স্কুলেই গড়েছেন আস্ত সুন্দরবন! পড়াশোনার সঙ্গে শেখান মাছ ও ম্যানগ্রোভ চাষ, হিঙ্গলগঞ্জের মাস্টারমশাই পেলেন 'বিদ্যাসাগর সম্মান ২০২৬'

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
স্কুলেই গড়েছেন আস্ত সুন্দরবন! পড়াশোনার সঙ্গে শেখান মাছ ও ম্যানগ্রোভ চাষ, হিঙ্গলগঞ্জের মাস্টারমশাই পেলেন 'বিদ্যাসাগর সম্মান ২০২৬'
স্কুলেই গড়েছেন আস্ত সুন্দরবন! পড়াশোনার সঙ্গে শেখান মাছ ও ম্যানগ্রোভ চাষ, হিঙ্গলগঞ্জের মাস্টারমশাই পেলেন 'বিদ্যাসাগর সম্মান ২০২৬'
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

বিদ্যালয়জুড়ে যেন পরিবেশের পাঠ। মিনি সুন্দরবন থেকে রুফটপ অ্যাকোয়াকালচার, বৃষ্টির জল সংরক্ষণে কী কী করতে হবে সবকিছুর পাঠ মিলবে এখানে। বইয়ের পাতার বাইরেও শিক্ষার একটা সুবিশাল জগৎ লুকিয়ে রয়েছে, যা খুঁজে দিলেন সুন্দরবন অঞ্চল লাগোয়া উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জের এক প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষক।
 

সামাজিক বা আর্থিক প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে কীভাবে একটা সাধারণমানের স্কুলকে পরিবেশ শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানের মডেল বানিয়ে তোলা যায়,  তার বাস্তব কর্মযজ্ঞ দেখিয়েন শিক্ষক অলকেশ মৃধা। তাঁর অসামান্য এই অবদানের জন্য তিনি ভূষিত হলেন রাজ্য সরকারের মর্যাদাপূর্ণ ‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬’-এ। এই মানুষটি যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যান শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন পথচারীরাও। বিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের সবচেয়ে প্রিয় স্যার এই অলোকেশবাবু।
 
জানা গেল, ২০০৫ সালে শ্রীচন্দা মহেন্দ্রনাথ মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউশনে অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন অলকেশ মৃধা। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে ওই বিদ্যালয়েই ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তিনি।
 
শিক্ষক অলকেশ মৃধা
 
এরপর ২০২০ সালে সন্তোষপুর বিদ্যামন্দির ফর বয়েজ স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয়কে শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষার জায়গা হিসেবে না রেখে পরিবেশ ও প্রকৃতিকে সামনে রেখে হাতে-কলমে শিক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি।
 
বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত জায়গায় ম্যানগ্রোভ গাছ লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘মিনি সুন্দরবন’। হিঙ্গলগঞ্জের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রকে বাঁচাতে রোপণ করা হলো সারি সারি ম্যানগ্রোভ। হিঙ্গলগঞ্জের ভৌগোলিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই উদ্যোগ পড়ুয়াদের কাছে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রকে কাছ থেকে বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে। এখানেই শেষ নয়, স্কুলের ছাদে গেলে দেখা যাবে রুফটপ অ্যাকোয়াকালচার বা জলজ চাষ।
 
‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬’ গ্রহণের মুহূর্তে
 
বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ আর ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ফিরিয়ে আনতে তৈরি হলো ‘গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জ সিস্টেম’। যা পড়ুয়াদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনার বোধ বাড়াতে সাহায্য করেছে। এছাড়া বিরল প্রজাতির গাছের বীজ সংরক্ষণের পদ্ধতিও জানে পড়ুয়ারা। সব মিলিয়ে স্কুলটিকে দেখলে মনে হবে পরিবেশ সচেতনতার এক জীবন্ত গবেষণাগার।
 
শিক্ষকের অভিনব প্রচেষ্টায় এই স্কুল পরিবর্তনের ফল মিলেছে হাতেনাতে। একটা সময় এই স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যাটা ২৩৫-এ আটকে ছিল। ২০২৬ সালে সেই স্কুলেই পড়ুয়ার সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে ৬৫৫ জনে। বলা যেতে পারে, পরিবেশ সচেতনতার সঙ্গে নীতি শিক্ষা ও সহপাঠক্রমিক কাজে এই স্কুলের ছাত্ররা আজ নিজেদের যোগ্যতায় জাতীয় স্তরে নিজেদের নাম উজ্জ্বল করছে। তাই তো শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানেরই স্বীকৃতি হিসেবে শিক্ষক দিবসে এল রাজ্য সরকারের ‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬’।
 
অলকেশ মৃধার প্রাপ্ত সন্মাননা
 
হিঙ্গলগঞ্জের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় বসে অলকেশ মৃধা বুঝিয়ে দিলেন, সদিচ্ছা আর উদ্ভাবনী ভাবনা থাকলে একটা সাধারণ বিদ্যালয়কেও আনা সম্ভব সামনের সারিতে। তাঁর এই সম্মান আসলে বিদ্যালয়ের পরিবেশবান্ধব শিক্ষাভাবনারও স্বীকৃতি।