মাত্র ২৩ বছরে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হয়ে পুণের আবরার আলন্দের উজ্জ্বল সাফল্য

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 15 h ago
আবরার আলন্দ
আবরার আলন্দ
 
আমিন শেখ

যদি একাগ্রতা থাকে, তবে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিকেও জয় করা সম্ভব, এই কথাটিই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন মহারাষ্ট্রের পুণে জেলার কলম্ব গ্রামের রামওয়াড়ির বাসিন্দা আবরার আলন্দে। পুণে জেলার ওয়ালচান্দনগর এলাকার সাপ্তাহিক হাটে ফল বিক্রি করে সংসার চালানো বাবার স্বপ্নকে নিজের কঠোর পরিশ্রমে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তিনি। দেশের অন্যতম কঠিন বলে বিবেচিত CA পরীক্ষায় মাত্র ২৩ বছর বয়সেই উত্তীর্ণ হয়ে তিনি এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন
 
কঠোর পরিশ্রমে কঠিন পরিস্থিতির জয়

আবরার আলন্দের বাবা আয়ুব জংবাহাদুর আলন্দে পুণে জেলার ওয়ালচান্দনগরের সাপ্তাহিক বাজারে ফল বিক্রি করে সংসার চালান, আর তাঁর মা একজন গৃহিণী। অত্যন্ত সাধারণ পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা আবরার ছোটবেলা থেকেই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তিনি প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করে কঠোর পরিশ্রম করেছেন।
 
 
 
এই প্রসঙ্গে ‘আওয়াজ - দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম যে আমি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হব। সাধারণত সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই এই চিন্তাটা মাথায় আসে। তখন আমার এক আত্মীয় ভাই CA পড়ছিল, তাঁর কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা পাই।”
 
পরীক্ষার প্রস্তুতি থেকে সাফল্যের পথে...

আবরারের প্রাথমিক শিক্ষা পুণে জেলার ওয়ালচান্দনগরের ভারত চিলড্রেন একাডেমিতে হয়। এরপর একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনা করেন পুণে শহরের BMCC কলেজে। পরে তিনি পুণের MMCC কলেজ থেকে বি.কম (B.Com)  সম্পন্ন করেন।
 
তিনি ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে CA ফাউন্ডেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০২২ সালের মে মাসে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় সফল হন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে CA ফাইনালের প্রথম গ্রুপ এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় গ্রুপে উত্তীর্ণ হয়ে অবশেষে নিজের স্বপ্ন পূরণ করেন।
 
সাফল্যের পর নিজের প্রস্তুতির কথা বলতে গিয়ে আবরার জানান, “দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি CA ফাউন্ডেশনের জন্য ক্লাস শুরু করি এবং প্রস্তুতিতে নেমে পড়ি। সেই সময় কোভিড মহামারীর কারণে বাড়ি থেকেই পড়াশোনা করতাম এবং আমার পরীক্ষা ছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে। প্রথম চেষ্টাতেই ৪০০ নম্বরের মধ্যে ২৫৭ পেয়ে আমি CA ফাউন্ডেশনে পাশ করি।”
 
প্রতীকী ছবি
 
তিনি আরও বলেন, “এরপর দুই সপ্তাহ বিশ্রাম নিয়ে আমি পুণেতে CA ইন্টারমিডিয়েটের জন্য ক্লাস শুরু করি। কিন্তু ২০২১ সালে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আসায় আবার সব ক্লাস অনলাইনে চলে যায় এবং আমি বাড়িতে ফিরে প্রস্তুতি চালিয়ে যাই। যদিও সেইবার আমি সফল হতে পারিনি। তারপর ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করে আবার পড়াশোনা শুরু করি। সেই পরিশ্রমের ফল পাই ২০২২ সালের মে মাসে, যখন আমি CA ইন্টারমিডিয়েটের দুই গ্রুপেই ৮০০ নম্বরের মধ্যে ৪১১ পেয়ে উত্তীর্ণ হই।”
 
পরিবারের সমর্থন
 
আবরার জানান, তাঁর এই সাফল্যের পিছনে বাবা-মা, ভাই-বোন, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং বন্ধুদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এছাড়াও তিনি বলেন যে 'The Institute of Chartered Accountants of India'-এর পুণে শাখার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা কম্পিউটার, যোগাযোগ দক্ষতা ও অন্যান্য স্কিল ডেভেলপমেন্টের প্রশিক্ষণ এবং বিশেষজ্ঞদের দিকনির্দেশনা পায়, যা তাঁর জন্য খুবই উপকারী হয়েছিল।
 
আবরার বলেন, “CA ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর আমি তিন বছর ধরে CA ক্ষেত্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করি। আমার CA-এর শেষ প্রচেষ্টা ছিল ২০২৫ সালের মে মাসে। তাই আমি ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করি। সেই সময় আমার পড়াশোনায় সাহায্য করার জন্য মা ও বোন পুণেতে এসে থাকেন, যাতে আমি ঘরের মতো পরিবেশ এবং মানসিক সমর্থন পাই। বাবা নিজের কাজের কারণে পুণেতে থাকতে পারেননি, তবে মাঝেমধ্যে আমাদের দেখতে আসতেন। সেই সময় তিনি একাই ছিলেন, আর আমরা তিনজন পুণেতে ছিলাম।”
 
দেশের অন্যতম কঠিন বলে বিবেচিত CA পরীক্ষার ফল ২০২৬ সালের ১ মার্চ প্রকাশিত হয়। সেই ফলাফলে আবরার আলন্দে বড় সাফল্য অর্জন করেন। তিনি বলেন, “ফল প্রকাশের সময় আমার এক আত্মীয় ভাই ওয়াসিম আলন্দ ফোন করে আনন্দের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘হ্যালো CA আবরার আয়ুব আলন্দ, তুমি পাশ করে গেছ!’ সেই মুহূর্তের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”
 
আবরার আলন্দকে অভিনন্দন জানানোর একটি দৃশ্য
 
সেই বিশেষ দিনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ফল প্রকাশের দিন রমজান মাস চলছিল, তাই আমরা সবাই রোজা রেখেছিলাম। সন্ধ্যা প্রায় ৬টা ৩০ মিনিটে, ইফতারের ঠিক সময়ের কাছাকাছি ফল প্রকাশ হয়। আনন্দ এতটাই বেশি ছিল যে পরিবার ও আত্মীয়রা চারদিকে এই সুখবর ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। সেই আনন্দে তারা ইফতার করতেও ভুলে গিয়েছিলেন, কারণ আমার সাফল্যের আনন্দেই যেন তাদের ক্ষুধা-পিপাসা মিটে গিয়েছিল।”
 
পরিবারে সাফল্যের ধারাবাহিকতা
 
আবরার আলন্দের পরিবারে শিক্ষার মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের এক দীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে। তাঁর এক আত্মীয় ভাই ওয়াসিম আলন্দ একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। আরেক আত্মীয় আজম আলন্দে পুলিশ সাব-ইনস্পেক্টর (PSI) হিসেবে কর্মরত। আবরারও সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে পরিবারের এই ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন।
 
একেবারে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা আবরার আলন্দের এই সাফল্য মুসলিম সমাজের নতুন প্রজন্মের সামনে শিক্ষার মাধ্যমে উন্নতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আর্থিক অভাব এবং কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও একাগ্রতা, কঠোর পরিশ্রম এবং অবিরাম প্রচেষ্টার মাধ্যমে যে বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব, তা তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন।