মাঠের আল ধরে কবিতার যাত্রা: সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ‘কবিতাওয়ালা’ আজিবর

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 9 d ago
মাঠের আল ধরে কবিতার যাত্রা: সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ‘কবিতাওয়ালা’ আজিবর
মাঠের আল ধরে কবিতার যাত্রা: সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ‘কবিতাওয়ালা’ আজিবর
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

সোশ্যাল মিডিয়া (Social Media)-র পর্দায় ইদানীং এক দৃশ্য বারবার ফিরে আসছে—সবুজ মাঠ, সরু আলপথ, দূরে খোলা আকাশ। সেই আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ান এক মানুষ। কোনও মঞ্চ নেই, নেই আলো বা সাজসজ্জা। আছে শুধু প্রকৃতি আর কবিতা। তাঁর নাম আজিবর। ‘কবিতাওয়ালা’ (Kabitawala) নামের পেজে প্রকাশিত তাঁর কবিতাপাঠের ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল (Viral Video)। অল্প সময়ের মধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর কণ্ঠে কবিতা শুনে থমকে যাচ্ছেন।
 
ভিডিওগুলির শুরুতেই আজিবর কবিতার প্রসঙ্গ টেনে নেন গল্পের ভঙ্গিতে। তারপর ধীরে ধীরে উচ্চারণে উঠে আসে বাংলা সাহিত্যের চেনা পঙ্‌ক্তি। কখনও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের (Sunil Ganguly) ‘শুধু কবিতার জন্য’, কখনও জীবনানন্দ দাশের (Jibanananda Dash) ‘আবার আসিব ফিরে’, আবার কখনও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর (Nirendranath Chakraborty) ‘অমলকান্তি’। বহুবার মঞ্চে শোনা এই কবিতাগুলি মাঠের আল ধরে দাঁড়িয়ে এক চাষির কণ্ঠে যেন নতুন করে প্রাণ পায়। শহুরে কৃত্রিমতার বাইরে এসে কবিতা ফিরে যায় তার মূলের কাছে—জীবনের কাছে।
 

এই কবিতাপাঠ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এক একটি ভিডিও কয়েক লক্ষ ভিউ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মন্তব্যের ঘরে প্রশংসার ঢল—কেউ লিখছেন, “এটাই আসল কবিতা”, কেউ আবার বলছেন, “মাটির গন্ধ পাওয়া যায়।” অনেকেই জানিয়েছেন, আজিবরের কণ্ঠে কবিতা শুনে তাঁদের চোখ ভিজে গেছে। শুধু আবৃত্তি নয়, আজিবরের স্বরচিত কবিতাও ইতিমধ্যেই আলাদা করে নজর কেড়েছে। তাঁর লেখায় উঠে আসে মাঠ, ফসল, শ্রমের ক্লান্তি, গ্রামজীবনের নীরব বেদনা আর সাধারণ মানুষের প্রেম ও প্রত্যাশা।
 
এই হঠাৎ পাওয়া খ্যাতি আজিবরের জীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে। ফোনে কথা বলতে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেমন লাগে এই পরিচিতি? খানিকক্ষণ থেমে তিনি বললেন, “কবিখ্যাতি বড় বিষম বস্তু।” কথাটার মধ্যে যেমন রসিকতা আছে, তেমনই আছে অভিজ্ঞতার ভার। কারণ আজিবর আদতে একজন চাষি। মাটিই তাঁর জীবিকা। ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত খেতের কাজেই কাটে দিন। কবিতা তাঁর কাছে পেশা নয়, বরং জীবনের স্বাভাবিক প্রকাশ।
 
দিনের শেষে খেতের ধুলো ঝেড়ে যেমন তিনি ঘরে ফেরেন, তেমনই শব্দের ধুলো ঝেড়ে তিনি দাঁড়ান কবিতার লাইনে। ছোটবেলা থেকেই কবিতার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। গ্রামবাংলার পরিবেশেই কবিতার প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে। তাঁর হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore), চেতনায় কাজী নজরুল ইসলাম (Kazi Nazrul Islam)। কখনও বই পড়ে, কখনও রেডিওতে শোনা, কখনও মানুষের মুখে মুখে শোনা কবিতা—এইভাবেই তাঁর সাহিত্যচর্চা গড়ে উঠেছে।
 
সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে সেই ব্যক্তিগত চর্চাই আজ পৌঁছে যাচ্ছে বহু মানুষের কাছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে তো বটেই, বিদেশ বিভুঁই থেকেও বাঙালিরা আজিবরকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। প্রবাসে থাকা অনেকেই জানিয়েছেন, তাঁর কণ্ঠে কবিতা শুনে তাঁরা নিজেদের শিকড়ের কাছে ফিরে যান। এই প্রতিক্রিয়াকেই আজিবর তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন। “দূরের মানুষও যদি আমার কণ্ঠে কবিতায় আপন খুঁজে পান, সেটাই অনেক,” বললেন তিনি।
 
তবে খ্যাতির চাকচিক্য তাঁকে এখনও অস্বস্তিতে ফেলে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, চাষের কাজ ছেড়ে দেওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। কবিতা যেমন তাঁর শ্বাস, তেমনই মাটি তাঁর জীবন। সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিতি বাড়লেও তিনি নিজেকে আগে চাষিই ভাবেন। কবিতাপাঠ বা লেখা তাঁর কাছে আনন্দের জায়গা, আত্মপ্রকাশের মাধ্যম।
 
‘কবিতাওয়ালা’ নামের আড়ালে থাকা এই মানুষটি তাই আজও মাটিতে পা রেখেই হাঁটতে চান। মাঠের আল ধরে চলতে চলতেই তিনি কবিতার কথা বলেন, কবিতার লাইনে দাঁড়ান। তাঁর যাত্রা মনে করিয়ে দেয়—কবিতা শুধু মঞ্চে নয়, জীবনের মাঝেই তার আসল ঠিকানা।