আসানসোলের ‘ফুড ম্যান’-এর নীরব বিপ্লব! ২১টি অবৈতনিক কোচিং স্কুলে শিক্ষার আলো ১২০০ প্রান্তিক শিশুর

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 7 h ago
আসানসোলের ‘ফুড ম্যান’-এর নীরব বিপ্লব! ২১টি অবৈতনিক কোচিং স্কুলে শিক্ষার আলো ১২০০ প্রান্তিক শিশুর
আসানসোলের ‘ফুড ম্যান’-এর নীরব বিপ্লব! ২১টি অবৈতনিক কোচিং স্কুলে শিক্ষার আলো ১২০০ প্রান্তিক শিশুর
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

শিক্ষা যে শুধু বই-খাতা আর শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজ বদলের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার, এই বার্তাই যেন নিজের কাজের মাধ্যমে তুলে ধরছেন আসানসোলের চন্দ্রশেখর কুণ্ডু। আন্তর্জাতিক মঞ্চে যিনি দীর্ঘদিন ধরেই ‘ফুড ম্যান’ নামে পরিচিত, গত প্রায় ন’বছর ধরে তিনি নীরবে চালিয়ে যাচ্ছেন এক অন্যরকম সামাজিক উদ্যোগ। তাঁর উদ্যোগে আসানসোলের বস্তি এলাকা থেকে পুরুলিয়ার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল পর্যন্ত তৈরি হয়েছে একাধিক অবৈতনিক কোচিং স্কুল। বর্তমানে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২১টি কোচিং স্কুলে প্রায় ১২০০ আদিবাসী ও প্রান্তিক পরিবারের শিশু শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
 
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুদের কাছে মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া আজও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার বহু পরিবারে সংসার চালানোর চাপের কারণে শিশুদের পড়াশোনা নিয়মিত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের অভাবে অতিরিক্ত পড়াশোনা বা কোচিংয়ের সুযোগ মেলে না। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই চন্দ্রশেখর কুণ্ডুর এই উদ্যোগ।
 
 
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি সাধারণ পরিকাঠামোর মধ্যে সারি সারি বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করছে একদল শিশু। কারও হাতে বই, কারও সামনে খাতা। অধিকাংশের পরনে একই রঙের পোশাক। তাদের মুখের হাসি ও চোখের উচ্ছ্বাস যেন বলে দিচ্ছে, শিক্ষার সুযোগ পেলে তারাও স্বপ্ন দেখতে চায়। সেই শিশুদের মাঝেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন চন্দ্রশেখর কুণ্ডু। শহুরে ঝাঁ-চকচকে স্কুলের বদলে প্রকৃতির কাছাকাছি সাধারণ পরিবেশে চলছে পড়াশোনা। কিন্তু পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা শিশুদের শেখার আগ্রহকে থামাতে পারেনি।
 
চন্দ্রশেখর কুণ্ডু
 
ন’বছরের পথচলা
 
জানা গিয়েছে, প্রায় ন’বছর ধরে এই শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন চন্দ্রশেখর কুণ্ডু। শুরুটা ছিল সীমিত পরিসরে। সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন প্রান্তে। আসানসোলের বস্তি এলাকার পাশাপাশি পুরুলিয়ার পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ।
 
এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এখানে শিক্ষার জন্য কোনও আর্থিক বাধা নেই। যেসব পরিবারের পক্ষে সন্তানদের অতিরিক্ত পড়াশোনার ব্যবস্থা করা কঠিন, সেই সমস্ত পরিবারের শিশুদেরই বিশেষভাবে এই উদ্যোগের আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে স্কুলের মূল শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে তাদের সামনে।
 
১২০০ শিশুর চোখে নতুন স্বপ্ন
 
এই উদ্যোগের সঙ্গে বর্তমানে প্রায় ১২০০ আদিবাসী ও প্রান্তিক শিশু যুক্ত রয়েছে। সংখ্যাটা নিছক পরিসংখ্যান নয়। প্রত্যেক শিশুর পিছনে রয়েছে আলাদা পরিবার, আলাদা জীবনসংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাদা স্বপ্ন।
কেউ হয়তো এসেছে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম থেকে, কেউ আবার শহরের বস্তি এলাকা থেকে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা তাদের জীবনের বাস্তবতা হলেও শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা যে কোনও অংশে কম নয়, এই উদ্যোগের ছবিই তার প্রমাণ।
 
শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, পিছিয়ে পড়া শিশুদের উন্নয়নের জন্য শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো যথেষ্ট নয়। তাদের নিয়মিত পড়াশোনার পরিবেশ, শিক্ষক-সহায়তা এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করাও জরুরি। এই ধরনের বিনামূল্যের কোচিং উদ্যোগ সেই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
 
শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতার সেতুবন্ধন
 
চন্দ্রশেখর কুণ্ডু আন্তর্জাতিক মঞ্চে ‘ফুড ম্যান’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিধি শুধু খাদ্য সহায়তার মধ্যে আটকে নেই। প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার এই প্রয়াস তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।
 
কারণ, একটি শিশুর হাতে খাবার তুলে দেওয়া যেমন তাকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, তেমনই তার হাতে বই তুলে দেওয়া পারে ভবিষ্যৎ বদলের সুযোগ। সেই জায়গা থেকেই শিক্ষার এই উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
 
চন্দ্রশেখর কুণ্ডু
 
সাধারণ পরিকাঠামো, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, তার মধ্যেই চলছে পাঠদান। তবু শিশুদের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কেউ হয়তো বড় হয়ে শিক্ষক হতে চায়, কেউ চিকিৎসক, কেউ সরকারি কর্মী, আবার কেউ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হিসেবে শিক্ষাকে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে এই উদ্যোগ।
 
একটি উদ্যোগ, বদলে দিতে পারে বহু জীবন
 
আসানসোল থেকে পুরুলিয়ার দুর্গম এলাকা, ২১টি অবৈতনিক কোচিং স্কুলের মাধ্যমে প্রায় ১২০০ শিশুকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক উদ্যোগ। এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো কোনও পরিসংখ্যানে মাপা সম্ভব নয়। কারণ, আজ যে শিশুটি হাতে বই নিয়ে পড়ছে, কয়েক বছর পর সেই শিশুই হয়তো নিজের পরিবার ও সমাজের জন্য পরিবর্তনের দূত হয়ে উঠবে।
 
শিক্ষার আলো সমাজের একেবারে প্রান্তে পৌঁছে দিতে তাই চন্দ্রশেখর কুণ্ডুর এই নীরব উদ্যোগের গুরুত্ব কম নয়। বড় কোনও প্রচার বা আড়ম্বরের বদলে মাঠে নেমে কাজ করার এই প্রয়াস দেখিয়ে দিচ্ছে, একজন মানুষের সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক উদ্যোগও বহু শিশুর ভবিষ্যতের দিশা বদলে দিতে পারে।