আশফাক কাইমখানি / সিকার (রাজস্থান)
রাজস্থানের মরুভূমি অঞ্চল শুধু বীরত্বের জন্যই নয়, বরং বড় হৃদয় আর পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধের জন্যও পরিচিত। এমন এক সময়ে, যখন সমাজে বিভেদের খবর সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদ মাধ্যমে প্রায়ই সামনে আসে, ঠিক তখনই রাজস্থানের সিকার জেলার গুহালা গ্রাম থেকে এসেছে এক আশার বার্তা। এখানে চারজন হিন্দু ভাই তাদের মুসলিম প্রতিবেশীদের সুবিধার জন্য ঈদগাহ নির্মাণে নিজেদের বহু লক্ষ টাকার জমি নিঃসংকোচে দান করে ‘গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতি’ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
সিকার জেলার নরসিংহ পুরী পঞ্চায়েতের অন্তর্গত সাওয়ালী ধানিতে বসবাসকারী মুসলিম পরিবারগুলি দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিল। গ্রামে ঈদগাহের জন্য তাদের নিজস্ব কোনো জমি ছিল না। ফলে ঈদ ও বকরিদের মতো বড় উৎসবে নামাজ আদায় করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব দেখা দিত। মানুষ বাধ্য হয়ে একটি ছোট মসজিদেই ভিড় করে ইবাদত করত। গ্রামের হিন্দু ভাইয়েরা যখন প্রতিবেশীদের এই কষ্ট উপলব্ধি করেন, তখন তারা কোনো দ্বিধা না করেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।
মালী সম্প্রদায়ের চার ভাই, লক্ষ্মণ রাম সাইনি, ভূপাল রাম সাইনি, পূরণমল সাইনি এবং জগদীশ সাইনি, তাদের উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়ে নিজেদের মূল্যবান জমি ঈদগাহের জন্য দান করার সিদ্ধান্ত নেন। বাজারে এই জমির মূল্য কয়েক লক্ষ টাকা হলেও, এই ভাইদের কাছে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতির মূল্য সেই জমির থেকেও অনেক বেশি ছিল।
ঈদের পবিত্র দিনে যখন এই জমি আনুষ্ঠানিকভাবে দান করা হয়, তখন গোটা গ্রামজুড়ে আনন্দের ঢেউ ওঠে। ঈদের নামাজের পর মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন চার ভাই ও তাদের পরিবারকে মালা পরিয়ে সম্মান জানায়।
গ্রামের প্রবীণরা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এটি শুধু এক টুকরো জমি নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য ভালোবাসার একটি সেতু। এই মহান কাজ যুগের পর যুগ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। উপস্থিত মানুষজন জানান, যখন দেশের কিছু অংশ থেকে বিভেদের খবর আসে, তখন গুহালার মতো গ্রামের এমন ঘটনা মনকে শান্তি দেয়। গ্রামীণ ভারতে আজও যে মানবতাই সবচেয়ে বড় ধর্ম, এটি তারই প্রমাণ।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, শেখাওয়াটি অঞ্চলে জমি দানের এই প্রথা অনেক পুরনো। স্কুল, হাসপাতাল বা ধর্মীয় স্থান নির্মাণ, যাই হোক না কেন, এখানকার মানুষ কখনো ধর্মের দেওয়ালকে বাধা হতে দেয়নি। এই প্রেক্ষিতে প্রাক্তন মন্ত্রী রাজেন্দ্র সিং গুঢ়া ঝুনঝুনুতে নামাজের সময় উপস্থিত থেকে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছিলেন।
মুসলমান সমাজ চারজন সাইনি ভ্রাতৃকে সম্বর্ধনা প্রদান করল
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শেখাওয়াটির ফতে হাপুর ও বেছওয়া গ্রামেও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন সরকারি স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণের জন্য নিজেদের মূল্যবান জমি দান করেছিলেন। আজ সেখানে উন্নত মানের মেয়েদের কলেজ ও হাসপাতাল চলছে, যেখানে সব ধর্ম ও জাতির মেয়েরা শিক্ষা গ্রহণ করছে। একইভাবে, লাডনুনের কাছে লেডি গ্রামে একজন মুসলিম ব্যক্তি মাতাজীর মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, যা এই সম্মিলিত সংস্কৃতিরই একটি অংশ।
আজকের দিনে, যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণার বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তখন লক্ষ্মণ রাম, ভূপাল রাম, পূরণমল এবং জগদীশ সাইনি-দের মতো মানুষই প্রকৃত ভারতের মুখ তুলে ধরে। এই চার ভাই প্রমাণ করে দিয়েছেন যে ভারতের আত্মা তার বৈচিত্র্য ও ঐক্যের মধ্যেই নিহিত।
গুহালা গ্রামের এই ঈদগাহ এখন শুধু উপাসনার স্থান নয়, বরং এটি সেই চার ভাইয়ের ত্যাগ ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে চিরকাল গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকবে। রাজস্থানের এই ছোট গ্রামটি গোটা দেশকে এই বার্তা দিয়েছে, যদি আমরা একে অপরের প্রয়োজন বুঝতে শিখি, তাহলে কোনো বিবাদের জন্য আর কোনো জায়গা থাকবে না। ‘গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতি’ কেবল বইয়ের শব্দ নয়, বরং বাস্তবে দেখা যায় এমন এক সত্য।