আজকের দিনে স্মার্টফোনকে যখন শিশু ও কিশোরদের মনোযোগ নষ্ট করার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়, ঠিক সেই বাস্তবতার মাঝেই শ্রীনগরের সাইদপোরা ঈদগাহ এলাকা থেকে উঠে এসেছে এক ব্যতিক্রমী গল্প। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই উজাইর মালিক স্মার্টফোনকে বিনোদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা বদলে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
অদম্য পরিশ্রম, কৌতূহল এবং স্বশিক্ষার মাধ্যমে নবম শ্রেণির ছাত্র মালিক উজাইর জম্মু–কাশ্মীরের উদীয়মান প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমে নিজের জন্য এক স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছে। এখনও পর্যন্ত সে তৈরি করেছে ৩১টি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং একটি ওয়েবসাইট।
শৈশব থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ
২০২১ সাল থেকেই উজাইরের কোডিং ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের যাত্রা শুরু। তখন সে মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েবসাইট কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার চেষ্টা করছিল। তার বাড়ির কাছেই বাবার এক বন্ধুকে অ্যাপ তৈরি করতে দেখে সে প্রথম অনুপ্রেরণা পায়। সেই মুহূর্তেই উজাইরের মনে প্রশ্ন জাগে, “স্ক্রিনের আড়ালে আসলে কী চলছে?” উজাইর বলে, “আমি ভীষণভাবে জানতে চাইতাম, এই সবকিছু কীভাবে কাজ করে। সেই কৌতূহলই আমাকে নিজে নিজে শিখতে অনুপ্রাণিত করেছে।”
প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ইন্টারনেটই হয়ে উঠল শ্রেণিকক্ষ
কোনও প্রকার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা প্রতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই উজাইর ইন্টারনেটের সাহায্যে শেখা শুরু করে। ইউটিউব টিউটোরিয়াল, অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও উন্নত কোর্সই হয়ে ওঠে তার শ্রেণিকক্ষ। গত কয়েক বছরে সে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট সংক্রান্ত শতাধিক অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করেছে।
সে বলে, “শুরুর দিকটা একেবারেই সহজ ছিল না। আমি তখন খুব ছোট ছিলাম, অনেক বিষয় বুঝতে কষ্ট হতো। কিন্তু আইটির প্রতি আমার ভালোবাসা আমাকে কখনও হতাশ হতে দেয়নি।”
হোটেল বুকিং থেকে এআই চ্যাটবট
হোটেল ও যানবাহন বুকিং সংক্রান্ত ছোট অ্যাপ তৈরি করেই উজাইরের পথচলা শুরু। এই অ্যাপগুলোর লক্ষ্য ছিল স্থানীয় মানুষদের ঘরে বসেই হোটেল বা যানবাহন বুক করার সুবিধা দেওয়া। বর্তমানে একাধিক হোটেল-ভিত্তিক অ্যাপ পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শীঘ্রই সেগুলি অ্যাপ স্টোরে লাইভ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব তাকে চ্যাটবট উন্নয়নের দিকেও টেনেছে। এখন পর্যন্ত উজাইর অন্তত সাতটি এআই চ্যাটবট তৈরি করেছে, যা সাধারণ কথোপকথন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইউটিলিটি-ভিত্তিক সহায়ক হিসেবেও কাজ করে। উজাইরের কথায়, “এআই-ই ভবিষ্যৎ। আমি জানতে চেয়েছিলাম এটি কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে মানুষের উপকারে লাগানো যায়।”
উজাইর মালিক
বিদ্যালয়ের জন্য ডিজিটাল সমাধান
উজাইরের প্রকল্পগুলো কেবল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সে দুটি বিদ্যালয়ের জন্য SIS (School Information System) তৈরি করেছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলো অনলাইনে উপস্থিতি নেওয়া, ফি ব্যবস্থাপনা, বকেয়া ফি অনুসরণ এবং বাড়ির কাজ জমা দেওয়ার মতো কাজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে করতে পারছে। বর্তমানে এই অ্যাপগুলো আমন্ত্রণভিত্তিক এবং সীমিত ব্যবহারের জন্যই উপলব্ধ।
