সুদীপ শর্মা চৌধুরী
১২ জানুয়ারি—ভারতের ইতিহাসে একটি বিশেষ দিন। এই দিনটি কেবল একজন মহান মনীষীর জন্মদিন নয়, বরং ভারতের যুবসমাজের আত্মজাগরণের প্রতীক। প্রতি বছর এই দিনটি জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালিত হয়, স্বামী বিবেকানন্দের জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে। ১৮৬৩ সালের এই দিনেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই মানুষটি, যিনি যুবসমাজকে আহ্বান জানিয়েছিলেন—নিজের শক্তিকে চিনে নিয়ে দেশ ও মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে।
ভারত সরকার ১৯৮৪ সালে ১২ জানুয়ারিকে জাতীয় যুব দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তার পর থেকে ১৯৮৫ সাল থেকে এই দিনটি প্রতিবছর উদযাপিত হয়ে আসছে। উদ্দেশ্য একটাই—যুবসমাজকে নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পথে উদ্বুদ্ধ করা।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই উদযাপন কি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ? স্বামীজির আদর্শ কি সত্যিই যুবসমাজের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে?স্বামী বিবেকানন্দ: যিনি যুবসমাজকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেনস্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন একজন দার্শনিক, আধ্যাত্মিক নেতা এবং সর্বোপরি যুবসমাজের নির্ভীক পথপ্রদর্শক। তিনি বিশ্বাস করতেন, যুবসমাজের শক্তিই একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ। তাঁর মতে, আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও চরিত্রগঠন ছাড়া কোনো জাতির অগ্রগতি সম্ভব নয়।স্বামীজির প্রধান শিক্ষাগুলি আজও সমান প্রাসঙ্গিক—উচ্চাকাঙ্ক্ষা, স্বনির্ভরতা, কঠোর পরিশ্রম, মানবতার সেবা এবং গভীর দেশপ্রেম। এই আদর্শগুলিই জাতীয় যুব দিবসের মূল ভিত্তি।
স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন উপলক্ষে প্রতিবছর দেশের নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতা হয়। ব্যানার ওঠে, বক্তৃতা হয়, ছবি মালা দিয়ে সাজানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে—কতজন শিক্ষার্থী সত্যিকার অর্থে স্বামীজিকে পড়ে? তাঁর ভাবনাকে বোঝে? তাঁর আদর্শকে জীবনের অংশ করে তোলে?স্বামীজিকে জানতে হলে তাঁকে পড়তে হবে। তাঁর বাংলা রচনা আয়তনে ছোট হলেও ভাবনায় গভীর, ভাষায় শক্তিশালী। শব্দচয়ন ও প্রকাশভঙ্গিতে তিনি অনন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন—পড়ার প্রকৃত আনন্দ মাতৃভাষাতেই সম্ভব।
মাতৃভাষা ও স্বামীজির ভাবনা
বাংলা ভাষার প্রতি স্বামী বিবেকানন্দের ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। তিনি মনে করতেন, মাতৃভাষাই চিন্তার প্রকৃত বাহন। অথচ আজকের সমাজে আমরা কী দেখছি?
বর্তমানে অভিভাবকদের মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমে সন্তানদের শিক্ষিত করার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। কাজের ক্ষেত্রে ইংরেজির প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু তার আগে মাতৃভাষাকে ভালোভাবে জানা কি জরুরি নয়?
আমরা ছোটবেলায় পড়েছি—“মাতৃ দুগ্ধের ন্যায় মাতৃভাষা।”কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সন্তান যদি বাংলায় দুর্বল হয়, অনেক বাবা-মা তাতেই গর্ব অনুভব করেন। এই মানসিকতা শুধু দুঃখজনক নয়, ভয়াবহ।অথচ বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েই চলেছে। লন্ডনে বাংলা দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা। ২০০২ সালে আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওন বাংলাকে সম্মানসূচক সরকারি ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ত্রিশ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন।অন্যদিকে দেশে বাংলা ভাষা ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা পেয়েছে ।তাহলে আমরা নিজেরাই কেন নিজের ভাষাকে অবহেলা করব?
জাতীয় যুব দিবস কেবল একটি উদযাপন নয়। এটি যুবসমাজকে মনে করিয়ে দেয়—দেশের ভবিষ্যৎ তাদের হাতেই। যুবসমাজের শক্তি, উদ্যম ও চিন্তাভাবনাই পারে একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।এই দিনে সারা দেশে নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মশালা, যুব সংলাপ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সেমিনার ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ হয়। উদ্দেশ্য একটাই—যুবসমাজকে দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
স্বামী বিবেকানন্দ যে স্বপ্নের ভারতবর্ষের কথা বলেছিলেন, আজ তার কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে? সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়—ভাষার ক্ষেত্রেই নয়, সামাজিক ন্যায়, সাম্য ও মানবিকতার ক্ষেত্রেও অবক্ষয় স্পষ্ট। অন্ত্যজ শ্রেণি আজও বঞ্চিত। ধর্মীয় হানাহানি, যুদ্ধ, রক্তপাত, আশ্রয়হীন মানুষের সংখ্যা কমেনি।এই সংকটময় সময়ে স্বামীজির আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন—মানুষকে ভালোবাসতে, প্রশ্ন করতে, আত্মবিশ্বাসী হতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে।
যুব দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করলেই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বামীজিকে জানা, বোঝা এবং জীবনে ধারণ করা। শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই স্বামীজির রচনা ও দর্শনের সঙ্গে পরিচয় করানো জরুরি।স্বামী বিবেকানন্দের সেই অমোঘ বার্তা আজও পথ দেখায়—“উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখো, কঠোর পরিশ্রম করো এবং জাতির কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করো।”এই আদর্শই যদি যুবসমাজের পাথেয় হয়, তবেই জাতীয় যুব দিবসের প্রকৃত সার্থকতা মিলবে। তবেই ভারতের ভবিষ্যৎ হবে আলোকিত, শক্তিশালী ও মানবিক।