দরগাহে বসন্তের রঙে ভারতের একতা: সুফি পরম্পরায় বহুত্বের উৎসব

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 9 d ago
দরগাহে বসন্তের রঙে ভারতের একতা: সুফি পরম্পরায় বহুত্বের উৎসব
দরগাহে বসন্তের রঙে ভারতের একতা: সুফি পরম্পরায় বহুত্বের উৎসব
 
হজরত সৈয়দ নাসিরুদ্দিন চিশতি

ভারত কেবল একটি ভৌগোলিক সত্তা নয়; এটি সভ্যতা, ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের এমন এক মিলনভূমি, যা যুগের পর যুগ বৈচিত্র্যকে আত্মস্থ করে গড়ে তুলেছে এক যৌথ সংস্কৃতি। এই সমন্বিত উত্তরাধিকারটির সবচেয়ে সুন্দর ও প্রাণবন্ত প্রকাশ দেখা যায় দরগাহে পালিত বসন্ত উৎসবে, যা আজও ভারতের সমন্বয়বাদী পরম্পরা ও বহুত্ববাদী চেতনাকে জীবন্ত করে রাখে।
 
দরগাহে বসন্ত উদ্‌যাপনের রীতি গভীর ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুফি সাধকরা ধর্মকে কেবল আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং প্রেম, মানবতা ও সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বার্তায় তাকে রূপ দিয়েছেন। তাঁদের কাছে আধ্যাত্মিকতার অর্থ ছিল মানবসেবায় নিজেকে নিবেদন করা এবং হৃদয়কে হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত করা। বসন্তের মতো সাংস্কৃতিক উৎসবের মাধ্যমে সুফি পরম্পরা এমন এক মঞ্চ তৈরি করেছে, যেখানে ধর্ম, জাতি ও সামাজিক বিভেদ আপনাতেই গৌণ হয়ে যায়।
 

বসন্ত ঋতু নিজেই নবজীবন, আশা ও আনন্দের প্রতীক। প্রকৃতির নবসৃজনের সঙ্গে যুক্ত এই উৎসব যখন দরগাহে উদ্‌যাপিত হয়, তখন তার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক তাৎপর্য আরও গভীর হয়। এসব উপলক্ষে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে সমবেত হন; ফুল অর্পণ করেন, চাদর পেশ করেন এবং প্রার্থনায় অংশ নেন। এই দৃশ্য ভারতের সেই পরম্পরাকেই প্রতিফলিত করে, যেখানে বিশ্বাস মানুষকে ভাগ করে না, বরং একসূত্রে বাঁধে।
 
ভারতের যৌথ সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ধর্মীয় পরম্পরাগুলি পরস্পরের সঙ্গে সদা সংলাপে থেকেছে। দরগাহে বসন্তের আয়োজন সেই সাংস্কৃতিক সংলাপেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি জানিয়ে দেয় যে, ভারতের আধ্যাত্মিকতা কখনও সংকীর্ণ ছিল না; বরং সবসময়ই ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক। এমন উৎসব এই ভাবনাকে দৃঢ় করে যে ধর্মের মূল লক্ষ্য প্রেম ও ঐক্য, বিভাজন নয়।
 
দরগাহে বসন্ত  উদ্‌যাপনের একটি দৃশ্য
 
দরগাহগুলো যুগের পর যুগ শান্তি ও সম্প্রীতির কেন্দ্র হিসেবে বিরাজ করেছে। আজমের শরিফের মতো প্রসিদ্ধ দরগাহ থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সুফি সাধকদের মাজার, সবই সকল শ্রেণি ও পটভূমির মানুষের জন্য উন্মুক্ত। এখানে কারও ধর্মীয় পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান জিজ্ঞাসা করা হয় না। বসন্ত উপলক্ষে এসব স্থানে যে জনসমাগম দেখা যায়, তা প্রমাণ করে, যৌথ পরম্পরা সামাজিক বন্ধনকে মজবুত করে এবং সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
 
বর্তমান সময়ে, যখন ধর্মীয় বিভেদকে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থে উসকে দেওয়া হচ্ছে, তখন দরগাহে বসন্ত উদ্‌যাপন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এই পরম্পরা অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ শক্তিশালী বার্তা বহন করে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ভারতের সভ্যতাগত শক্তি নিহিত আছে বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করে তাকে উৎসবে রূপ দেওয়ার ক্ষমতায়।
 

ভারতকে প্রায়ই এক অমূল্য মালার সঙ্গে তুলনা করা হয়, যেখানে নানা ধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মুক্তো গাঁথা। দরগাহে বসন্ত উৎসব সেই মালারই এক অনন্য মুক্তো, যা দেশের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। এই পরম্পরাগুলিই ভারতকে বিশ্বমঞ্চে এমন এক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যেখানে বহুত্ব দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি।
 
দরগাহে বসন্ত কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহমান এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এই পরম্পরা জানায়, মানুষের পরিচয় কোনো একক ধর্মীয় লেবেলে সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রকৃত পরিচয় মানবতা ও সামষ্টিক অংশগ্রহণে। এই দর্শনই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের ঐক্যকে অটুট রেখেছে, সময় যতই চ্যালেঞ্জিং হোক না কেন।
 
দরগাহে বসন্ত  উদ্‌যাপনের একটি দৃশ্য
 
যতদিন দরগাহে বসন্তের মতো উৎসব উদ্‌যাপিত হবে, ততদিন ভারতের যৌথ সংস্কৃতির আত্মা জীবিত থাকবে। এসব পরম্পরা প্রেম, শান্তি ও সহাবস্থানের সেই মূল্যবোধের জীবন্ত সাক্ষ্য, যা এই দেশের আত্মাকে সংজ্ঞায়িত করে। দরগাহে ফুটে ওঠা বসন্ত কেবল ঋতু পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়; এটি সেই আশার প্রতীক, যেখানে ভারতের বৈচিত্র্য ঐক্যে রূপান্তরিত হয়।
 
(হজরত সৈয়দ নাসিরুদ্দিন চিশতি- উত্তরাধিকারী, আজমের দরগাহ প্রধান ও চেয়ারম্যান, অল ইন্ডিয়া সুফি সাজ্জাদানশীন কাউন্সিল)