মহম্মদ সেলিম: প্রাণীর যত্ন ও সুরক্ষার জন্য এক অক্লান্ত সংগ্রামী

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 Months ago
মহম্মদ সেলিম
মহম্মদ সেলিম
 
শ্রীলতা এম / কোয়েম্বাটোর

ভারতের পাখি-সংরক্ষণ আন্দোলনের ইতিহাসে ‘সেলিম’ নামটি এক গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক। সেই নামের সঙ্গেই আবার যুক্ত হয়েছে আরেকটি অধ্যায়। তিনিও সালিম, মহম্মদ সালিম; যিনি নিঃশব্দ প্রাণের পক্ষে দাঁড়িয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছেন এক নিরলস পাখি ও প্রাণী সংরক্ষণকর্মী হিসেবে। কিংবদন্তি বার্ডম্যান সালিম আলির মতোই, প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা আর দায়বদ্ধতাই তাঁকে চালিত করেছে এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পথে।
 
কিন্তু তাঁর মন সবসময় টান অনুভব করত সেই নীরব প্রাণগুলোর দিকে; পাখি, সাপ, কুকুর ও আশপাশের অন্যান্য জীব, যাদের কণ্ঠ নেই। বিপন্ন প্রাণীদের রক্ষায় লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে তিনি গড়ে তোলেন একটি এনজিও, ‘দ্যা এনভায়রনমেন্ট কনজারভেশন গ্রুপ’ (The Environment Conservation Group)
 
মহম্মদ সেলিম
 
গত কয়েক বছরে ECG–র উদ্যোগে একের পর এক সচেতনতা অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যার মাধ্যমে বিপন্ন পাখি ও প্রাণী সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের নানা স্তরে। কর্পোরেট সংস্থার সহায়তায় সালিম ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে চারটি ‘সিক এক্সপেডিশন’ শুরু করেন। এই অভিযানে তিনি নানা বিপন্ন প্রজাতির অবস্থা খতিয়ে দেখেন, তথ্য প্রকাশ করেন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সচেতনতা গড়ে তোলেন।
 
প্রাণী ও পাখিকেন্দ্রিক এনজিও হওয়ায় প্রায়ই তাঁদের কাছে উদ্ধার সংক্রান্ত ফোন আসে। “ময়ূর বা সাপ উদ্ধারের অনুরোধ আসে। কিন্তু আমরা সেসব কাজের জন্য নিবেদিত অন্য এনজিওগুলোর কাছে ফোনগুলো পাঠিয়ে দিই। আমাদের মূল লক্ষ্য বিপন্ন প্রজাতি নিয়ে সচেতনতা তৈরি,” বলেন সেলিম
 
একটি অরণ্যে উদ্ধার অভিযানের সময় মহম্মদ সেলিম এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকরা
 
শুরুটা ছিল সাপ নিয়ে কাজ করে। ধীরে ধীরে তাঁরা বিশেষভাবে মনোযোগ দেন পরিযায়ী পাখির দিকে, বিশেষত ইন্ডিয়ান পিট্টা। এখন পাখি পড়ে যাওয়া, উড়তে না পারা বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার খবর আসে। কোয়েম্বাটোরের আশপাশে মূলত ময়ূর উদ্ধারের ফোনই বেশি। এই ধরনের উদ্ধারমূলক কাজ আবার অন্য এনজিওর কাছে পাঠানো হয়। সালিমের লক্ষ্য ছিল আরও বড়, দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিতে পাখি সংরক্ষণ। তাই ২০০৯ সালে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা শুরু করেন সিক এক্সপেডিশন।
 
এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল বিরল প্রজাতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং তাদের সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। প্রতিটি অভিযানেরই ছিল নির্দিষ্ট থিম। প্রথম অভিযানের বিষয় ছিল, রাস্তা দুর্ঘটনায় প্রাণীর মৃত্যু। বনাঞ্চলের মধ্যে উড়ালপুল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরাই ছিল তাঁদের বার্তা, যাতে মানুষ ও প্রাণীর সংঘর্ষ এড়ানো যায়।
 
২০১৫ সালে পাঁচজন সদস্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দুর্ঘটনায় মৃত প্রাণীদের ছবি তুললেন, তথ্য নথিভুক্ত করলেন। তারপর আশপাশের সরকারি স্কুলগুলোতে গিয়ে সচেতনতা ছড়ালেন। “আমরা মানুষকে বলেছি, রাস্তায় প্রাণীদের খাবার দেবেন না। এতে অজান্তেই আমরা তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছি,” বলেন তিনি।
 
