৫০০ টাকায় ভেঙ্কটেশ হাতছাড়া, ২০০০ টাকার স্কুটারে শুভাশিস! ময়দানের দলবদলে তখনও ছিল অন্য খেলা
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
বদলে গিয়েছে ভারতীয় ফুটবল। বদলে গিয়েছে কলকাতা ময়দানের চরিত্রও। ষাট পয়সার গ্যালারি আজ ইতিহাস। কিন্তু সেই গ্যালারির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্প এখনও বেঁচে আছে স্মৃতির পাতায়। বিশেষ করে পঞ্চাশ-ষাটের দশকের দলবদলের কাহিনি, যেখানে কয়েকশো টাকা কিংবা একটি স্কুটারও হয়ে উঠত বড় ফুটবল-যুদ্ধের কারণ। সেই সময়ের কলকাতা ফুটবলের দলবদলের জীবন্ত স্মৃতি তুলে ধরেছেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার বিপ্লব দাশগুপ্ত।
৫০০ টাকার জন্য মোহনবাগানে ভেঙ্কটেশ
১৯৫৪ সালে ইস্টবেঙ্গলের পঞ্চপাণ্ডবের যুগ শেষ হয়। সেই সময় ভেঙ্কটেশ যোগ দেন মোহনবাগানে। কর্ণাটক থেকে তাঁকে তুলে এনেছিলেন ইস্টবেঙ্গলের তৎকালীন সচিব জ্যোতিষচন্দ্র গুহ। ভেঙ্কটেশ তখন রাইট ইনসাইডে খেলতেন। তাঁর খেলার বৈশিষ্ট্য দেখে জ্যোতিষ গুহ তাঁকে রাইট আউটে খেলতে বলেন। আর সেখানেই যেন বদলে যায় তাঁর ফুটবল। রাইট উইংয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠেন ভেঙ্কটেশ।কিন্তু তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি ইস্টবেঙ্গল। ভেঙ্কটেশ চেয়েছিলেন ৫০০ টাকা বেশি। সেই অতিরিক্ত টাকা দিতে রাজি হননি সচিব। শেষ পর্যন্ত ৪,০০০ টাকার চুক্তিতে ভেঙ্কটেশকে তুলে নেয় মোহনবাগান।
ষাটের দশকে কলকাতার ময়দানের বিখ্যাত ফুটবলার পি ভেঙ্কটেশ
ধনরাজের ঠিকানা বদল ২,৫০০ টাকায়
পঞ্চপাণ্ডবের অন্যতম সফল সেন্টার ফরওয়ার্ড ছিলেন কে পি ধনরাজ। হায়দ্রাবাদ থেকে কলকাতায় এসে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে প্রচুর গোল করেছিলেন। কলকাতা লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছিলেন। পা এবং মাথা, দুইভাবেই গোল করার ক্ষমতা ছিল তাঁর।তবে ২,৫০০ টাকার বিনিময়ে ধনরাজ চলে যান রাজস্থান ক্লাবে।সেই সময় দল গঠনে রাজস্থান যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করত। কর্ণাটক থেকে কানাইয়ান দামোদরের মতো ভারতখ্যাত ফরোয়ার্ডকে তারা তুলে এনেছিল। দুর্ধর্ষ উইঙ্গার রমণও খেলেছেন রাজস্থানে। পরবর্তীকালে ভারতীয় ফুটবলের দুই কিংবদন্তি ডিফেন্ডার জার্নেল সিং ও রহমানের উত্থানের সঙ্গেও জড়িয়ে যায় রাজস্থানের নাম।
চন্দন সিংয়ের জন্য ১০ হাজার!
