'বুরখা র‍্যাপার' সোফিয়া আশরাফ: ছন্দে ছন্দে প্রতিবাদের সাহসী কণ্ঠ

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 Months ago
'বুরখা র‍্যাপার' সোফিয়া আশরাফ
'বুরখা র‍্যাপার' সোফিয়া আশরাফ
 
শ্রীলতা এম

চেন্নাইয়ের রাজপথে র‍্যাপের ছন্দে যখন প্রতিবাদের ভাষা ধ্বনিত হয়, তখন সেই কণ্ঠের নাম সোফিয়া আশরাফ। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জে. জয়ললিতার মৃত্যুর পর ভি. কে. শশিকলা অস্থায়ী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গানে গানে প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি নজর কেড়েছিলেন দেশজুড়ে। সেই সাহসী পরিবেশনাই শুধু একজন নতুন র‍্যাপারের আবির্ভাব ঘটায়নি, বরং তামিলনাড়ু ও ভারতের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে এক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল, সোফিয়া আশরাফ এসেছেন ক্ষমতা, বৈষম্য ও নীরবতার বিরুদ্ধে কথা বলতে। 
 
কিন্তু সোফিয়া কেবল একজন র‍্যাপার নন, তিনি তার চেয়েও অনেক বেশি। তাঁর র‍্যাপ যেন সমাজের মুখে ছোড়া এক তীক্ষ্ণ তিরস্কার, একজন নারী হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে যেসব প্রবণতা তাকে ক্ষুব্ধ করে, সেগুলোর বিরুদ্ধে। নিজের এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, র‍্যাপ মূলতই এক “রাগী মাধ্যম”, যা তাঁকে অস্বস্তিকর সত্যগুলো প্রকাশের শক্তি দিয়েছে। চেন্নাইয়ে বড় হয়ে ওঠা, মালাবার অঞ্চলের এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তার জীবনে বহু নিষেধাজ্ঞা এনেছিল। সেই কারণেই তিনি র‍্যাপ করেছেন পিতৃতন্ত্র ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে।
 
সোফিয়া আশরাফ
 
মঞ্চ, সঙ্গীত আর নৃত্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল চিরকালীন। কিন্তু নাচ, খেলাধুলা; এসব কিছুই তার জন্য অনুমোদিত ছিল না। একদিন তিনি দেখেন কেউ একজন খানিকটা অপরিপক্ব ভঙ্গিতে র‍্যাপ করছে। তখনই তাঁর মনে হয়, এটা তিনি আরও ভালো করতে পারবেন, আর এতে পারিবারিক নিয়মও ভাঙতে হবে না।এইভাবেই তাঁর র‍্যাপের যাত্রা শুরু। তখন তিনি হিজাব পরতেন, তাই ঘোমটার আড়ালেই চলত তাঁর র‍্যাপ। কলেজ জীবনে তাই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘বুরখা র‍্যাপার’ নামে।
 
নারী-সংক্রান্ত যে কোনো বিষয়েই তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও বানান। কখনও শেয়ার করেন তাঁর অনবদ্য আঁকা ছবি, যেগুলো নীরব হয়েও উচ্চকিত বক্তব্য রাখে। তাঁর ইনস্টাগ্রাম যেন সৃজনশীলতার এক গ্যালারি, ড্রয়িং, পেইন্টিং, অব্যক্ত অনুভূতি আর উচ্চারণহীন প্রতিবাদের সমাহার। নিজের এক ভিডিওতে তিনি বলেন, “পেশায় আমি কনটেন্ট ক্রিয়েটর, আর র‍্যাপার, হঠাৎ করেই।”
 
