পরওয়াজ: সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের অনন্য উড়ান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
 পরওয়াজ: সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের অনন্য উড়ান
পরওয়াজ: সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের অনন্য উড়ান
 
নয়া দিল্লি 

‘পরওয়াজ’ ধারাবাহিকের অংশ হিসেবে, যেখানে ভারতের অসাধারণ মুসলিম নারীদের কাহিনি তুলে ধরা হয়, 'আওয়াজ- দ্য ভয়েস' আপনাদের সামনে নিয়ে এসেছে দেশের দশজন মুসলিম ক্রীড়াবিদের অনুপ্রেরণামূলক গল্প। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এক শক্তিশালী নাম। সমাজের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে এবং স্বপ্নপূরণের নিরলস সাধনার মধ্য দিয়ে তাঁরা জাতির জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন। তাঁদের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজে মুসলিম নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
 
গ্রাসরুট স্তর থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ পর্যন্ত, এই অসাধারণ নারীরা সাহস, অধ্যবসায় এবং স্বপ্নপূরণের নিরলস প্রচেষ্টার প্রতীক। তাঁরা ভারতীয় খেলাধুলার পরিসরকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন এবং সমাজের গভীরে প্রোথিত বাধাগুলোকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন।
 
আলফিয়া পাঠান
 
আলফিয়া পাঠান 
 
নাগপুরের সরু গলি থেকে উঠে এসে আলফিয়া পাঠান আজ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তাঁর এই পথচলা দৃঢ়তা এবং নীরবভাবে সামাজিক নিয়ম ভাঙার গল্প। ভাইয়ের অনুপ্রেরণা এবং মেরি কম সিনেমা দেখে উৎসাহিত হয়ে তিনি কঠোর অনুশীলন শুরু করেন, নানা বাধা সত্ত্বেও। শেষ পর্যন্ত পোল্যান্ডের কালিশে অনুষ্ঠিত AIBA যুব বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতে তিনি নিজের ক্ষমতার প্রমাণ দেন। রিংয়ে তাঁর নিখুঁত কৌশল এবং রিংয়ের বাইরে তাঁর সরলতা, দুটিই তাঁকে এক শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলেছে, যিনি অলিম্পিকের স্বপ্ন দেখেন এবং নতুন প্রজন্মের মেয়েদের অনুপ্রাণিত করেন।
 
আলিমা রহমান
 
আলিমা রহমান 
 
কলকাতায় আলিমা রহমান, যিনি ‘হিজাবি বাইকার’ নামে পরিচিত, শহরের রাস্তায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাইক চালিয়ে এক আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছেন। সমাজের নানা বাধা সত্ত্বেও বাবার সমর্থনে তিনি এগিয়ে গিয়েছেন। কটূক্তি এবং হয়রানি সহ্য করেও তিনি প্রমাণ করেছেন যে, নারীরা সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে সক্ষম। আজ তিনি শুধু একজন বাইকার নন, বরং নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক, যিনি সড়ক নিরাপত্তার প্রচার করেন এবং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করেন।
 
আনিসা সৈয়দ
 
আনিসা সৈয়দ

ভারতের শুটিং জগতে যখন মনু ভাকের এবং অভিনব বিন্দ্রার মতো তারকারা আলোচনায়, তখন আনিসা সৈয়দের গল্প তুলনামূলকভাবে নীরব হলেও অত্যন্ত শক্তিশালী। মহারাষ্ট্রের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি নিজের বাড়িতেই অনুশীলনের ব্যবস্থা করেন এবং ২০১০ সালের কমনওয়েলথ গেমসে ২৫ মিটার পিস্তল ইভেন্টে দুটি সোনা জিতে ইতিহাস গড়েন। এত বড় সাফল্যের পরেও তিনি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা এবং ব্যক্তিগত সমস্যার সম্মুখীন হন, এবং এখন ফারিদাবাদে অপেক্ষাকৃত শান্ত জীবনযাপন করেন। তাঁর গল্প সাফল্যের পাশাপাশি সংগ্রামের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
 
ফারিহা জামান
 
ফারিহা জামান 

গুয়াহাটির ফারিহা জামান প্রশাসনিক বাধা এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামকে জয় করে ‘ভারতের ব্যাকস্ট্রোক কুইন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই সাঁতার শুরু করে তিনি জাতীয় রেকর্ড গড়েন এবং আন্তর্জাতিক স্তরে একাধিক পদক জয় করেন। বিভিন্ন সমস্যার কারণে অসম ছাড়তে বাধ্য হলেও, পরে তিনি ফিরে আসেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যে স্পোর্টস অথরিটি অব অসমের সঙ্গে যুক্ত হন, যাতে নতুন সাঁতারুরা তাঁর মতো সমস্যার সম্মুখীন না হয়।
 