ইস্টবেঙ্গলের আরও বড় ধাক্কা ছিল সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার চন্দন সিংকে হারানো। সার্ভিসেস থেকে তাঁকে ইস্টবেঙ্গলে এনেছিলেন জ্যোতিষ গুহ। পঞ্চপাণ্ডবের পিছনে থেকে মাঝমাঠে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন এই পরিশ্রমী ফুটবলার।কিন্তু রাজস্থানের প্রস্তাবের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো অর্থ ইস্টবেঙ্গলের হাতে ছিল না। দু’বছর লাল-হলুদ জার্সিতে নজরকাড়া পারফরম্যান্সের পর ১৯৫৩ সালে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে চন্দন সিংকে তুলে নেয় রাজস্থান। অর্থাৎ ভেঙ্কটেশ, ধনরাজ, চন্দন, একাধিক তারকা ফুটবলারই তখন বেশি অর্থের প্রস্তাবে দলবদল করেছিলেন। আর তাঁদের ধরে রাখার জন্য ইস্টবেঙ্গলও সবসময় সমানভাবে উদ্যোগী ছিল না।
আমেদ খান-সাত্তার: দুই দল, দুই তারকা
এরও কয়েক বছর আগে, ১৯৪৮ সালে, কলকাতার দুই প্রধানের নজর পড়েছিল বেঙ্গালুরু মুসলিম ক্লাবের দুই ইনসাইড ফরওয়ার্ড, আবদুল সাত্তার ও আমেদ খানের দিকে। রোভার্স কাপের ফাইনালে মোহনবাগানকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বেঙ্গালুরু মুসলিম। সেই ম্যাচেই নজর কেড়েছিলেন দুই ফুটবলার। তাঁদের খেলার অভিভাবক ছিলেন আমেদ খানের মামা।জ্যোতিষ গুহ ও মোহনবাগান কর্তারা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দু’জনকে একই ক্লাবে দেওয়া হবে না। জ্যোতিষ গুহর পছন্দ ছিল আমেদ খান। ইনসাইড ফরওয়ার্ড হলেও আক্রমণভাগের একাধিক জায়গায় খেলতে পারতেন তিনি। শেষ পর্যন্ত আমেদ এলেন ইস্টবেঙ্গলে, আর সাত্তার যোগ দিলেন মোহনবাগানে। দুই দলের লড়াইয়েরও যেন এভাবেই সমাধান হয়েছিল।
শিল্ড জয়ী ইস্টবেঙ্গল সদস্যদের সঙ্গে শুভাশিস গুহ
কেম্পিয়া থেকে শুভাশিস, জবাব দেওয়ার পরিকল্পনা
১৯৫৬ সালে বেঙ্গালুরু থেকেই ইস্টবেঙ্গলে এসেছিলেন অলিম্পিয়ান মিডফিল্ডার মারিয়াপ্পান কেম্পিয়া। ইস্টবেঙ্গলে যোগ দেওয়ার পরই মেলবোর্ন অলিম্পিকে ভারতীয় দলে সুযোগ পান তিনি। মেলবোর্ন অলিম্পিকে ভারতীয় দলের মাত্র দু’জন ফুটবলার, কেম্পিয়া ও নিখিল নন্দী, পুরো ৯০ মিনিট খেলার মতো সক্ষম ছিলেন বলে সেই সময়ের স্মৃতিতে উঠে আসে। স্বাভাবিকভাবেই কেম্পিয়াকে পেতে ঝাঁপায় মোহনবাগান। ইস্টবেঙ্গলে তাঁর পারিশ্রমিক ছিল ৩,০০০ টাকা।
মোহনবাগানের প্রস্তাব ছিল ১২ হাজার, চারগুণ। জ্যোতিষ গুহ সেই প্রস্তাবের সঙ্গে পাল্লা দিতে রাজি হননি। এমনকী কেম্পিয়া তাঁর অসুস্থ দাদার জন্য কিছু অতিরিক্ত অর্থ চেয়েও তা পাননি। ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল তাঁর মনে। শেষ পর্যন্ত কেম্পিয়ার মোহনবাগানে চলে যাওয়ার পথ যেন আরও সহজ হয়ে যায়। কিন্তু এখানেই গল্পে আসে নতুন মোড়। জ্যোতিষ গুহ ভাবলেন, মোহনবাগানকে এবার পাল্টা ধাক্কা দিতে হবে। কেম্পিয়ার বিকল্প হিসেবে তাঁর নজর পড়ল মোহনবাগানের ডিফেন্ডার শুভাশিস গুহর দিকে।
সমস্যা একটাই, শুভাশিস তো মিডফিল্ডার নন, ডিফেন্ডার। তবু জ্যোতিষ গুহর যুক্তি ছিল, শুভাশিসকে তুলে নিতে পারলে মোহনবাগানের রক্ষণভাগে সমস্যা তৈরি হবে। এক মাস শুধু দাঁড়িয়ে থাকলেন মন্টু-সুজন।জ্যোতিষ গুহ দায়িত্ব দিলেন তাঁর দুই বিশ্বস্ত সহযোগী মন্টু বসু ও সুজন ব্যানার্জিকে।নির্দেশ ছিল অদ্ভুত, শুভাশিসকে সরাসরি কিছু বলা যাবে না। বিকেলে তিনি নাকতলার বাড়ির সামনে ছোট মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলতে আসতেন। মন্টু-সুজন সেখানে গিয়ে শুধু দাঁড়িয়ে থাকবেন।দিনের পর দিন একই ঘটনা। প্রায় এক মাস এভাবেই চলার পর একদিন ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা শুভাশিসকে ইস্টবেঙ্গলে খেলার প্রস্তাব দিয়েই ফেলেন।
