অনুতাপকে উৎসাহিত করলেও তাঁরা সতর্ক করেছেন, সাংস্কৃতিক অভ্যাসকে কখনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় আমল হিসেবে ধারণ করা ঠিক নয়। এই রাতের প্রকৃত মাহাত্ম্য বাহ্যিক আচার নয়, বরং অন্তরের পরিবর্তন, আন্তরিক তাওবা এবং সৎ চরিত্রের বিকাশে।
 
আজকের ব্যস্ত জীবনে শবে বরাত মানুষকে থেমে চিন্তা করার, আত্মমগ্ন হওয়ার সুযোগ দেয়। এটি দুনিয়ার ভিড় থেকে দূরে সরে আল্লাহর সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক গঠনের আমন্ত্রণ জানায়। সর্বোপরি, শবে বরাত স্মরণ করিয়ে দেয়, সত্যিকারের ক্ষমা শুধুমাত্র শব্দে নয়; বরং আচার-ব্যবহারে পরিবর্তন, সম্পর্কের উন্নতি, খারাপ অভ্যাস পরিহার এবং করুণা প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়।
 
রমজান মাসের আগমন সামনে রেখে শবে বরাত এক আধ্যাত্মিক প্রবেশদ্বারের ভূমিকা পালন করে। এটি নেক ইচ্ছাগুলোকে নবায়ন, হৃদয়কে পরিশুদ্ধ এবং গভীর ঈমান ও আত্মসংযমের এক মাসের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার এক সুবর্ণ সুযোগ।