পিছিয়ে পড়া শ্রেণির অধিকারের জন্য আজীবন সংগ্রাম করা রাজেশ খান মাছারি

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 Months ago
রাজেশ খান মাছারি
রাজেশ খান মাছারি
 
ডাঃ ফিরদৌস খান

দেশের মুসলিম সম্প্রদায়কে একটি অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় হিসেবে গণ্য করা হয়। সাচ্চার কমিটির একটি প্রতিবেদনে মুসলমানদের অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া বলে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের মূল স্রোতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকার সেই পরামর্শ কতটা কার্যকর করেছে, তা ভিন্ন বিষয়। তবে সাচ্চার কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই মুসলমানদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছিল। সমাজের সচেতন মানুষরা এগিয়ে এসেছিলেন এবং সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে উদ্যোগ শুরু করেছিলেন।

এমনই একজন ব্যক্তি হলেন হরিয়ানার সোনিপাতের ঈদগাহ কলোনির রাজেশ খান মাছারি। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী এবং সমাজসেবার জন্য পরিচিত। সংখ্যালঘু,দলিত,পিছিয়ে পড়া শ্রেণি ও নিপীড়িত মানুষের সমস্যাগুলি সরকার ও প্রশাসনের সামনে তুলে ধরার জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করে আসছেন।

রাজেশ খান মাছারি মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি পিছিয়ে পড়া শ্রেণির পরিবার থেকে এসেছেন। সেই কারণেই তিনি পিছিয়ে পড়া সমাজের দুঃখ-কষ্ট ও সমস্যাগুলি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন।
 
রাজেশ খান মাছারির নেতৃত্বে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
 
তিনি বলেন,“১৯৭৯ সালের ১০ জুলাই হরিয়ানার সোনিপাত  জেলার বাদশাহপুর মাছারি গ্রামে আমার জন্ম। আমরা পাঁচ ভাইবোন ছিলাম। আমার মা ছিলেন গৃহিণী। আমার পিতার পিতামহ চাঁদু জি ছিলেন সমাজের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং তিনি মহিষের ব্যবসা করতেন। আমাদের ব্যবসা হরিয়ানা থেকে দিল্লি, বাঘপত, গাজিয়াবাদ, হায়দরাবাদ ও মহারাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পড়াশোনা করে পরিবারের নাম উজ্জ্বল করাই ছিল আমার বাবা–মায়ের ইচ্ছা। আমি মীরাটের চৌধুরী চরণ সিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ এলএলবি সম্পন্ন করেছি। বর্তমানে আমি সোনিপাত আদালতে একজন আইনজীবী হিসেবে কর্মরত। এই কাজই আমার দৈনন্দিন জীবিকার মাধ্যম, যার দ্বারা আমার সংসার চলে।”

রাজেশ খান মাছারি সমাজসেবাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে আসছেন। তিনি একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশ ও সমাজের জন্য নিরলসভাবে সেবা করে যাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন,“সমাজসেবার প্রেরণা আমি আমার পরিবার থেকেই পেয়েছি। আমার মা কখনও কাউকে বিপদে পড়ে থাকতে সহ্য করতে পারতেন না। তাই যতটা সম্ভব তিনি দুঃস্থ মানুষকে সাহায্য করতেন। এই সাহায্য খাদ্য, শস্য ও কাপড়ের আকারে হতো। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের দুঃখ-কষ্টে তাঁরা সবসময় পাশে দাঁড়াতেন। আমার প্রয়াত পিতামহ চাঁদু সাক্কা সমাজের মানুষের সমস্যা সমাধান করে দিতেন। সমস্যা ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য লোকজন তাঁর কাছে আসত। তিনি সাধ্যমতো সবাইকে সাহায্য করতেন। আমিও তাঁদের মতোই হতে চেয়েছি।”
 

এক অনুষ্ঠানে রাজেশ খান মাছারি
 
নিজের জনসেবার বিষয়ে তিনি বলেন,“আমি ২০০৬ সাল থেকে হরিয়ানা কবরস্থান ব্যবস্থা সংগ্রাম সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের সমিতি কবরস্থানগুলির পরিচালনার কাজ করে আসছে। কবরস্থানগুলিতে বিদ্যুৎ ও জলের ব্যবস্থা করা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা, চারদেয়াল নির্মাণ এবং গাছপালা রোপণসহ নানা কাজ আমরা করে থাকি। এ ছাড়াও, পরিচয়হীন মৃতদেহের দাফনের কাজও আমাদের সমিতি করে থাকে।”