শুভাশিসের উত্তর ছিল স্পষ্ট, মোহনবাগানে তিনি নিয়মিত সুযোগ পাচ্ছেন, ভালো পারিশ্রমিকও পাচ্ছেন। তাই দলবদলের কোনও প্রশ্নই নেই। মন্টু-সুজন যেন কিছুটা স্বস্তিই পেলেন। এতদিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকাও তো কম কষ্টের ছিল না!কিন্তু তাঁদের সেই স্বস্তি স্থায়ী হল না।জ্যোতিষ গুহকে জানানো হল, শুভাশিস রাজি নন। তিনি উল্টে নির্দেশ দিলেন, “প্রস্তাব দিতে বলিনি। কাল থেকে আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে।” অগত্যা শুরু হল অপেক্ষার দ্বিতীয় পর্ব।অ্যাম্বাসাডর চেপে নাকতলায়। বসুশ্রীতে প্রায় প্রতিদিন আসতেন ক্লাবের প্রভাবশালী কর্মকর্তা চিত্ত চ্যাটার্জি। তাঁর অ্যাম্বাসাডর গাড়িতে চেপেই সুজন ব্যানার্জি নাকতলায় যেতেন।
কিংবদন্তি ফুটবলার আব্দুল সাত্তার এবং আমেদ খান
তখন নাকতলা রুটে বাসও ছিল হাতে গোনা। জানুয়ারির কনকনে ঠান্ডায় দিনের পর দিন একই মানুষকে দেখে একদিন শুভাশিস নিজেই প্রশ্ন করলেন, “এত কষ্ট করে আসছেন কেন? যাব না তো বলেই দিয়েছি।” সুজনের উত্তর ছিল, “সই করতে হবে না। একবার জ্যোতিষদার সঙ্গে দেখা করলেই হবে।”এবার কিছুটা নরম হলেন শুভাশিস। দেখা করতে গেলেন জ্যোতিষ গুহর সঙ্গে। “রোভার্স কাপে তোমার খেলা দেখে মুগ্ধ”। শুভাশিসকে সামনে পেয়েই জ্যোতিষ গুহ বলেছিলেন, “রোভার্স কাপে তোমার খেলা দেখে মুগ্ধ। এবার তোমাকে ইস্টবেঙ্গলেই খেলতে হবে।”
১৯৫৫ সালে মোহনবাগানের প্রথম রোভার্স কাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন শুভাশিস। শৈলেন মান্নার অনুপস্থিতিতে নিয়মিত খেলেছিলেন তিনি। ফলে ফুটবলের এই জহুরির মুখে নিজের প্রশংসা শুনে অভিভূত হয়ে পড়েন শুভাশিস। শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যান তিনি।টাকার জন্য বড় কোনও দাবি করেননি শুভাশিস। ইস্টবেঙ্গল কর্তাদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত চেয়েছিলেন একটি স্কুটার, যার দাম ছিল প্রায় ২,০০০ টাকা। আর সেই দলবদলটাই ঘটেছিল নিঃশব্দে। মোহনবাগান কর্তারা জানতে পারার আগেই শুভাশিস গুহ ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফেলেছিলেন।
তখন দলবদল মানেই ছিল গল্প
আজকের কোটি কোটি টাকার ট্রান্সফার, চুক্তি আর এজেন্ট-নির্ভর ফুটবলের যুগে ৫০০ টাকা কিংবা ২,০০০ টাকার স্কুটারের গল্প হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কলকাতা ময়দানে এই ছোট ছোট অঙ্কের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বিরাট আবেগ, কৌশল এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ভেঙ্কটেশকে ৫০০ টাকার জন্য হারানো, ধনরাজের ২,৫০০ টাকায় রাজস্থান যাত্রা, চন্দন সিংয়ের ১০ হাজার টাকার দলবদল কিংবা শুভাশিস গুহকে একটি ২,০০০ টাকার স্কুটারের বিনিময়ে তুলে নেওয়া, এসবই কলকাতা ফুটবলের সেই সময়ের দলবদলের ইতিহাসের অমূল্য অধ্যায়।
ময়দানের সেই দিনগুলো আজ নেই। নেই ষাট পয়সার গ্যালারিও। কিন্তু সেই দলবদলের গল্পগুলো এখনও কলকাতা ফুটবলের স্মৃতিতে বেঁচে আছে।