Bio-Patch: হৃদরোগীদের জন্য আশার আলো নিয়ে এলেন কাশ্মীরি বিজ্ঞানী ড. শেখ পারভেজ

Story by  Aasha Khosa | Posted by  Aparna Das • 3 d ago
 কাশ্মীরি বিজ্ঞানী ড. শেখ পারভেজ
কাশ্মীরি বিজ্ঞানী ড. শেখ পারভেজ
 
আশা খোসা / নয়া দিল্লি

ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠান (IIT) দিল্লির বিজ্ঞানীরা এমন এক ‘বায়ো-প্যাচ’ (bio-patch) তৈরি করেছেন, যা মানুষের হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের কারণে হওয়া ক্ষতি মেরামত করতে সক্ষম। এই প্যাচটি রোগীর হৃদযন্ত্রে স্থাপন করলে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু পুনরুজ্জীবিত হবে এবং রোগীর স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে।
 
জৈব-সামগ্রী (biomaterials) দিয়ে তৈরি এই প্যাচটি ইতিমধ্যেই প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় সফল হয়েছে এবং বর্তমানে মানুষের ওপর পরীক্ষার জন্য অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
 

এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছেন কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী ড. শেখ পারভেজ, যিনি IIT দিল্লির বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং সেন্টারের ‘শেখ ল্যাব ফর বায়োমেটেরিয়াল অ্যাডভান্স ইন রিজেনারেশন অ্যান্ড থেরাপিউটিকস’ (SMART)-এর প্রধান। ড. পারভেজ বলেন, “হার্ট অ্যাটাক হওয়া রোগীদের জীবনকাল সাধারণত কমে যায়, কারণ অ্যাটাকের পর তাদের হৃদপিণ্ড মাত্র ৪০ শতাংশ ক্ষমতায় কাজ করে। ফলে তারা দুর্বলতা এবং অসুস্থতায় ভোগেন।”
 
তিনি জানান, এই প্যাচটি হার্ট অ্যাটাকের সময় নষ্ট হওয়া টিস্যুগুলোকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে, যার ফলে রোগী স্বাভাবিক ও আরও উন্নত জীবন যাপন করতে পারবেন। অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল অস্ত্রোপচারের তুলনায় এই বায়ো-প্যাচ অনেক কম খরচে সমাধান দেবে।
 
ড. পারভেজ ২০১২ সাল থেকে DST INSPIRE ফ্যাকাল্টি হিসেবে IIT দিল্লিতে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং সেন্টারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। IIT–এর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, তিনি হৃদরোগ, ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা এবং ফুসফুসের রোগ নিরাময়ের জন্য অক্সিজেন-ভিত্তিক বায়োমেটেরিয়াল ও ন্যানো-থেরাপিউটিক্স বিকাশের কাজে যুক্ত। সহজভাবে বলতে গেলে, পারভেজ এবং তাঁর দল এমন বায়ো-সামগ্রী তৈরি করছেন যা হৃদরোগের সমাধানকে সহজ ও সুলভ করবে।
 
ড. শেখ পারভেজ এক ছাত্রের সঙ্গে
 
তিনি Awaz–The Voice-কে জানান, “আমরা ডায়াবেটিস রোগীর ‘ডায়াবেটিক ফুট’ নিরাময়ের জন্যও একটি বায়ো-প্যাচ তৈরি করছি।” তিনি এমন একটি বিশেষ ব্যান্ডেজ বা ড্রেসিং তৈরি করেছেন, যা ধীরে ধীরে অক্সিজেন নিঃসরণ করতে পারে।
 
ডায়াবেটিক ফুট একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা, কিন্তু অনেকে তা জানেন না। তিনি বলেন, “ভারতে বহু নারী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও তারা নিজেদের রোগ সম্পর্কে অজ্ঞ। খালি পায়ে দীর্ঘ তীর্থযাত্রা করার কারণে পায়ে যে ঘা হয়, ডায়াবেটিস থাকলে তা কখনও শুকোতে চায় না।” তাঁর তৈরি বিশেষ প্যাচটির দাম মাত্র ২ টাকা, যা ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। অন্যথায় অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর পা কেটে ফেলতে হয় (amputation)।
 
কে এই পারভেজ এ. শেখ?
 