সোফিয়া আশরাফ
 
তাঁর গানে একদিকে যেমন উঠে এসেছে নারীর প্রশ্ন, তেমনই অন্যদিকে কর্পোরেট পরিবেশ-ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। হিজাব, ঋতুস্রাব, কিংবা সমাজের এই প্রত্যাশা, নারীকে সবসময় সুন্দর, সেক্সি ও ‘আকর্ষণীয়’ হতে হবে, এই সব নিয়েই তাঁর হাস্যরসাত্মক ভিডিও। হাসির আড়ালে থাকে তীক্ষ্ণ সত্য। তাঁর সাহসী বক্তব্যে রক্ষণশীল কারও চোখে হয়তো কৌতুকের ঝিলিক আসে, কিন্তু কথার সত্যতা গভীরভাবে নাড়া দেয়।
 
“Any Good News” গানটি ব্যঙ্গ করে সেই সামাজিক ধারণাকে, যেখানে একজন নারীর ‘ভাল খবর’ মানে কেবল বিয়ে বা গর্ভধারণ। গানে এক মা বারবার জিজ্ঞেস করেন, “কোনো ভালো খবর?” আর মেয়ে সেই প্রশ্নের অর্থ বদলে দেয়, ভালো চুলের দিন, প্রোমোশন, সবুজ সিগন্যাল, কিংবা অতিরঞ্জিত সাফল্য, মহাকাশে উড়ে যাওয়া, বৈশ্বিক সমস্যা সমাধান, আইএসআইএস শেষ করা বা সিরিয়ার সংকট মেটানো, এই সব দেখিয়ে দেয় সমাজের অগ্রাধিকার কতটা সংকীর্ণ।
 
“I Can’t Do Sexy” গানটি সমাজ নির্ধারিত সৌন্দর্যের মানদণ্ডের হাস্যকরতা উন্মোচন করে। “Forget washboard abs, I got washboard breasts / My ass is flatter than a dosa”, এই আত্মব্যঙ্গাত্মক, অতিরঞ্জিত পঙ্‌ক্তিগুলো দেখায় কীভাবে অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড একজন নারীকে নিজস্ব সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এই গান আত্মসম্মান ও নিজেকে যেমন তেমনভাবেই গ্রহণ করার উদযাপন।
 
'বুরখা র‍্যাপার' সোফিয়া আশরাফ একটি জনআন্দোলনে
 
“Period Pattu”-তে তিনি ঋতুস্রাব নিয়ে সরাসরি কথা বলেন, কোনো ঘুরপথে নয়। তামিলনাড়ু ও কেরালার লোকজ গল্পকথার ভঙ্গি, ভিল্লু পাট্টুর প্রশ্নোত্তর কাঠামো ব্যবহার করে তিনি আলোচনা করেন পিরিয়ড হাইজিন, ট্যাম্পন, কাপ, সব কিছুর ভালো-মন্দ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, এবং ভাঙেন দীর্ঘদিনের নীরবতার দেয়াল।
 
তাঁর নারীবাদের সম্পর্ক তাত্ত্বিক বা নাটকীয় নয়, এটি একান্তই বাস্তব। এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, ছোটবেলায় তিনি খেলতে, নাচতে, এমনকি স্বপ্ন দেখতেও বঞ্চিত হয়েছেন, শুধু মেয়ে বলেই। অনেক রাত তিনি প্রার্থনার আসনে বসে ঈশ্বরের কাছে কেঁদেছেন, যেন তাকে ছেলে হিসেবে পুনর্জন্ম দেওয়া হয়।
 
তিনি বলেন, যারা বলে নারীবাদ অপ্রাসঙ্গিক, তাদের তিনি ঈর্ষা করেন, কারণ তাদের সবকিছু অনুকূলে। “কিন্তু যতদিন একটি মেয়েও ঈশ্বরের কাছে ছেলে হয়ে জন্মানোর প্রার্থনা করবে, ততদিন নারীবাদ প্রাসঙ্গিক,”, তাঁর কণ্ঠে এই সত্য উচ্চারিত হয় দৃঢ়ভাবে। নিজের ওয়েবসাইটে তিনি বলেন, “ট্যাবু ভাঙে এমন নারী-কেন্দ্রিক কনটেন্টই আমার সবচেয়ে প্রিয়, তৈরি করতেও, দেখতেও।”
 
