ফরহান ইসরাইলি / আলওয়ার (রাজস্থান)
একসময় অপরাধ, দারিদ্র্য ও নেতিবাচক শিরোনামের ছায়ায় ঢাকা ছিল রাজস্থানের মেওয়াত অঞ্চল। সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এই জনপদকে ঘিরে ছিল হতাশা ও অনিশ্চয়তার গল্প। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ সেই মেওয়াতেই ধীরে ধীরে জেগে উঠছে শিক্ষার আলো, স্বপ্নের সাহস ও নতুন সম্ভাবনার ভাষা।
যেখানে একদিন যুবকদের হাতে দেখা যেত পাথর কিংবা অস্ত্র, সেখানে আজ জ্বলজ্বল করছে বই, ল্যাপটপ আর সরকারি চাকরির আশাবাদ। এই নীরব অথচ গভীর পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে আলওয়ারের মেও বোর্ডিং, জেলা মেও পঞ্চায়েতের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বিনামূল্যের কোচিং ও আধুনিক ই-লাইব্রেরি, যা শত শত তরুণ-তরুণীর জীবনে এনে দিয়েছে নতুন দিশা ও আত্মবিশ্বাস।
মেও বোর্ডিং- এর সেন্টারে শিক্ষার্থীরা
আলওয়ারের রোড নম্বর–২-এ অবস্থিত মেও বোর্ডিং চত্বরে ২০২১ সালে বিনামূল্যের কোচিংয়ের সূচনা হয়। লক্ষ্য ছিল সেই সব যুবকদের কাছে শিক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি পৌঁছে দেওয়া, যারা আর্থিক সংকট বা উপযুক্ত সুযোগের অভাবে এগোতে পারছিল না। আজ এই উদ্যোগের ফলাফল অত্যন্ত দৃশ্যমান ও অনুপ্রেরণাদায়ক। এখন পর্যন্ত ১০০-র বেশি তরুণ-তরুণী পুলিশ, শিক্ষা ও রাজস্ব দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি পরিষেবায় নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা আজ শুধু নিজেদের পরিবার নয়, গোটা সমাজের জন্যই অনুপ্রেরণা।
আধুনিক ই-লাইব্রেরি: জ্ঞানের নতুন ঠিকানা
মেও বোর্ডিং চত্বরে স্থাপিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ই-লাইব্রেরিটি এই উদ্যোগের মেরুদণ্ড। প্রতিদিন প্রায় ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী এখানে নিয়মিত পড়াশোনা করতে আসেন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রায় এক হাজারেরও বেশি বই রয়েছে এই লাইব্রেরিতে। একসঙ্গে ৫৫ জন পড়ুয়ার বসে পড়ার ব্যবস্থা, ফ্রি হাই-স্পিড ইন্টারনেট, আর ও পানীয় জল ও ওয়াটার কুলারের মতো সুবিধা এই কেন্দ্রটিকে আধুনিক ও কার্যকর করে তুলেছে। গত নয় মাসেই প্রায় ১৫০০ ছাত্রছাত্রী এখানে পড়াশোনা করেছেন, যা এই উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা ও জনপ্রিয়তার প্রমাণ।
মেও বোর্ডিং, জেলা মেও পঞ্চায়েতের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বিনামূল্যের কোচিং ও আধুনিক ই-লাইব্রেরি
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি
এই বিনামূল্যের কোচিংয়ে পুলিশ নিয়োগ, পাটওয়ারি, আরএএস, লিপিক, শিক্ষক নিয়োগসহ নানা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সুসংগঠিত প্রস্তুতি করানো হয়। অভিজ্ঞ শিক্ষক, বিষয় বিশেষজ্ঞ ও গাইডরা এখানে পড়ান। অফলাইন ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইন মাধ্যমেও পাঠদান করা হয়, যাতে পড়ুয়ারা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান। পাশাপাশি ১০০ জন ছাত্রের জন্য হস্টেলের ব্যবস্থাও রয়েছে, ফলে দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে আসা পড়ুয়াদের থাকা ও পড়াশোনায় কোনো অসুবিধা হয় না।
মোটিভেশন ও পথনির্দেশে ফিরছে আত্মবিশ্বাস
এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়মিত মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম। এখানে সেই সব যুবক-যুবতী নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন, যাঁরা কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের মাধ্যমে সরকারি চাকরি পেয়েছেন। তাঁদের কথা শুনে ছাত্রছাত্রীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং তাঁরা বুঝতে পারেন, সঠিক দিশা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় সাফল্য অর্জন সম্ভব। এর ইতিবাচক প্রভাব এতটাই গভীর যে, বহু যুবক যারা একসময় পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল, তারা আবার শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরেছে এবং অপরাধের পথ ছেড়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে মনোযোগী হয়েছে।
ছাত্রীদের জন্যও আসছে নতুন সুযোগ
জেলা মেও পঞ্চায়েতের অভিভাবক ও প্রাক্তন সদর শের মহম্মদ জানান, আপাতত এই ব্যবস্থা ছাত্রদের জন্য চালু করা হলেও অদূর ভবিষ্যতে ছাত্রীদের জন্যও বিনামূল্যের কোচিং, হস্টেল ও ই-লাইব্রেরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য সমাজের মানুষের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, যে কোনো ধর্ম বা জাতির হোক না কেন, প্রয়োজনমতো প্রত্যেক শিশুকেই সাহায্য করা হবে। তিনি মনে করেন, সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমই হলো শিক্ষা।
মেও বোর্ডিং- এর গ্রন্থাগারের একটি ছবি
শিক্ষাতেই বদলাবে মেওয়াতের চেহারা
আলওয়ার জেলায় মেও ও মুসলিম সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষ, আর শহরে প্রায় ৫০ হাজারের কাছাকাছি। তা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন সরকারি পরিষেবায় এই সম্প্রদায়গুলির অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। এই অসামঞ্জস্য দূর করতেই মেও বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যের কোচিং শুরু করা হয়েছিল। আজ তার ইতিবাচক ফল স্পষ্ট।
জেলা মেও পঞ্চায়েতের বিশ্বাস, শিক্ষা দিয়েই মেওয়াতের ছবি ও ভবিষ্যৎ বদলানো সম্ভব। যুবসমাজ যখন শিক্ষিত হবে, আত্মনির্ভর হবে এবং সমাজের মূল স্রোতে যুক্ত হবে, তখনই সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব। আজ মেওয়াতের এই পরিবর্তনের গল্প কোনো স্লোগান বা ভাষণের মাধ্যমে নয়, লেখা হচ্ছে বই, ক্লাসরুম আর কঠোর পরিশ্রমের কলমে। মেও বোর্ডিং-এর এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে; সঠিক ভাবনা, সৎ প্রচেষ্টা আর সমাজের সহযোগিতা থাকলে যে কোনো অঞ্চলই তার পরিচয় বদলে দিতে পারে।