মালিক আসগর হাশমি
“তিনি এসেছেন, আর সঙ্গে এনেছেন আকাশজোড়া গর্ব।” ২০২৫ সালের ভারতের কৃতিত্বের তালিকায় যদি কোনো নাম উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়ে ওঠে, তবে তা গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা। মহাকাশের নীল-কালো নীরবতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে তিনি শুধু এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেননি, বরং কোটি কোটি ভারতীয়ের স্বপ্নকে নতুন দিগন্তের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।
বছরের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ২০২৫-কে বিদায় জানাতে গিয়ে তাই স্মরণ করা জরুরি সেই ভারতীয়কে, যিনি আবারও প্রমাণ করেছেন, ভারতের উপস্থিতি আজ শুধু পৃথিবীতেই নয়, মহাবিশ্বের বিস্তৃত মানচিত্রেও গভীরভাবে খোদিত।
শুভাংশু শুক্লা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সাত জানালাবিশিষ্ট কুপোলা মডিউল থেকে পৃথিবীর প্যানোরামিক দৃশ্য উপভোগ করছেন
মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS)-এ পা রাখা প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইতিহাস রচনা করেন। আর যখন তিনি পৃথিবীতে ফিরে এলেন, তখন গর্বে ভরে উঠল গোটা দেশ। অ্যাক্সিওম-৪ (Ax-4) মিশনের মহাকাশযান যখন ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ করল, তখন সেটি শুধু একটি সফল স্প্ল্যাশডাউন নয়, ভারতের মহাকাশ অভিযানের সুদৃঢ় অঙ্গীকারের এক জ্বলন্ত প্রমাণও বটে। ভারতীয় সময় অনুযায়ী বিকেল ৩টা ১ মিনিটে হওয়া এই অবতরণ সরাসরি সম্প্রচারে লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখেছেন; চোখে প্রত্যাশা, মুখে গর্ব আর হৃদয়ে রোমাঞ্চ নিয়ে।
এই মিশনটি পরিচালনা করেছিল হিউস্টনভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা অ্যাক্সিওম স্পেস (AXIOM SPACE, তবে এর প্রাণ ছিল আন্তর্জাতিক সহযোগিতায়। নাসা (NASA), ইসরো (ISRO), ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এবং স্পেসএক্সের (SPACE X) যৌথ প্রচেষ্টায় Ax-4 মিশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। মিশনের নেতৃত্বে ছিলেন প্রাক্তন নাসা মহাকাশচারী পেগি হুইটসন, আর পাইলটের দায়িত্ব সামলান গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা। তাঁর সঙ্গে এই ঐতিহাসিক যাত্রায় অংশ নেন পোল্যান্ডের স্লাভোশ উজনানস্কি-ভিশনিয়েভস্কি এবং হাঙ্গেরির টিবর কাপু।
ড্রাগন মহাকাশযানে অ্যাক্সিওম-৪ (Ax-4) দলের অভিযাত্রা
২৬ জুন ISS-এ পৌঁছনো এই দলটি মূলত দুই সপ্তাহের জন্য গিয়েছিল, তবে মিশনের সময়সীমা কয়েক দিন বাড়ানো হয়। এই সময়ে তাঁরা ৬০টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালান, যার মধ্যে সাতটি ছিল ইসরোর নকশা করা। এই পরীক্ষাগুলির গুরুত্ব শুধু গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নয়, এগুলি ভারতের ভবিষ্যৎ মানব মহাকাশ অভিযানের ভিতকে আরও মজবুত করে। এই মিশনের জন্য শুভাংশু শুক্লার আসন ও প্রশিক্ষণে ইসরো প্রায় ৫ বিলিয়ন টাকা ব্যয় করেছে, যা সংস্থাটি ভারতের মানব মহাকাশ কর্মসূচির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবেই দেখছে।