পারভেজ শেখের জন্ম উত্তর কাশ্মীরের কুপওয়ারা জেলার ভিলগাম গ্রামে, যা নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC) থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে। তিনি IIT কানপুর থেকে বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। গবেষণায় তিনি অক্সিডেটিভ চাপ ও হাইপক্সিয়া কমাতে সক্ষম বায়োমেটেরিয়াল ও স্ক্যাফল্ড তৈরির ওপর কাজ করেন, যার ব্যবহারিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 
ড. শেখ পারভেজ
 
তিনি ডায়াবেটিক ফুট আলসার, মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন এবং ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির মতো রোগের চিকিৎসায় স্টেম সেল-উৎপন্ন ন্যানোভেসিকল (এক্সোসোম) ব্যবহারের ওপরও গবেষণা করেছেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ, ডায়াবেটিক ফুট আলসারের জন্য অক্সিজেন-নিঃসরণকারী ঘা ড্রেসিং ‘OxOBand’ এবং মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের জন্য ন্যানোফাইব্রাস অক্সিজেন-নিঃসরণকারী কার্ডিয়াক প্যাচ।
 
শ্রীনগরের শ্রী প্রতাপ কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর তিনি বিহারের গয়ার কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তি হন, এটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট।
 
কুপওয়ারা থেকে দেশ–বিদেশের অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার পর্যন্ত নিজের যাত্রার কথা স্মরণ করতে গিয়ে পারভেজ বলেন, ছোট থাকতে তিনি আইআইটির নাম পর্যন্ত শুনে দেখেননি। কিন্তু শৈশবে কয়েকজন অচেনা মানুষের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছু হৃদয়স্পর্শী এবং জীবন-পরিবর্তনকারী অভিজ্ঞতাই তাঁকে দক্ষিণ বিহারের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিতে ভর্তি হতে পথ দেখায়, যা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকেও সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়।
 
ড. শেখ পারভেজকে সম্মাননা প্রদানের একটি দৃশ্য
 
দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন থেকে শুরু করে পরে বিহারে, এমন বহু অচেনা মানুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল, যারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে সহায়তা করেননি, বরং জীবনে প্রথমবার বাড়ি থেকে দূরে থেকে কীভাবে সামলে উঠতে হয়, সেটাও তাকে শিখিয়েছিল। 
 
সেই দিনগুলোর গল্প
 
দ্বাদশ শ্রেণী পাশ করার পর যখন তিনি ভর্তি হতে পাটনা যাওয়ার কথা, তখনই বিপদে পড়েন। ট্রেন মিস হয়ে যায়, আর তাঁর কাছে পাটনা যাওয়ার মতো টাকা ছিল না। তিনি হতাশ হয়ে ফোনে বড়ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখনই এক ট্রাভেল এজেন্ট তাঁকে দেখে এগিয়ে আসেন। সেই অচেনা মানুষটি তাঁকে পাটনার বিমানের টিকিট কেটে দেন, এমনকি বিমানবন্দরে যাওয়ার অটোর ভাড়াও দিয়ে দেন।
 
পরে তিনি জানতে পারেন, কুপওয়ারার এক পরিচিত ব্যাংকার তাঁকে রেলস্টেশন থেকে নিতে ১০০ কিলোমিটার পথ এসেছিলেন, কিন্তু তিনি তখন বিমানবন্দরে পৌঁছে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মীরাও তাঁর ব্যাংক ড্রাফট জমা দিতে সাহায্য করেন।
 
ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পর বক্সারের এক পরিবার তাঁকে নিজের বাড়িতে থাকতে জোর করে, যতক্ষণ না ক্লাস শুরু হয়। তাঁরা বলেন, “তুমি এত কষ্ট করে যাতায়াত করছ কেন? বাড়ি গিয়ে আবার ফিরলে খরচ বাড়বে। তুমি আমাদের সঙ্গেই থাকো।” পারভেজ বলেন, “তাঁরা আমাকে নিজের সন্তানের মতো যত্ন করেছেন।”
 
ড. শেখ পারভেজে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিচ্ছেন
 
পরে তিনি IIT কানপুরে অধ্যাপক ড. অশোক কুমারের তত্ত্বাবধানে বায়োসায়েন্স ও বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি অর্জন করেন। সেখানে চিকিৎসা ও অনুবীক্ষণিক চিকিৎসার জন্য জৈব সক্রিয়, অক্সিজেন-স্কেভেঞ্জিং ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ পলিমারিক বায়োমেটেরিয়াল ডিজাইন ও মূল্যায়নের কাজ করেন।
 
বর্তমানে IIT দিল্লির SMART ল্যাবের প্রধান হিসেবে তিনি জীববিজ্ঞানকে প্রকৌশলের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন নতুন উপাদান তৈরি করছেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ করছেন। নিজের শিকড়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “যখন এমন পরিবেশ থেকে আসেন, যেখানে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা সীমিত, তখন প্রতিটি পদক্ষেপই আপনার কাছে একেকটা শিক্ষা হয়ে ওঠে।”