হুইলচেয়ার থেকে শুটিং স্টার হয়ে ওঠার আদিবা আলির যাত্রা

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 11 d ago
আদিবা আলি
আদিবা আলি
 
অনিকা মহেশ্বরী/নতুন দিল্লি

দিল্লির নিজামুদ্দিন বস্তির সরু গলিতে—যেখানে ইতিহাসের প্রতিধ্বনি মিশে যায় আধুনিক জীবনের শব্দে—সেখানে বাস করে ১৯ বছরের এক মেয়ে, যিনি শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ট্রমা অতিক্রম করে আজ শুটিং রেঞ্জের রানী হয়ে উঠেছেন।

এটাই প্যারা-অ্যাথলিট আদিবা আলির গল্প—যিনি শুধু প্যারা শুটিং জগতের উদীয়মান নক্ষত্র নন, আত্মসমর্পণ ও অসহায়তায় ডুবে থাকা বহু মানুষের অনুপ্রেরণা।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ভোপালের মধ্যপ্রদেশ স্টেট শুটিং অ্যাকাডেমিতে অনুষ্ঠিত ২৬তম ন্যাশনাল শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে আদিবা তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে সবাইকে চমকে দেন।
 
তার মা-র সাথে আদিবা আলি
 
তিনি অর্জন করেন দ্বিগুণ সাফল্য:– ৫০ মিটার পিস্তল (IPC) মিক্সড SH1 জুনিয়র ইভেন্টে ৪৬৭ স্কোর করে স্বর্ণপদক – ১০ মিটার এয়ার পিস্তল (IPC) জুনিয়র উইমেন SH1 ইভেন্টেও স্বর্ণপদক

কিন্তু আদিবার সাফল্য শুধু দুটি পদক জেতার গল্প নয়—এটি এক অদম্য অধ্যবসায়ের গল্প, যেখানে অক্ষমতা পরিণত হয়েছে তাঁর নতুন পরিচয়ে, কোনো প্রতিবন্ধকতায় নয়।

যতটা গৌরবোজ্জ্বল তাঁর সাফল্য—তাঁর সংগ্রামের কাহিনি ততটাই হৃদয়বিদারক। পাঁচ বছর আগে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা তাঁর জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়।
 

অন্যান্য প্যারা–অ্যাথলেটদের সঙ্গে আদিবা
 
পাঁচ বছর আগে, তিনি তাঁদের চতুর্থ তলার বাড়ির বারান্দা থেকে নিচে তাকাচ্ছিলেন। হঠাৎই তিনি পা পিছলে সরাসরি নিচের তলায় পড়ে যান। এই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় তাঁর মেরুদণ্ড ভেঙে যায় এবং তাঁর দুই পা অসাড় হয়ে যায়।

মা রেশমা আলি সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার পর যেন সবকিছু থমকে গিয়েছিল। আদিবা দেড় বছর শয্যাশায়ী ছিল। ওর যেন সব সাহস, সব প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে গিয়েছিল।”

এক প্রাণবন্ত, খেলাধুলাপ্রেমী মেয়ে হুইলচেয়ারে বন্দি—এ দৃশ্য পরিবার ও আত্মীয়দের জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

তবুও, ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নিতে শুরু করেন আদিবা। বিছানায় শুয়েই আঁকা-আঁকি ও পড়াশোনায় মন দেন। হতাশাকে রূপান্তর করেন সাহসে। তিনি ১২শ শ্রেণির পরীক্ষা দেন—আর উজ্জ্বল ফলাফলে উত্তীর্ণ হন। জ্ঞানপিপাসা ও চিত্রকলার প্রতি ভালোবাসা তাঁর সামনে একটি আলোকিত ভবিষ্যতের ছবি আঁকতে থাকে।

একদিন টেলিভিশনে তিনি দেখেন—অবনী লেখরা, ভারতের প্রথম মহিলা প্যারা-অ্যাথলিট যিনি শুটিংয়ে প্যারালিম্পিকে স্বর্ণ জিতেছেন।
 

আদিবা তাঁর পদক নিয়ে ছবি
 
এটাই তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। ঠিক সেই সময়ই আদিবা মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন—“ও পারলে, আমি কেন পারব না?”