রাজেশ খান মাছারি তাঁর সাক্কা তথা আব্বাসি সম্প্রদায়কে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছেন। তিনি বলেন,“আমরা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী ওমপ্রকাশ চৌতালার সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছি এবং পিছিয়ে পড়া শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য লিখিত আবেদন জানিয়েছি। ২০০১–২০০২ সালে আমাদের এই প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ আব্বাসি সম্প্রদায়কে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির বি সি (এ) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আমাদের সংগঠন প্রায় আড়াই দশক ধরে কাজ করে আসছে। ২০০১–২০০২ সালে আমরা হরিয়ানা ও দিল্লির আব্বাসি সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ‘অখিল ভারতীয় আব্বাসি কল্যাণ সংঘ’ গঠন করি। সেই সময় আমাকে জেলা সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আমার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সংগঠনের জাতীয় সভাপতি হাজি চাঁদ খান আব্বাসি আমাকে হরিয়ানার প্রদেশ সভাপতির দায়িত্ব অর্পণ করেন।”

তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, পণপ্রথা ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সমাজে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করে আসছেন। তিনি বলেন,“আমি ১৯৯৮ সাল থেকে এই ক্ষেত্রে কাজ করছি। আমি চাই, অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের—বিশেষ করে কন্যাসন্তানদের—ভালো শিক্ষা দিন, কারণ শিক্ষা যেকোনো সম্প্রদায়ের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এটি আশাব্যঞ্জক যে মুসলিম সম্প্রদায় এখন তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।”
 
নিজের কন্যার সঙ্গে রাজেশ খান মাছারি
 
তিনি বলেন,“২০০৩ সালে আমার বিয়ের পর আমার স্ত্রী সুমন আব্বাসিও আমার সঙ্গে মিলিত হয়ে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে যুক্ত রয়েছেন। আমার স্ত্রী ঈদগাহ কলোনিতে আশা কর্মী হিসেবে কাজ করেন। তিনি নারীদের নানা সমস্যার কথা ভালোভাবে বোঝেন। আমরা বৃক্ষরোপণের প্রচার করে আসছি। পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গাছ বিশুদ্ধ বাতাস দেয়, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং জীবজগতের জন্য আবাসস্থল সৃষ্টি করে। গাছ আমাদের ফলমূল, ফুল, ঔষধ, কাঠসহ বহু সম্পদও সরবরাহ করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে বৃক্ষরোপণকে উৎসাহিত করা দরকার।”

যৌতুক প্রথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুসলিম সমাজে যৌতুকের কু-প্রথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে বহু মেয়ের জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও যৌতুকের কারণে পরিবার মেয়েদের বিয়ে দিতে অক্ষম হয়ে পড়ছে। বরপক্ষ অতিরিক্ত যৌতুক দাবি করে, কিন্তু পিতামাতার সেই সামর্থ্য থাকে না। ফলে উপযুক্ত পাত্রের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে মেয়েদের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যায়। আবার কোথাও যৌতুকের দাবিতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন বউমাকে নির্যাতন করছে। এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে।

যৌতুক সমাজের জন্য এক মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী তারা, যারা নিজেদের কন্যাদের বিয়েতে অতিরিক্ত যৌতুক দেয় এবং পরে তা প্রচার করে। তাদের প্রচুর অর্থ-সম্পদ রয়েছে এবং সমাজে মর্যাদা বাড়ানোর জন্য তারা কন্যার বিয়েতে জলের মতো টাকা খরচ করে। তাদের অর্থ আছে বলেই তারা এমন ব্যয় করতে পারে। কিন্তু গরিব মানুষের কাছে এত টাকা থাকে না। ধনী মানুষের এই প্রদর্শন সমাজে যৌতুকের মতো কু-প্রথাকে উৎসাহিত করছে। এটি বন্ধ করা জরুরি।

রাজেশ খান মাছারি তাঁর মানবসেবার উৎকৃষ্ট কাজের জন্য বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ২০১৭ সালে ভারতীয় আব্বাসি সংখ্যালঘু মহাসভা তাঁকে ‘আব্বাসি রত্ন পুরস্কার’ প্রদান করে। ২০২২ সালে সর্বভারতীয় আব্বাসি মহাসভা তাঁকে সম্মানপত্র দিয়ে সম্মানিত করে।