ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: যদি মুসলমানরা একটি একক উম্মাহ (Ummah) হয়ে থাকে, তাহলে ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ ও সংঘাত কেন দেখা যায়? এই প্রশ্নটি মূলত রাজনীতি, মতাদর্শ এবং ধর্মের সঙ্গে জড়িত। সাধারণ মানুষ প্রায়ই মনে করেন, উম্মাহ এমন এক ঐক্য যা কখনও ভাঙতে পারে না; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ইসলামিক স্কলার আবদুল মজিদ আযহারি, 'আওয়াজ দ্য ভয়েস'-এর বিশেষ পডকাস্ট "দ্বীন ওর দুনিয়া"-তে, যেখানে তিনি সঞ্চালক সাকিব সালিমের সঙ্গে কথা বলেন। আযহারি উম্মাহ ধারণাটিকে একটি বিস্তৃত ও নমনীয় কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, উম্মাহ কেবল একটি ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও সামষ্টিক বাস্তবতাও।
কুরআনে ‘উম্মাহ’ শব্দটি বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে এর অর্থ প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে। কখনও এটি ধর্মীয় গোষ্ঠী বোঝায়, আবার কখনও সামাজিক বা রাজনৈতিক সত্তাকেও নির্দেশ করে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো মদিনার প্রাথমিক ইসলামিক রাষ্ট্র, যেখানে মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা একটি যৌথ রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সহাবস্থান করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে উম্মাহ ধারণা শুধু ধর্মীয় ঐক্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি বাস্তব সামাজিক কাঠামোকেও প্রতিনিধিত্ব করে।
উম্মতে মুসলিমাহ বলতে সেই সকল মুসলমানদের বোঝায় যারা একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী। এই বন্ধন মূলত আধ্যাত্মিক, যা মানুষের হৃদয়কে যুক্ত করে এবং ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে।
তবে আযহারি স্পষ্ট করে বলেন, এই বন্ধন রাজনৈতিক ঐক্যকে বাধ্যতামূলক করে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত মুসলমানরা তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্রের সংবিধান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনেই থাকে। অতএব, উম্মতে মুসলিমাহকে একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা একটি ভুল ধারণা; বরং এটিকে একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সম্প্রদায় হিসেবে বোঝা বেশি যুক্তিযুক্ত।
আযহারির মতে, কালেমা একটি আদর্শিক ও আধ্যাত্মিক বন্ধন, যার কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই। কেউ ভারত, ইরান বা অন্য যেকোনো দেশে থাকুক না কেন, তাদের বিশ্বাস একই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। এই ভিত্তিই মুসলমানদের মধ্যে এক গভীর সংযোগ তৈরি করে।
তবে তিনি এটিও বলেন যে মানুষ বাস্তব জগতের সঙ্গে যুক্ত, তারা একটি নির্দিষ্ট দেশ, সমাজ ও সভ্যতার অংশ। তাই শুধুমাত্র কালেমার ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা বাস্তবসম্মত নয়।
ইসলামিক স্কলার আবদুল মজিদ আযহারি
আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে ভৌগোলিক সীমানা ইসলামবিরোধী নয়; বরং মানবসমাজের জন্য এটি একটি স্বাভাবিক প্রয়োজন। মদিনার রাষ্ট্র থেকে শুরু করে খিলাফতের বিভিন্ন যুগ পর্যন্ত, ইতিহাসে সীমানার উপস্থিতি সবসময়ই ছিল।
এই সীমানা শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।আযহারির মতে, আসল সমস্যা সীমানা নয়, বরং সেই সীমানার ভেতরে গড়ে ওঠা ব্যবস্থা। যদি সেই ব্যবস্থা ন্যায়ভিত্তিক হয়, তবে সীমানা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে; আর যদি অন্যায় থাকে, তবে সেই সীমানাই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলামের মূল চেতনা হলো ন্যায়বিচার। কুরআনের শিক্ষায় বলা হয়েছে, শ্রেষ্ঠ উম্মাহ সেই যে ভালো কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। অর্থাৎ উম্মাহ ধারণা কোনো অন্যায় বা অত্যাচারকে সমর্থন করে না।
এমনকি যদি কোনো মুসলমান অন্যায় করে, তাকে সমর্থন করা উচিত নয়; বরং একজন ভালো মুসলমান তাকে সংশোধন করবে। এই ধারণাই উম্মাহকে একটি উচ্চ নৈতিক অবস্থানে নিয়ে যায়।
আলোচনায় ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের মানসিকতার কথাও উঠে আসে। আযহারির মতে, এই অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে একটি বিশেষ মানবিক ও আবেগপ্রবণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তারা কেবল ধর্মীয় নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে বিশ্বের যেকোনো স্থানে অন্যায় হলে, তারা ধর্ম বা জাতি নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে।
উম্মাহর ভেতরে বিভিন্ন মতবাদ ও মতপার্থক্য থাকা একটি বাস্তবতা। সুন্নি, শিয়া, বেরেলভি, সালাফি, এমন নানা মতাদর্শ রয়েছে; তবুও তাদের মধ্যে একটি মৌলিক বিশ্বাসের ঐক্য বিদ্যমান। আযহারির মতে, এই পার্থক্যগুলো উম্মাহ ধারণাকে দুর্বল করে না; বরং এটি বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ করে একটি বৃহত্তর পরিসর তৈরি করে।
কবি ইকবালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যিনি “সারে জাহাঁ সে আচ্ছা” লিখেছিলেন এবং পরে পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষে মত দেন, তিনি ভৌগোলিক সীমানাকে অস্বীকার করেননি; বরং তিনি বলেছেন যে বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতা কোনো একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়।
আযহারির মতে, সর্বোচ্চ মূল্য হলো মানবতা, যা সব পার্থক্যের ঊর্ধ্বে। ধর্ম, জাতি ও রাষ্ট্রের নিজস্ব গুরুত্ব থাকলেও, যখন ন্যায় ও অন্যায়ের প্রশ্ন আসে, তখন মানবতাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই মূল্যবোধই ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষদের একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে আসে।