রহিম আলি: ব্যারাকপুরের মাঠ থেকে ভারতের জার্সি, এক লড়াকু ফুটবলারের অনুপ্রেরণার কাহিনি

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
রহিম আলি
রহিম আলি
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

ভারতীয় ফুটবলে প্রতিভার অভাব কখনও ছিল না। কিন্তু প্রতিভাকে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং অদম্য মানসিকতার সঙ্গে মিলিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারেন খুব কম খেলোয়াড়ই। সেই তালিকায় অন্যতম নাম পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরের সন্তান রহিম আলি। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে দেশের জার্সি গায়ে চাপানোর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তিনি। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আজ বাংলার অসংখ্য তরুণ ফুটবলারের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

২০০০ সালের ২১ এপ্রিল ব্যারাকপুরে জন্মগ্রহণ করেন রহিম আলি। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তাঁর নেশা। পাড়ার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতেই ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা সুযোগ-সুবিধার অভাব তাঁকে কখনও থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং প্রতিদিনের অনুশীলন, কোচদের পরামর্শ এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে ধীরে ধীরে তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন।
 
রহিম আলি
 
কৈশোরেই তাঁর প্রতিভা নজরে পড়ে কোচদের। দ্রুত গতি, বল নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভাঙার দক্ষতা এবং গোলের সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। ভারতের অনূর্ধ্ব-১৭ দলে সুযোগ পাওয়া তাঁর ফুটবলজীবনের প্রথম বড় সাফল্য। ২০১৭ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি এবং সেই সময়ের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলিতে অংশ নিয়ে তিনি বিশ্বমানের ফুটবলের স্বাদ পান। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় এবং আরও পরিণত ফুটবলার হয়ে ওঠার পথ খুলে দেয়।
 
তবে যুব ফুটবল থেকে সিনিয়র পর্যায়ে উত্তরণ মোটেও সহজ ছিল না। অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার এই ধাপেই হারিয়ে যান। রহিমও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। কখনও চোট, কখনও ফর্মের ওঠানামা, কখনও আবার তীব্র প্রতিযোগিতা, সব মিলিয়ে পথটা ছিল কঠিন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। প্রতিটি ব্যর্থতাকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে আরও কঠোর অনুশীলনে নিজেকে তৈরি করেছেন।
 
ভারতীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ পেশাদার লিগ ইন্ডিয়ান সুপার লিগে (আইএসএল) সুযোগ পাওয়ার পর রহিম আলির সামনে খুলে যায় নতুন দিগন্ত। শক্তিশালী ডিফেন্ডারদের বিরুদ্ধে খেলেও তিনি নিজের গতি, পরিশ্রম এবং লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দেন। তিনি শুধু গোল করার জন্যই পরিচিত নন; দলের আক্রমণ গড়ে তোলা, প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করা এবং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করতেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ড হলেও প্রয়োজনে বাম দিকের আক্রমণভাগেও সমান স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারেন তিনি।
 
রহিম আলি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে
 
আইএসএলে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ভারতীয় সিনিয়র জাতীয় দলে সুযোগ পান রহিম আলি। দেশের জার্সি গায়ে চাপানো যে কোনও ফুটবলারের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মানের একটি। ব্যারাকপুরের সেই ছেলেটির কাছে এই অর্জন ছিল বহু বছরের ঘাম, পরিশ্রম এবং আত্মত্যাগের ফল। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে তিনি প্রমাণ করেছেন, স্বপ্নকে সত্যি করতে হলে প্রতিদিন নিজেকে আরও উন্নত করতে হয়।
 
বর্তমানে রহিম আলি ইন্ডিয়ান সুপার লিগের ক্লাব চেন্নাইয়িন এফসি-র হয়ে খেলছেন। সেখানে তিনি আক্রমণভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। মাঠে তাঁর নিরলস দৌড়, বল ছাড়া অবস্থায় সঠিক মুভমেন্ট এবং দলের জন্য নিঃস্বার্থ পরিশ্রম তাঁকে কোচ ও সমর্থকদের আস্থাভাজন করে তুলেছে।
 
রহিম আলির জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সাফল্যের কোনও শর্টকাট নেই। প্রতিটি অর্জনের পেছনে থাকে বছরের পর বছর কঠোর অনুশীলন, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক দৃঢ়তা। চোট কিংবা ব্যর্থতা তাঁকে থামাতে পারেনি; বরং প্রতিবারই আরও শক্তিশালী হয়ে মাঠে ফিরেছেন তিনি।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by Rahim Ali (@rahimaliali)

 
বাংলার মুসলিম সমাজের তরুণদের কাছেও রহিম আলি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিভার সঙ্গে যদি শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় এবং সৎ প্রচেষ্টা যুক্ত হয়, তবে জাতীয় পর্যায়ে নিজের পরিচয় গড়ে তোলা সম্ভব। তাঁর সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি বাংলার ফুটবল ঐতিহ্যেরও গর্ব।
 
পশ্চিমবঙ্গ বহু কিংবদন্তি ফুটবলারের জন্ম দিয়েছে। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় রহিম আলি নতুন প্রজন্মের কাছে এক আশার নাম। তাঁর পথচলা এখনও শেষ হয়নি। সামনে আরও বড় সাফল্যের সম্ভাবনা রয়েছে। ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বাস, নিজের পরিশ্রম এবং লড়াকু মানসিকতা ধরে রাখতে পারলে রহিম আলি আগামী দিনেও ভারতীয় ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
 
 
রহিম আলির গল্প আসলে এক স্বপ্নবাজ তরুণের গল্প, যিনি ব্যারাকপুরের ছোট্ট মাঠ থেকে শুরু করে ভারতের জাতীয় দলের জার্সি পর্যন্ত পৌঁছেছেন শুধুমাত্র নিজের মেধা, অধ্যবসায় এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে। তাঁর জীবন বারবার মনে করিয়ে দেয়, জন্ম নয়, মানুষের পরিচয় তৈরি হয় তার পরিশ্রম, ধৈর্য এবং স্বপ্নকে সত্যি করার সাহস দিয়ে। তাই রহিম আলি আজ শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি বাংলার অসংখ্য তরুণের কাছে সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস এবং সাফল্যের এক জীবন্ত প্রতীক।