নিকুঞ্জ নাথ / গুয়াহাটি
সংগীতের কোনো মৃত্যু নেই এবং যে শিল্পী নিজের কণ্ঠের মাধ্যমে একটি সমাজের আবেগ, আশা ও সংগ্রামকে তুলে ধরেন, তিনি চিরস্মরণীয়। অসম ও অসমিয়াদের কাছে জুবিন গার্গ শুধুমাত্র একজন শিল্পী বা একটি নাম নন; তিনি হৃদয়ের স্পন্দন, প্রতিবাদের এক নির্ভীক স্ফুলিঙ্গ এবং ভালোবাসার জীবন্ত দলিল। আজকের এই বিশেষ দিনে অসমের আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে। বুকে এক অজ্ঞাত যন্ত্রণা নিয়ে আজ সমগ্র অসমবাসী স্মরণ করছেন তাঁদের প্রাণের শিল্পীকে।
‘’উভতি চোয়া ধূলিয়রি বাটে
ধূলি হৈ হৈ উরিব জীবনী
উজুটি খোয়া উচুপনিবোরে
ছবি হৈ হৈ ক’বহি কাহিনী...’’
এই গানটির অংশ যেন মানবজীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপটিকেই অত্যন্ত নির্মলভাবে তুলে ধরেছে। জীবনের যাত্রাপথে আমরা প্রত্যেকেই একদিন ধুলো হয়ে মিশে যাব এবং থেকে যাবে শুধুই আমাদের স্মৃতিগুলো। জুবিন গার্গের ক্ষেত্রেও আজ সেটিই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে অনুরাগীদের কান্না আজ ছবির মতো তাঁরই কাহিনি শুনিয়ে চলেছে।
মঞ্চে গান পরিবেশন করার মুহূর্তে জুবিন গার্গ
সময়ের স্রোতে একটি সম্পূর্ণ বছর পেরিয়ে গেল, কিন্তু অসমিয়াদের হৃদয়ের শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি। অসমের প্রাণের শিল্পী, সকলের প্রিয় হার্টথ্রব জুবিন গার্গকে ছাড়া কেটে গেল একটি সম্পূর্ণ বছর। যার কণ্ঠে ছিল অসীম আবেগ, ভালোবাসার উষ্ণতা এবং প্রতিবাদের ভাষা; যার সুরেলা কণ্ঠ সবুজ মাঠ থেকে বিহুতলী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, সেই সোনালি কণ্ঠ আজ চিরদিনের জন্য স্তব্ধ। আপনজনকে হারানোর দুঃখ, অব্যক্ত যন্ত্রণা এবং লক্ষ লক্ষ অনুরাগীর হাহাকারের মধ্য দিয়ে পেরিয়ে গেল এই দীর্ঘ ৩৬৫ দিন।
জুবিন গার্গ নামের সত্তাটি অসম ও অসমিয়াদের এক জীবন্ত আবেগ। তাঁর গানে রয়েছে মাটির সুবাস, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, বিদ্রোহের সুর এবং ভালোবাসার উন্মাদনা। সব শ্রেণির মানুষকে একতার বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখতে পারা এই জাদুকরী কণ্ঠশিল্পীর অনুপস্থিতি আজ প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করছে অসমবাসী।
বন্যার সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো জুবিন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা সরব থাকা জুবিন, আজ শুধুই এক সোনালি স্মৃতি। তাঁর কালজয়ী কণ্ঠের প্রতিধ্বনি হয়ে রয়ে গেছে সেই চিরপরিচিত পংক্তিগুলো:
''মন হেরুওয়ার মন বিচরার
শেষ হ’ব ক’ত এই যাত্ৰার
অশ্ৰুতো ধুমুহা, হাঁহিতো ধুমুহা...’’
হ্যাঁ, জীবনের যাত্রা কোথায় শেষ হবে, সেই চিরন্তন প্রশ্নটিই আজ সকলকে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। তাঁর এই সাংগীতিক ও বাস্তব জীবনের যাত্রা এত তাড়াতাড়ি এবং এত অকালেই শেষ হয়ে যাবে, তা কেউ ভাবেনি। তাঁর গানের মতোই আজ অসমবাসীর চোখের জলে এক ঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে, যে ঝড় সকলের মনকে তছনছ করে দিয়েছে।
তাঁর গান ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বজ্রকণ্ঠ। শব্দের শক্তিতে সমাজ পরিবর্তন করতে চাওয়া, মানুষের স্বার্থে সরব হওয়া মানুষটির কণ্ঠ আজ চিরদিনের জন্য নিস্তব্ধ।
''শব্দ যদি প্ৰেরণা হয়
শব্দ যদি শকতি হয়
শব্দ আজি কিয় শংকিত
শব্দ যদি বৰ্ণবৃক্ষ
শব্দ যদি চিরশুদ্ধ
শব্দ আজি কিয় শংকুচিত...’’