একটি অরণ্যে কলেজের ছাত্র - ছাত্রীদের সঙ্গে মহম্মদ সেলিম
 
পোস্টার ও লিফলেটের মাধ্যমে তাঁরা জানিয়েছেন, প্রাণীদের মানুষের খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই; তারা নিজেরাই নিজেদের খাদ্য জোগাড় করতে সক্ষম। এই অভিযানে তাঁদের সহায়তা করেছিল মাহিন্দ্রা মোটরস ও ফোর্স মোটরস। পরবর্তী সিক এক্সপেডিশনে ফোকাস ছিল হিমালয়ের পাদদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিপন্ন প্রজাতিগুলোর উপর। উত্তর-পূর্ব অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল দু’টি কারণে, একটি ইতিবাচক, একটি নেতিবাচক।
 
ইতিবাচক দিকটি ছিল জাদব পায়েং, ভারতের ‘ফরেস্ট ম্যান’। অসমে বন্যার পর গাছহীন বালুচরে সাপের মৃত্যু দেখে যিনি একাই একটি সম্পূর্ণ বন গড়ে তুলেছিলেন। “তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার,” বলেন সেলিম। আইআইটি গুয়াহাটির ছাত্ররাও তাঁদের কাজে বড় সহায়তা করেছিলেন।
 
নেতিবাচক দিকটি ছিল প্রথাগত শিকার, যা পরিযায়ী পাখিসহ কিছু বিপন্ন প্রজাতির জন্য ক্ষতিকর। যে পাখিটির জন্য তাঁরা বিশেষভাবে কাজ করেন, সেটি আমুর ফ্যালকন, সাইবেরিয়া থেকে এসে উত্তর-পূর্ব ভারতে অল্প কিছুদিন থেকে আফ্রিকার পথে পাড়ি দেয়। “এই সময়টুকুতে তাদের সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। আমরা আমুর ফ্যালকন নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করেছি, এবং তা সফলও হয়েছে,” বলেন তিনি।
 
বনরক্ষীদের সাথে মহম্মদ সেলিম
 
তৃতীয় সিক এক্সপেডিশনটি ছিল রাজস্থানের বিপন্ন পাখিদের নিয়ে, যেখানে মূল ফোকাস ছিল গ্রেট ইন্ডিয়ান বাস্টার্ড। উচ্চ ভোল্টেজের তার ও উইন্ডমিলের কারণে এরা প্রায়ই মারা যাচ্ছিল। “মিডিয়া ও বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা এই বিষয়টি তুলে ধরেছি,” বলেন সেলিম
 
এই পাখিগুলো আকারে বড়, সহজে দিক বদলাতে পারে না। ফলে উইন্ডমিল বা তারের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তারা গুরুতর আহত হয় বা মারা যায়। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। আদালতের নির্দেশে এখন অনেক জায়গায় উচ্চ ভোল্টেজের তার মাটির নিচ দিয়ে নেওয়া হচ্ছে, আর উইন্ডমিলগুলো উজ্জ্বল রঙে রাঙানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে পাখিরা দূর থেকেই সতর্ক হতে পারে।
 
২০১৯ সালে জার্মান অপটিক্যাল নির্মাতা কার্ল জাইস–এর পৃষ্ঠপোষকতায় চতুর্থ সিক এক্সপেডিশন শুরু হয়। নির্বাচনজনিত কারণে মাঝপথে তা বন্ধ রাখতে হয়, পরে দক্ষিণ ভারতে আবার শুরু হয়। “এখানে পরিস্থিতি আলাদা। সচেতনতা বেশি, শিকার কম। কিন্তু বড় সমস্যা হলো দ্রুত হারিয়ে যেতে থাকা বাসস্থান,” বলেন তিনি। “অর্থের অভাবে আমরা কাজ চালিয়ে যেতে পারছি না। সংরক্ষণে আমরা দক্ষ, কিন্তু নিজেদের কাজ তুলে ধরতে, মার্কেটিংয়ে; আমরা দুর্বল,” বলেন সেলিম হতাশ স্বরে।
 
স্কুল শিক্ষার্থীদের সাথে একটি শিক্ষামূলক পরিদর্শনে মহম্মদ সেলিম
 
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলভাঙন বাড়ছে। এমন সময়ে আরও বেশি সচেতনতা দরকার। অথচ অর্থের অভাবে তাঁদের পক্ষে তেমন কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। “সারা বছরের অভিযানের জন্য মাত্র ১৫ লক্ষ টাকা দরকার। বড় সংস্থাগুলোর কাছে এটা কিছুই নয়। কিন্তু তাদের এটা অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে,” বলেন তিনি।
 
সালিম এবার পাড়ি দিচ্ছেন কেরালার উত্তরের আদিবাসী ও রেইনফরেস্ট অঞ্চল আট্টাপাড়িতে। “সেখানেই স্থায়ী হয়ে পরিবেশ সংক্রান্ত কাজ করব,” বলেন তিনি। কোয়েম্বাটোরে দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। “আমরা সবাই সরে যাচ্ছি,” বলতে গিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন, তাঁর সংগঠন ও পরিবার, দু’টিই একসঙ্গে নতুন পথে পা রাখছে।