১৯৮৪ সালে রাকেশ শর্মার সোয়ুজ মহাকাশযানে মহাকাশে যাওয়ার ৪১ বছর পর এই যাত্রা সম্পন্ন হল। পার্থক্য শুধু এটুকুই, এবার ভারত কেবল একজন অংশগ্রহণকারী নয়, ভবিষ্যতের দিশা নির্ধারণকারীদের মধ্যেও জায়গা করে নিয়েছে। ISS থেকে বিদায়বার্তায় শুভাংশু শুক্লা যা বলেছিলেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, ভারতের মানব মহাকাশযাত্রা কঠিন হলেও তা শুরু হয়ে গেছে, আর সংকল্প দৃঢ় হলে তারকাকেও ছোঁয়া যায়।
মহাকাশযানে অ্যাক্সিওম-৪ (Ax-4) দল
রাকেশ শর্মার ঐতিহাসিক শব্দ স্মরণ করে তিনি উর্দুর বিখ্যাত গান “সারে জাহাঁ সে আচ্ছা”-র উল্লেখ করেন এবং নিজের ভাষায় আজকের ভারতের ছবি আঁকেন। তিনি বলেন, মহাকাশ থেকে তাকালে ভারতকে দেখা যায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নির্ভীক, আত্মবিশ্বাসী এবং গর্বে ভরপুর এক দেশ হিসেবে। এটি কেবল আবেগঘন বক্তব্য নয়, বরং সেই আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ, যা ভারতের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও তরুণদের চোখে ঝলমল করছে।
শুভাংশু শুক্লার এই যাত্রা একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৮৫ সালের ১০ অক্টোবর লখনউতে জন্ম নেওয়া শুক্লা ২০০৬ সালে ভারতীয় বায়ুসেনায় ফাইটার পাইলট হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। মিগ, সুখোই, জাগুয়ার, হক ও ডর্নিয়ার বিমানে উড়ে তিনি ২,০০০ ঘণ্টারও বেশি উড়ান অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ২০১৯ সালে ইসরো থেকে আসা একটি ফোনকল তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, যার পর তিনি রাশিয়ার স্টার সিটির ইউরি গ্যাগারিন কসমোনট ট্রেনিং সেন্টারে কঠোর প্রশিক্ষণ নেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে শুভাংশু শুক্লা
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গগনযান মিশনের জন্য নির্বাচিত চারজন মহাকাশচারীর একজন হিসেবে তাঁর নাম দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। ২০২৪ সালের মার্চে গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি দেয়। Ax-4 মিশনে পাইলটের দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রমাণ করেছেন, ভারতীয় বায়ুসেনার এক ফাইটার পাইলট মহাকাশেও সমান দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন।
মহাকাশে যাওয়ার আগে শুভাংশু শুক্লা বলেছিলেন, তিনি কেবল যন্ত্রপাতি নয়, সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন কোটি কোটি ভারতীয়ের আশা ও স্বপ্ন। আজ তাঁর নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে গেছে, তিনি সেই স্বপ্নগুলিকে আরও বড় করে ফিরিয়ে এনেছেন।
মহাকাশযানে অ্যাক্সিওম-৪ (Ax-4) দল
২০২৭ সালে গগনযানের মাধ্যমে ভারতের প্রথম স্বদেশি মানব মহাকাশযাত্রা, ২০৩৫ সালের মধ্যে নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন এবং ২০৪০ সালের মধ্যে চাঁদে ভারতীয় মহাকাশচারী পাঠানোর যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ইসরো নিয়েছে, তাতে শুভাংশু শুক্লার এই যাত্রা ইতিমধ্যেই এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের এই আকাশছোঁয়া অধ্যায় আগামী বহু দশকের দিশা নির্ধারণ করবে, আর ইতিহাস সাক্ষী থাকবে, এই অধ্যায়ের কেন্দ্রে ছিল এমন এক নাম, যিনি সত্যিই এসে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন: শুভাংশু শুক্লা।