নয়াদিল্লি :
তামিলনাড়ু এমন এক ভূমি, যেখানে সমাজ বদলের নীরব অথচ শক্তিশালী উদ্যোগে এগিয়ে আসছেন বহু মুসলিম নারী ও পুরুষ। তাঁদের মধ্যে এই দশজন ব্যক্তি নিজেদের কাজ, চিন্তা ও সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন, মানবতা ও আশার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা পেরিয়ে, কখনও প্রতিকূল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে, তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন এবং অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করছেন, নিজেদের জীবন ও সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে।
মহম্মদ সেলিম
মহম্মদ সেলিমকে তামিলনাড়ুর নিজস্ব সেলিম আলি বলা যায়। তিনি সারা জীবন ভারতে বিপন্ন পাখি উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। আশ্চর্যের বিষয়, মোহাম্মদ সেলিম কখনও সংরক্ষণ জীববিদ্যা বা এমনকি জীববিদ্যায় কোনো কোর্সও করেননি। তিনি কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।তবে তাঁর হৃদয় সবসময়ই ছিল নির্বাক প্রাণীদের, পাখি, সাপ, কুকুর এবং অন্যান্য জীবের, কল্যাণের দিকে। বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণে আরও নিবিড় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি ‘এনভায়রনমেন্ট কনজারভেশন গ্রুপ’ নামে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করেন।
সোফিয়া আশরাফ
সোফিয়া আশরাফ কোনো সাধারণ র্যাপ শিল্পী নন। তিনি তাঁর শিল্পীসত্তা ও কণ্ঠকে সামাজিক পরিবর্তন এবং নারী ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চলেছেন। চেন্নাইয়ের অলিগলিতে র্যাপ গান গেয়ে তিনি নারীদের ঘিরে থাকা নানা স্টেরিওটাইপ, দেহসংক্রান্ত ট্যাবু এবং কর্পোরেট ব্যবস্থার ভণ্ডামিকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন।নারীদের সামাজিক অবস্থান, শারীরিক বাস্তবতা কিংবা সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্য, কোনো বিষয়েই তিনি আপস করেন না। ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার জন্য ইউনিয়ন কার্বাইডের বিরুদ্ধে তাঁর র্যাপ ভিডিও শিল্প ও প্রতিবাদের এক স্মরণীয় দৃষ্টান্ত।
জাকির হুসেন
জাকির হুসেন একজন ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী, যিনি নৃত্যের মাধ্যমে লিঙ্গ ও সম্প্রদায়গত নানা বাধা ভেঙেছেন। বর্তমানে তিনি ডিএমকের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে ক্ষমতায়নের পথে কাজ করছেন।পরিবারের আপত্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি পরিবারকে নিয়ে ভাবিনি, কারণ আমি একাই থাকতাম। আমি বিয়েও করিনি। জীবনের তরুণ বয়সের বড় অংশ আমি দেশের বাইরে কাটিয়েছি।” প্রায় ১৪ বছর তিনি বিদেশে ছিলেন এবং প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে অল্প সময়ের জন্য দেশে ফিরতেন, যখন বিদেশে কাজ থাকত না। তিনি কানাডা, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিতে বসবাস করে সেখানে ভারতীয়দের নৃত্যশিক্ষা দিতেন। তাঁর কথায়, “বিদেশে পারফর্ম করেই আমি পরিচিতি পাই।”
ফাতিমা মুজাফ্ফর আহমেদ
চেন্নাই কর্পোরেশনে আইইউএমএল-এর একমাত্র বিজয়ী ফাতিমা মুজাফ্ফর আহমেদ ২০২২ সালের তামিলনাড়ু স্থানীয় নির্বাচনে জয়ী হওয়া মোট ছয়জন মুসলিম নারী কাউন্সিলরের অন্যতম। রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসায় তাঁর জয় অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল না, কারণ নির্বাচন লড়াই তিনি ছোটবেলা থেকেই দেখে বড় হয়েছেন।তিনি স্মরণ করেন, তাঁর বাবা এ কে আবদুল সামুদ, আইইউএমএল-এর প্রাক্তন জাতীয় সাধারণ সম্পাদক, ভেলুর কেন্দ্র থেকে দু’বার লোকসভা এবং দু’বার রাজ্যসভায় প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তবে আরামদায়ক পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জনসেবার পথ বেছে নেওয়া ছিল ফাতিমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
কীরানুর জাকিররাজা
কীরানুর জাকিররাজা একজন তামিল লেখক, যিনি সাধারণ মানুষের জীবনের গভীরে প্রবেশ করতে ভালোবাসেন, বিশেষ করে সমাজের প্রান্তিক মানুষের। তিনি আজ তামিল সাহিত্যজগতে এক উল্লেখযোগ্য নাম।তাঁর উপন্যাসের পাতায় তামিলনাড়ু ও কখনও কখনও কেরালার প্রান্তিক মুসলিম পুরুষ, নারী ও শিশুরা নতুন করে শ্বাস নেয়, নতুন জীবন খুঁজে পায়। তাঁর লেখনী সাহসী, সৎ এবং প্রায়ই রাজ্যের মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল ও গোঁড়া অংশের সমালোচনার মুখে পড়ে।