অসমের সীমানা অতিক্রম করে জুবিন গার্গ বলিউড এবং বাংলা সংগীত জগতেও একটি স্বতন্ত্র স্থান দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ২০০৬ সালে ‘গ্যাংস্টার’ ছবিতে গাওয়া “ইয়া আলি” গানটি সমগ্র দেশে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এছাড়াও ‘Krrish 3’ ছবির “দিল তু হি বতা” এবং ‘পিয়ার কে সাইড ইফেক্টস’-এর “জানে ক্যা চাহে মন” সহ বলিউডের বহু গানের মাধ্যমে তিনি সমগ্র ভারতের শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিলেন।
অন্যদিকে, বাংলা সংগীত জগতেও তিনি ছিলেন অন্যতম জনপ্রিয় নাম। “মন মানে না”, “বধুয়া”, “মাঝি রে” এবং “বোঝে না সে বোঝে না” সহ অগণিত সুপারহিট গানের মাধ্যমে তিনি বাংলার মানুষের হৃদয়েও চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছিলেন। তাঁর এই অবদান অসম ও পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক জগতের মধ্যে একটি সুন্দর সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল।
জুবিন গার্গকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়ার দৃশ্য
তাঁর ‘মায়াবিনী’ গানটি আজ প্রত্যেক অনুরাগীর কাছে এক প্রার্থনার সংগীতে পরিণত হয়েছে। রাতের নীরবতায় অনুরাগীরা যেন আকাশের তারাগুলোর মাঝে তাঁর ছবিই খুঁজে বেড়ান। তাঁর হৃদয়স্পর্শী বহু গান আজ প্রত্যেক অসমিয়ার মনে গভীর বিষাদের সৃষ্টি করে। ‘মায়াবিনী’ তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় সৃষ্টি:
''মায়াবিনী রাতির বুকুত
দেখা পালো তোমার ছবি
ধরা দিলা গোপনে আহি
হিয়ার কোণত...’’
আজও অসমবাসীর মনে জীবন্ত হয়ে আছে ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরের সেই কালো দিনটি। সিঙ্গাপুর থেকে আসা সেই দুঃসংবাদ মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র অসমকে নিস্তব্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সিঙ্গাপুরে প্রকৃতপক্ষে সেদিন কী ঘটেছিল? কীভাবে অসমবাসী অকালে হারাতে বাধ্য হলেন তাঁদের প্রাণের শিল্পীকে? কার ভুলের কারণে লক্ষ লক্ষ অনুরাগীর বুক আজ শূন্য হয়ে গেল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজ এক বছর পরেও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। সত্যের সন্ধানে অনুরাগীরা হাহাকার করছেন, কিন্তু রহস্যের আবর্তে আজও জড়িয়ে রয়েছে জুবিন গার্গের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। উদ্বেগ ও কৌতূহলের মধ্য দিয়ে কেটে যাওয়া একটি বছর শুধু দিয়ে গেল অপেক্ষার অন্তহীন যন্ত্রণা। সত্যের এই অনাবিষ্কৃত অবস্থাই অসমিয়া সমাজের কাছে এক গভীর আক্ষেপের কারণ হয়ে উঠেছে।
‘‘মুগ্ধ হিয়া মোর কোনে ছুই যায়?
মুগ্ধ হিয়াত রৈ কোনে চুমি যায়?
বুকুতে অগনি জ্বলাই
তেজ-মঙহরে মরম নেওচি
জ্বলি জ্বলি র'ল মাথোঁ ছাই
বুকুতে যে জুই বিয়পাই
তেজ-মঙহরে পৃথিবী নেওচি
জ্বলি জ্বলি র'ল মাথোঁ ছাই...’’
এই গানটিতে বর্ণিত বুকের আগুন আজ প্রত্যেক অসমিয়ার বুকে দাউদাউ করে জ্বলছে। তাঁর অকাল মৃত্যু সমগ্র অসমবাসীকে শোকের সাগরে ডুবিয়ে দিয়ে গেছে। ভালোবাসা, আবেগ, আশা, সবকিছু যেন আজ জ্বলতে জ্বলতে ছাই হয়ে গেছে। তিনি দিয়ে যাওয়া এই যন্ত্রণা কখনো উপশম না-হওয়া এক আগুন হয়ে অনুরাগীদের বুকে রয়ে গেল।
জুবিনের শেষযাত্রা
আজ মৃত্যুবার্ষিকীর এই শোকাকুল দিনে অনুরাগীদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভেরও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সিঙ্গাপুরের সেই অভিশপ্ত দিনের সত্য প্রকাশ্যে আসতেই হবে বলে অনুরাগীরা দৃঢ় দাবি জানিয়েছেন। তাঁর অন্তিম শয়নের স্থান সোনাপুরের ‘জুবিন ক্ষেত্র’-এ সকাল থেকেই জনসমুদ্রের সৃষ্টি হয়েছে। অসমের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আসা অগণিত অনুরাগী তাঁদের প্রিয় ‘জুবিন দা’-কে স্মরণ করে চোখের জল ফেলেছেন।
সমগ্র সোনাপুর আজ এক আবেগের সাগরে পরিণত হয়েছে। বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্ম পর্যন্ত, সকলেই এসে জড়ো হয়েছেন শুধুমাত্র তাঁদের প্রিয় শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাতে। জুবিন গার্গ হয়তো আজ সশরীরে আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম এবং তাঁর প্রতি মানুষের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাঁকে অসমিয়াদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য অমর করে রাখবে।