এই প্রশ্ন শুধু সংকল্পই নয়—এ ছিল একটি নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। আদিবা বুঝতে পারেন যে, তিনি আর দুর্ঘটনার স্মৃতিতে ডুবে থাকতে পারেন না। তাঁকে এগোতে হবে, নতুন পথ খুঁজতে হবে—যেখানে তাঁর শারীরিক সীমাবদ্ধতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

দুর্ঘটনার আগে বাস্কেটবল ও ফুটবলে সক্রিয় ছিলেন আদিবা। এখন তিনি ভাবতে শুরু করেন প্যারা গেমস সম্পর্কে—যা তাঁর মতো মানুষদের মাধ্যমে বিশ্বকে নতুনভাবে গর্বিত করে তোলে।
 

তাঁর অনুসন্ধান তাঁকে দুজন পরামর্শদাতার কাছে নিয়ে যায়—তাঁর কোচ সুভাষ রানা এবং রোহিত স্যার। তারা আদিবাকে শুটিং খেলায় দীক্ষা দেন এবং ট্র্যাকে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেন।

মা রেশমা আলি স্মরণ করে বলেন, “আদিবা কখনো পিস্তল পর্যন্ত হাতে ধরেনি।” কিন্তু কোচ সুভাষ রানা তাঁর মধ্যে অসাধারণ সম্ভাবনা দেখতে পান। সুভাষ রানা এবং রোহিত স্যার তাঁকে পথ দেখান, আর সেই পথে আলোর প্রদীপ জ্বালান আদিবা—তার কঠোর পরিশ্রম দিয়ে।

শুরুটা কঠিন ছিল, কিন্তু আদিবা পিস্তল তুলে নেন অনুশীলনের জন্য। কোচ তাঁকে আরও কঠোরভাবে অনুশীলন করাতেন, আর আদিবা তা পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। আজ তার দৈনিক রুটিনে আট ঘণ্টার কঠোর অনুশীলন রয়েছে।

আদিবা বলেন, তিনি প্রতিযোগিতার জন্য টানা ১০ মাস অনুশীলন করেছেন এবং এই সময় তিনি জেলা, আঞ্চলিক ও প্যারা-ন্যাশনাল প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

আদিবার বাবা তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা এবং উৎসাহদাতা। তিনি সবসময় খেলাধুলার গুরুত্ব তুলে ধরতেন; ক্রিকেটের প্রতি তাঁর ভালোবাসা সবার জানা। আদিবা বলেন, “শিক্ষার মতোই খেলাধুলাও গুরুত্বপূর্ণ।”

এর পাশাপাশি, প্যারালিম্পিক স্বর্ণজয়ী অবনী লেখরা তাঁর আদর্শ। তাঁর ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই আদিবা শুটিংকে জীবনের একটি বড় অংশ বানিয়েছেন। আজ যদি তিনি একদিনও অনুশীলন মিস করেন, মনে হয় জীবনে কিছু একটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

আদিবা বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেকে বিশ্বাস করা। তুমি যদি হাল ছেড়ে দাও, তবে অন্য কেউ কেন তোমাকে সমর্থন করবে? পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, যদি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হও, সবই সম্ভব।”

তিনি মনে করেন, সামান্য বাধার সামনে হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

আদিবার মা রেশমা আলির এখন নতুন একটি স্বপ্ন আছে। তিনি বলেন, “আদিবা আমাদের গর্বিত করেছে। এখন আমরা চাই এই গল্প অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে। আমরা অনুপ্রেরণামূলক ক্যাম্প সংগঠিত করতে চাই।”

তাঁর স্বপ্ন হলো—প্রতিবন্ধী মানুষ ও তাদের পরিবারকে বুঝতে সাহায্য করা যে জীবনে নতুন করে শুরু করা সম্ভব, এবং প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেও অনেক বড় অর্জন করা যায়। তাঁর বার্তা পরিষ্কার:অক্ষমতা শেষ নয়, নতুন শুরুর দরজা।

হুইলচেয়ারে বন্দি এক মেয়ে থেকে শুটিং তারকা—এই যাত্রা হলো আশা ও সাহস নিয়ে জীবনকে নতুনভাবে দেখার জাদু।নতুন দিল্লির নিজামুদ্দিন বস্তির এই সাধারণ মেয়ে আজ দিল্লির পরিবর্তনের প্রতীক।

তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য—নিজের পারফরম্যান্স আরও উন্নত করা, যাতে একদিন ভারতের জন্য স্বর্ণপদক জিততে পারেন।

আদিবা আলির চোখে আজ ঝলসে ওঠে আশা আর দৃঢ় সংগ্রামের আগুন—“আমি কঠোর পরিশ্রম করতে চাই, খুব কঠোর।”