নিখাত ফাতিমা সোহেল
নিখাত ফাতিমা সোহেল চেন্নাইয়ের এমডব্লিউএ ম্যাট্রিকুলেশন স্কুলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি ‘অ্যাকাডেমি ফর উইমেন’-এর কো-চেয়ার এবং মুসলিম যুবক ও নারীদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করা একাধিক সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত।
প্রিন্স অব আর্কট নবাবজাদা মহম্মদ আসিফ আলি
আর্কটের রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী নবাবজাদা মহম্মদ আসিফ আলি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও দানশীলতার এক পরিচিত মুখ। একই সঙ্গে তিনি একজন প্রতিভাবান সংগীতশিল্পীও।
আর্কটের প্রিন্স পরিবার চেন্নাইয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে নীরব কিন্তু স্থায়ী প্রভাব রেখে চলেছে। তাঁদের প্রাসাদ আর্কট ফাউন্ডেশনের নেতৃত্বে বহু মানবিক উদ্যোগের কেন্দ্র। বর্তমান প্রিন্স নবাব মহম্মদ আবদুল আলি সকলের কাছে শ্রদ্ধেয় হলেও, দৈনন্দিন ত্রাণ, আন্তঃধর্মীয় অনুষ্ঠান ও নানা সামাজিক উদ্যোগ মূলত তাঁর পুত্র নবাবজাদা আসিফ আলির হাতেই পরিচালিত হয়। ধর্মনির্বিশেষে দরিদ্র মানুষের জন্য আর্কট ফাউন্ডেশনের অসংখ্য ছোট ছোট ত্রাণকার্যে তাঁর উপস্থিতি গভীরভাবে অনুভূত হয় ।
মহম্মদ উসমান, মাদ্রাসা ইমদাদিয়ার প্রতিষ্ঠাতা
আশরাফ খান চেন্নাইয়ের একটি বেসরকারি কলেজে তামিল পড়ান। জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন এই ব্যক্তি তামিলনাড়ুর রানিপেটের কাছে মেলভিশারামে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য একটি ছোট মাদ্রাসায় ব্রেইল শেখেন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় একসময় তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো আশাই ছিল না। আজ তিনি মাসে প্রায় ৫০,০০০ টাকা উপার্জন করেন, যা সম্ভব হয়েছে শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার কারণে।
খান তাঁর জীবনের এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব দেন মহম্মদ উসমানকে, যিনি মাদ্রাসা ইমদাদিয়া নামে একটি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থা সবচেয়ে বঞ্চিত পটভূমির অন্ধ ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তা করে। খান সহজ কথায় বলেন, “শিক্ষাই আমার জীবন বাঁচিয়েছে।” তামিলনাড়ুর এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মাদ্রাসায় ব্রেইলের মাধ্যমে পড়াশোনা হয় এবং ব্রেইল বই প্রকাশ করা হয়, সবই মোহাম্মদ উসমানের উদ্যোগ ও দূরদৃষ্টির ফল।
বহুভাষাবিদ মাহমুদ আক্রম
১৯ বছর বয়সে মাহমুদ আক্রম প্রায় ৪০০টি ভাষা শিখেছেন এবং প্রায় ৪৬টি ভাষায় সাবলীল। দশ বছর বয়সে তিনি এক ঘণ্টারও কম সময়ে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ২০টি ভিন্ন লিপিতে লিখেছিলেন। বারো বছর বয়সে, ৭০ জন ভাষাবিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তিনি তিন মিনিটের মধ্যে অন্য সবার চেয়ে বেশি ভাষায় একটি বাক্য অনুবাদ করে রেকর্ড গড়েন।
তামিলনাড়ুর বাইরে কাজ করার সময় ১৬টি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা এক বহুভাষাবিদ পিতার সন্তান হিসেবে আক্রম বড় হয়েছেন শব্দ, লিপি ও ধ্বনির আবহে। তবে তিনি সাক্ষরতা ও অনুধাবনের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করে বলেন, “যে ৪০০টি ভাষা আমি পড়তে ও লিখতে পারি, তার মধ্যে মাত্র ৪৬টি ভাষা আমি বুঝি।”
শরিফা খানম
নারী ক্ষমতায়নমূলক সংস্থা ‘স্টেপস’-এর প্রতিষ্ঠাতা শরিফা খানম বর্তমানে নারীদের জন্য একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছেন। তাঁর বিশ্বাস, মুসলিম নারীরা যখন অন্যায়ের শিকার হন, তখন তাঁদের যাওয়ার মতো কোনো জায়গা থাকে না।
হঠাৎ তালাক, ট্রিপল তালাক, ভরণপোষণ অস্বীকার, গৃহহিংসা ও অন্যান্য নির্যাতনের ঘটনাগুলি প্রায়ই পুলিশ ‘শরিয়ত’ বা মুসলিম পার্সোনাল ল-এর আওতায় পড়ে বলে এড়িয়ে যায়। এসব মামলা আবার পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত জামাতগুলির কাছে পাঠানো হয়, যেগুলিকে খানাম ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।