নাজরিন আহমেদ
 
নাজরিন আহমেদ

যখন নারীদের ক্রিকেট তেমন স্বীকৃতি পেত না, তখন গুয়াহাটির নাজরিন আহমেদ এই খেলায় পথিকৃৎ হিসেবে উঠে আসেন। লালা অমরনাথের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি ১৯৮১ সালে অসমকে প্রথম বড় জয় এনে দেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক বাধা সত্ত্বেও তাঁর এই সাফল্য আজকের স্মৃতি মান্ধানা ও হরমনপ্রীত কৌরের মতো তারকাদের পথ তৈরি করেছে। পরে তিনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও সফলতা অর্জন করেন এবং এখনও নারী ক্রিকেটের উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন।
 
নিখাত জারিন
 
নিখাত জারিন

নিজামাবাদের নিখাত জারিন ভারতের অন্যতম সফল বক্সার হিসেবে পরিচিত। শুরুর সংগ্রাম এবং সামাজিক বাধা অতিক্রম করে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য অর্জন করেছেন। স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি ২০২২ এবং ২০২৩ সালে পরপর দুটি IBA নারী বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতেন, পাশাপাশি কমনওয়েলথ গেমসেও সোনা পান। তাঁর যাত্রা নারী ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
 
উমাইরা
 
উমাইরা

কেরালার কান্নুরের উমাইরা ৩৯ বছর বয়সে পাওয়ারলিফটিং শুরু করে বয়স এবং লিঙ্গের বাধা ভেঙে দিয়েছেন। মাস্টার্স বিভাগে প্রতিযোগিতা করে তিনি প্রায় ৩৫০ কেজি মোট ওজন তুলে একাধিক পদক জিতেছেন। পারিবারিক দায়িত্ব এবং প্রশিক্ষকের ভূমিকা সামলানোর পাশাপাশি তিনি চোট এবং আর্থিক সমস্যার সঙ্গেও লড়াই করেছেন। তাঁর গল্প দৃঢ় সংকল্প এবং পরিবর্তনের প্রতীক।
 
শাহনাজ পারভীন
 
শাহনাজ পারভীন

শাহনাজ পারভীনের কাহিনি শুধু একটি সাধারণ বিজয়ের গল্প নয়; এটি সংগ্রাম, দৃঢ়তা এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা। সম্প্রতি বালেশ্বরে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় তায়কোয়ান্ডো চ্যাম্পিয়নশিপে ( All India Inter- University Taekwondo Championship) স্বর্ণপদক জয় করে তিনি তাঁর অসাধারণ প্রতিভা এবং মানসিক শক্তির প্রমাণ দিয়েছেন। কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যেও তিনি শৃঙ্খলা, কৌশল এবং আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে প্রতিটি প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে একজন অসাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। আজ শাহনাজ অসংখ্য তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণা, যারা সামাজিক বাধার কারণে নিজেদের স্বপ্ন দমিয়ে রাখতে বাধ্য হয়। তাঁর এই যাত্রা প্রমাণ করে যে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি এবং নিরন্তর প্রচেষ্টা থাকলে কোনো বাধাই অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। 
 
সাবা আঞ্জুম করিম
 
সাবা আঞ্জুম করিম

ছত্তিশগড়ের দুর্গের সাধারণ পরিবেশ থেকে উঠে এসে সাবা আঞ্জুম করিম ভারতের অন্যতম সেরা হকি ফরোয়ার্ড হিসেবে পরিচিতি পান। ভাঙা স্টিক এবং সীমিত সুযোগ দিয়ে শুরু করে তিনি আর্থিক এবং সামাজিক বাধা অতিক্রম করে ২০০২ সালের কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের সোনা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৯০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক গোল এবং অর্জুন পুরস্কার ও পদ্মশ্রীর মতো সম্মান অর্জনের পর, তিনি এখন পুলিশ অফিসার হিসেবে এবং রোল মডেল হিসেবে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছেন।
 
তাজামুল ইসলাম
 
তাজামুল ইসলাম

কাশ্মীরের বান্দিপোরার তাজামুল ইসলাম সাহস এবং সম্ভাবনার এক অনন্য প্রতীক। সীমিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কিকবক্সিং বেছে নিয়ে কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে ২০১৬ সালে মাত্র আট বছর বয়সে বিশ্ব কিকবক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতেন। তাঁর এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং সমাজে এক নীরব পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যেখানে আরও বেশি মেয়েরা নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সাহস পাচ্ছে।