‘ফ্রিভান্স’: কমিশনবিহীন এক নতুন প্ল্যাটফর্ম
উজাইরের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প হলো ‘ফ্রিভান্স’, যা বর্তমানে একটি ওয়েব-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চালু রয়েছে এবং খুব শীঘ্রই মোবাইল অ্যাপ হিসেবেও প্রকাশিত হবে। ‘ফ্রিভান্স’ সম্পূর্ণভাবে কমিশনবিহীন মডেল-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
যেখানে অন্যান্য ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম ১০–২০ শতাংশ কমিশন নেয়, সেখানে ‘ফ্রিভান্স’-এ মাত্র ১০ বা ২০ টাকা ফি দিয়ে চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। এখানে গ্রাফিক ডিজাইন, লোগো ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন আইটি দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত কাজ পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে এই প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল সম্পদ কেনাবেচার সুবিধাও যোগ করা হবে।
উজাইর বলে, “আমার লক্ষ্য হলো ছোট অপারেটর ও তরুণদের ওপর যেন কোনও অতিরিক্ত বোঝা না পড়ে। প্রযুক্তির কাজ হওয়া উচিত সাহায্য করা, বাধা সৃষ্টি করা নয়।”
কাশ্মীর, প্রযুক্তি ও যুবশক্তি
কাশ্মীরের সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে উজাইরের মত, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। সে বলে, “আজ অনেক তরুণ মোবাইল ফোনের অপব্যবহার করে বা খারাপ অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যদি একই স্মার্টফোন দক্ষতা অর্জন ও সৃষ্টির কাজে লাগানো যায়, তাহলে প্রযুক্তি আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।”
পরিবার ও সমর্থনের শক্তি
নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব উজাইর দেয় তার বাবা-মাকে। শুরুতে পরিবার তার আগ্রহের গভীরতা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও, পরে তারা তাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। উজাইরের কথায়, “চ্যালেঞ্জ যত কঠিনই হোক না কেন, আমার বাবা-মা সব সময় আমার পাশে থেকেছেন।”
উজাইর মালিক
আন্তর্জাতিক গ্রাহক ও বয়স নিয়ে বিতর্ক
‘ফ্রিভান্স’ এবং অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে উজাইর কানাডা ও আমেরিকার গ্রাহকদের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। তার মতে, বয়স নয়, দক্ষতাই আসল। সে বলে, “বিদেশে মানুষ বয়স দেখে না, তারা কাজের মানকেই গুরুত্ব দেয়।”
ভবিষ্যতের স্বপ্ন: আইআইটি ও এআই এডিটিং অ্যাপ
ভবিষ্যতে আইআইটিতে পড়াশোনা করে নিজের প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে আরও শক্তিশালী করার স্বপ্ন দেখে উজাইর। পাশাপাশি সে একটি এআই-ভিত্তিক ভিডিও এডিটিং অ্যাপ নিয়েও কাজ করছে, যেখানে ব্যবহারকারী শুধু প্রম্পট দিয়েই ভিডিও এডিট করতে পারবে।
যুবসমাজের প্রতি বার্তা
যুবকদের উদ্দেশে উজাইরের স্পষ্ট বার্তা, “কখনও ভাববে না, আমি পারব না। নিষ্ঠা থাকলে সবই সম্ভব।” তথ্যপ্রযুক্তি শেখার জন্য সে ‘আপনা কলেজ’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেল অনুসরণ করার পরামর্শ দেয়।
বয়স নয়, উদ্ভাবনই আসল
মাত্র ১৩ বছর বয়সে ৩১টি অ্যাপ ও একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে মালিক উজাইর প্রমাণ করেছে, উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বয়স কোনও বাধা নয়। শ্রীনগরের সাইদপোরা ঈদগাহ থেকে উঠে আসা এই গল্পটি হাজার হাজার প্রতিভাবান কিন্তু দিশাহীন তরুণের জন্য এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা। উজাইর দেখিয়ে দিয়েছে, কৌতূহল, কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একটি স্মার্টফোনও ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।