মঞ্চে র‍্যাপিং এর সময় সোফিয়া
 
তাঁর কাজের ভাণ্ডার সত্যিই সমৃদ্ধ, ১৫০টিরও বেশি ভিডিও পরিচালনা, No Filter Neha-র একটি সিজনের নির্দেশনা, Big Mouth, এবং আরও অনেক কিছু। তিনি বিদ্রোহী, র‍্যাপের ছন্দে। ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার শিকারদের জন্য গেয়ে তিনি ডাউ কেমিক্যালসের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান, যারা ইউনিয়ন কার্বাইড কিনেও দায় স্বীকার করেনি। গানে ধ্বনিত হয়,  “Don’t work for Dow…Wake up people… keep this evil away…”
 
এরপর আসে কোডাইকানালে ইউনিলিভারের বিরুদ্ধে তার বিখ্যাত র‍্যাপ ক্যাম্পেইন, যা আন্তর্জাতিক স্তরেও সাড়া ফেলে। যদিও কেরালার বাসিন্দা, সোফিয়ার বেড়ে ওঠা চেন্নাইয়ে। স্টেলা মেরিজ কলেজে গ্রাফিক ডিজাইনে এমএ পড়ার সময়ই তার র‍্যাপের শুরু। ৯/১১-পরবর্তী ইসলামোফোবিয়ার প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে হিজাব পরে মঞ্চে ওঠা এই র‍্যাপারই পরিচিত হন ‘বুরখা র‍্যাপার’ নামে।ইউনিলিভারের বিরুদ্ধে তাঁর ক্যাম্পেইন আলোচনায় এলেও, তাঁর কম-প্রচারিত গানগুলো আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় MTV/V চ্যানেলের সেই সময়ে, যেখানে ছিল কৌতুক, বুদ্ধিদীপ্ততা আর নির্ভীকতা।
 
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বিজ্ঞাপন জগতে কাজ করেছেন, O&M-এর মতো এজেন্সিতে স্ক্রিপ্ট লেখা ও বিজ্ঞাপন পরিচালনা। ‘এন্টার ফ্রেশ, ইয়ে ওয়ালা অ্যাড…’সহ বহু জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট তারই কলমে লেখা।
 
সোফিয়া আশরাফ
 
ব্যঙ্গ, হাস্যরস আর দৃপ্ততায় ভরা তাঁর সঙ্গীত কেবল তরুণদেরই নয়, এ. আর. রহমানের মতো কিংবদন্তিরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। Jab Tak Hai Jaan-এ “Jiya Re”, Maryan-এ “Sona Pareeya”, এই সব কাজে তিনি রহমানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রায় সাত বছর তার টিমের অংশ হিসেবে তিনি গান লেখা, র‍্যাপ, ভিডিও এডিটিং, পোশাক পরিকল্পনা, সোশ্যাল মিডিয়া ও স্টেজ ডিজাইনের দায়িত্ব সামলেছেন। নেটফ্লিক্সের Big Mouth সিরিজের সিজন ৭-এ তিনি র‍্যাপার, ভয়েস আর্টিস্ট ও লেখক হিসেবেও কাজ করেছেন।
 
এরপর কী? এখন সোফিয়া হিমালয়ের নীরবতায়, কোলাহল থেকে দূরে। তিনি কাজ করছেন এনজিও ক্রান্তি-র সঙ্গে, লালবাতি এলাকার শিশুদের জন্য বিকল্প বিদ্যালয়। তিনি বলেন, “মেয়েরা যদি একটা গানও প্রকাশ করে, আমি পৌঁছে যাব।”
 
যার জীবন, শিল্প আর ক্ষোভ, সবই ‘ক্রান্তি’ ঘটিয়েছে, তার বর্তমান ঠিকানার নামও ‘ক্রান্তি’, এই বিদ্রোহী শিল্পীর জীবনে যেন এক সুন্দর বিদ্রূপ। এখন তিনি মন দিচ্ছেন লেখালেখি ও চলচ্চিত্র নির্মাণে। তবে নতুন কোনো ট্র্যাক আসবে না, এমন কথাও তিনি বলেননি।