সরু গলির ঘর থেকে ড্রোন দুনিয়ায় দাপট, হুগলির দুই তরুণের ‘ডার্ক ম্যাটার’ আজ দেশের তৃতীয়

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 17 h ago
সরু গলির ঘর থেকে ড্রোন দুনিয়ায় দাপট, হুগলির দুই তরুণের ‘ডার্ক ম্যাটার’ আজ দেশের তৃতীয়
সরু গলির ঘর থেকে ড্রোন দুনিয়ায় দাপট, হুগলির দুই তরুণের ‘ডার্ক ম্যাটার’ আজ দেশের তৃতীয়
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

হুগলির আদি সপ্তগ্রাম থেকে উঠে আসা দুই তরুণ আজ প্রযুক্তির দুনিয়ায় তৈরি করেছেন অনন্য নজির। ডানকুনির বাসিন্দা অর্ণব চক্রবর্তী ও অনিক ভট্টাচার্য, দুই স্কুলবন্ধুর হাত ধরেই জন্ম নিয়েছে “ডার্ক ম্যাটার” নামের এক স্টার্টআপ, যা বর্তমানে ভারতের মধ্যে ড্রোন তৈরির উপকরণ সরবরাহকারী সংস্থাগুলির মধ্যে তৃতীয় স্থানে জায়গা করে নিয়েছে। বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে এই সাফল্য নিঃসন্দেহে এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে।

শুরুটা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। বালি হল্ট এলাকার এক সরু গলির ভাড়া বাড়ির ছোট্ট একটি ঘর, সেখানেই সীমিত পরিকাঠামো নিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁদের স্বপ্নের উড়ান। একটি মাত্র ফ্যান, অল্প কিছু যন্ত্রপাতি আর অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তি, এই ছিল মূল পুঁজি। কিন্তু প্রতিকূলতা তাঁদের থামাতে পারেনি। বরং সেই সীমাবদ্ধতাই হয়ে উঠেছিল তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি।
 

অর্ণব ও অনিক দুজনেই হুগলির আদি সপ্তগ্রামের অ্যাকাডেমি অফ টেকনোলজি থেকে ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যালস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। পড়াশোনার সময় থেকেই তাঁদের মধ্যে ছিল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ এবং কিছু নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁদের স্টার্টআপ “ডার্ক ম্যাটার”।
 
এই সংস্থা মূলত ড্রোনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ তৈরি করে, যেমন ফ্লাইট কন্ট্রোলার এবং ইলেকট্রনিক স্পিড কন্ট্রোলার (ESC)। ড্রোন প্রযুক্তিতে এই দুটি উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ফ্লাইট কন্ট্রোলার ড্রোনের মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করে, আর ESC নিয়ন্ত্রণ করে মোটরের গতি। এতদিন বাংলায় ড্রোন তৈরির কিছু উদ্যোগ থাকলেও, এই ধরনের উন্নত মানের যন্ত্রাংশের অভাব ছিল প্রকট। ফলে বাইরের রাজ্য বা বিদেশের উপর নির্ভর করতে হত। সেই সমস্যার সমাধানই করে দিয়েছে “ডার্ক ম্যাটার”।
 
বর্তমানে এই সংস্থা শুধু ব্যক্তিগত গ্রাহকদের কাছ থেকেই নয়, ভারতীয় সামরিক বিভাগের কাছ থেকেও বড় আকারের অর্ডার পাচ্ছে। যা তাঁদের প্রযুক্তির মান এবং নির্ভরযোগ্যতারই প্রমাণ বহন করে। একটি ছোট ঘর থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগ আজ জাতীয় স্তরে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে, এটাই এই গল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
 
ডার্ক ম্যাটার স্টার্টআপের তৈরি ড্রোন
 
এই দুই তরুণ উদ্যোক্তার সাফল্য ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে বিভিন্ন মহলে। ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্স তাঁদের এই উদ্যোগকে ‘সাকসেস স্টোরি’ ম্যাগাজিনে তুলে ধরেছে। পাশাপাশি, দিল্লিতে আয়োজিত এক সর্বভারতীয় উদ্ভাবন সম্মেলনেও প্রথম স্থান অর্জন করেছে তাঁদের সংস্থা। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা এবং বাজারের চাহিদা, এই তিনের সঠিক মেলবন্ধন ঘটিয়ে কীভাবে একটি সফল ব্যবসা গড়ে তোলা যায়, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে “ডার্ক ম্যাটার”।
 
অর্ণব ও অনিকের এই সাফল্যের গল্প শুধুমাত্র একটি স্টার্টআপের উত্থান নয়, বরং এটি এক নতুন প্রজন্মের মানসিকতার প্রতিফলন। চাকরির পিছনে না ছুটে নিজেরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, স্থানীয় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা এবং প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে এগিয়ে চলা, এই সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে তাঁদের এই সাফল্যের পথ।
 
আজ যখন দেশজুড়ে স্টার্টআপ সংস্কৃতি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে, তখন হুগলির এই দুই তরুণ প্রমাণ করে দিয়েছেন যে বড় কিছু করতে গেলে বড় শহর বা বিপুল পুঁজির প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, অধ্যবসায় এবং নিজের উপর বিশ্বাস। সরু গলির ছোট্ট ঘর থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ দেশের প্রযুক্তি মানচিত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।