আরিফুল ইসলাম / গুয়াহাটি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যান্ত্রিকতার এই যুগে মানসিক শান্তি পাওয়ার জন্য মানুষকে নানা ধরনের উপায় অবলম্বন করতে দেখা যায়। কিন্তু এখনও এমন মানুষ আছেন, যারা মন ও মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার জন্য ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়নের পথ বেছে নেন। সদ্য ঘোষিত অসম লোকসেবা আয়োগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ গুয়াহাটির জেসমিন সুলতানা মানসিক শান্তির জন্য নিয়মিত পড়েন পবিত্র কোরান ও গীতা।
অসম লোকসেবা আয়োগের (APSC) সাম্প্রতিক সম্মিলিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা (CCE)-তে অসম পুলিশ সার্ভিসে (APS) ষষ্ঠ স্থান অর্জন করে জেসমিন সুলতানা এক চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করেছেন। তাঁর এই যাত্রা কেবল একজন তরুণীর সাফল্যের গল্প নয়; বরং এটি ভাষার গৌরব, নারী ক্ষমতায়ন এবং কঠোর পরিশ্রমের এক জীবন্ত উদাহরণ।
জেসমিন সুলতানার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়েছিল অসমীয়া মাধ্যমে। ২০১৬ সালে তরিণী চৌধুরী সরকারি বালিকা উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি স্কুলশিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কটন কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক বান্ধবীর পরামর্শ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, “যদি সমাজকে বদলাতে চাও, তবে ব্যবস্থার (সিস্টেমের) ভেতরে প্রবেশ করতে হবে।” সেই দিনই তিনি সিভিল সার্ভিসকে নিজের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেন।
‘আওয়াজ–দ্য ভয়েস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেসমিন সুলতানা বলেন, “আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে জানতে পারি। আমি ও আমার বন্ধু সুস্মিতা প্রায়ই লাইব্রেরির সামনে বসে সমাজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। তখনই সে আমাকে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার কথা বলেছিল। তখন জানতে পারি যে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা নীতিনির্ধারণের সুযোগ পান। সুস্মিতা আমাকে বলেছিল, যদি সত্যিই কিছু করতে চাও, তবে সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করতে হবে। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমি অবশ্যই এই পরীক্ষা দেব।”
জেসমিনের সাফল্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর অসমীয়া মাধ্যমের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। ইংরেজিকে বুদ্ধিমত্তার মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়, এমন এক সমাজে জেসমিন অসমীয়া ভাষাকেই নিজের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাঁর মতে, “ভাষা কখনোই প্রতিভার অন্তরায় হতে পারে না।” উপযুক্ত অসমীয়া পড়াশোনার উপকরণের অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি ইংরেজি বই পড়ে নিজেই সেগুলি অসমীয়ায় অনুবাদ করে নোট তৈরি করতেন।
আকাশবানীর স্টুডিওতে জেসমিন সুলতানা
তিনি বলেন, “আমি যেহেতু অসমীয়া মাধ্যমে পরীক্ষা দিয়েছি, তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, অসমীয়ায় পর্যাপ্ত স্টাডি মেটেরিয়াল পাওয়া যায় না। ইংরেজি বই পড়ে আমি নিজেই অসমীয়ায় নোট তৈরি করতাম। প্রথমবার পরীক্ষা দেওয়ার সময় আমার উত্তরপত্র কেউ মূল্যায়ন করে দেয়নি। পরে বুঝলাম উন্নতি করতে হলে কারও দ্বারা মূল্যায়ন হওয়া দরকার। এবার পার্থ স্যার আমার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছেন, যার ফলে অনেক উপকার হয়েছে।”
জেসমিন সুলতানা কোভিড লকডাউনের সময় থেকেই APSC পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন। ২০২৩ সালে প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিলেও তিনি মেইনসে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ২০২৪ সালে প্রাথমিক পরীক্ষাতেই ব্যর্থ হন। কিন্তু পরপর দু’বার ব্যর্থতার পরও তিনি হার মানেননি। ২০২৫ সালের পরীক্ষার জন্য দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করেন এবং সেই পরিশ্রমের ফলেই তিনি APS-এ ষষ্ঠ স্থান অর্জন করতে সক্ষম হন।
জেসমিন শুধু একজন মেধাবী ছাত্রীই নন, তিনি অত্যন্ত কর্মঠও। APSC প্রস্তুতির পাশাপাশি তিনি ‘আকাশবাণী’-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ‘SPM IAS একাডেমি’-তে কাজ করতেন। দিনের বেলা অফিসের কাজ এবং রাতভর পড়াশোনা, এই কঠোর পরিশ্রমই তাঁকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।
মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা জেসমিন নানা সামাজিক চাপেরও মুখোমুখি হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিয়ের প্রস্তাব এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির সময়সীমার মাঝেও তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পরিবারের সমর্থন। বিশেষ করে তাঁর বাবা-মা তাঁর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
জেসমিন সুলতানার মানসিক শান্তির প্রধান উৎস দুটি বই, কোরান ও গীতা। তিনি বলেন, “আমরা যেহেতু একটি গণতান্ত্রিক দেশে বাস করি, তাই সব কিছু পড়ার স্বাধীনতা আমাদের আছে। কোরান পড়লে গীতা পড়া যাবে না, এমন নয়। দুটিই পবিত্র গ্রন্থ। এই দুই গ্রন্থ মানুষকে সৎ পথ দেখায়, ভালো পথে চলতে শেখায় এবং মনকে শান্ত করে। কোভিডের সময় থেকে আমি APSC-র প্রস্তুতি নিচ্ছি, তাই এই তিন-চার বছরের দীর্ঘ যাত্রায় মানসিকভাবে শান্ত থাকা খুবই জরুরি ছিল। নিজেকে সুখী রাখতে পারলেই মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। কোরান ও গীতা আমাকে শান্ত ও স্থির থাকতে সাহায্য করেছে। সব ধর্মগ্রন্থই মানুষকে মানুষ হতে শেখায়। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হতে হলে সহনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর এই দুই গ্রন্থ মানুষকে সহনশীল হতে শেখায়।”
জেসমিন সুলতানা তাঁর বাড়িতে
উল্লেখ্য, জেসমিন সুলতানা তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন পানবাজার আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তরিণী চৌধুরী সরকারি বালিকা উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে কটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
জেসমিনের মতে, সাফল্যের মূল মন্ত্র হলো, “শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিকতা।” তিনি বিশেষভাবে অসমীয়া মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের হীনমন্যতায় ভোগার বিরুদ্ধে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, দিনে কত ঘণ্টা পড়া হলো তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতটা মনোযোগ ও গুণগত মান নিয়ে পড়া হলো।
আজ জেসমিন সুলতানা হাজার হাজার অসমীয়া মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীর কাছে আশার আলোকবর্তিকা। তিনি প্রমাণ করেছেন, লক্ষ্য স্থির থাকলে এবং কঠোর পরিশ্রমের সাহস থাকলে কোনো বাধাই মানুষকে সাফল্য থেকে দূরে রাখতে পারে না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সমাজে পরিবর্তন আনার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা এখন বাস্তবের পথে এগিয়ে চলেছে।