কাশ্মীরের বান্দিপোরার এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী যুবক ইরফান আহমেদ লোন যখন UPSC পরীক্ষায় ৯৫৭তম স্থান অর্জন করে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে উত্তীর্ণ হন, তখন শুধু তাঁর কঠোর পরিশ্রমই নয়, তাঁর বাবার দূরদৃষ্টি ও স্বপ্নও এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে।
তাঁর বাবা স্থানীয় সরকারি দপ্তরের একজন অস্থায়ী কর্মী ছিলেন, মাসিক আয় মাত্র ৩০০০ টাকা। এমন পরিস্থিতিতেই তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ছেলেকে উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে অবস্থিত সরকারি পরিচালিত 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ভিজুয়ালি ইমপেয়ার্ড'-এ ভর্তি করান।
“সেই সময় এটা ছিল অত্যন্ত সাহসী সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে যখন তাঁর আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল,” সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের জানান তাঁদের এক প্রতিবেশী, যিনি বান্দিপোরার নাইদখাইয়ের মাঞ্জপোরা গ্রামে তাঁদের বাড়িতে আসা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
বর্তমানে ইরফানের বাবা প্রায় ৯০০০ টাকা উপার্জন করেন। এই কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি ইরফানকেও কাজ করতে হয়েছে, এবং সেইসঙ্গে ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিও চালিয়ে যেতে হয়েছে।
ইরফানের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয় মাত্র পাঁচ বছর বয়সে, যখন দুটি দুর্ঘটনায় তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারান এবং ১০০ শতাংশ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হিসেবে চিহ্নিত হন।
এতেই যেন শেষ নয়, এর কিছুদিন পরই তিনি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর মাকে হারান। এই কঠিন সময় তাঁদের পরিবারকে গভীরভাবে আঘাত করে, কিন্তু তারা ভেঙে পড়েনি, বরং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ইরফানের বাবা তাঁকে দেরাদুনের একটি বিশেষ বিদ্যালয়ে ভর্তি করান, যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা দেওয়া হয়। সেখানে তিনি শুধু পড়াশোনাই করেননি, বরং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও গড়ে তোলেন।
ইরফান আহমেদ লোন
২০১৬ সালে তিনি ১২শ শ্রেণিতে ৯১% নম্বর নিয়ে উত্তীর্ণ হন। এটি তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন। পরে তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
জীবিকা নির্বাহের জন্য ইরফান পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকে কাজ করেন। পরে তিনি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ায় অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার (AAO) হিসেবে নির্বাচিত হন। চাকরি পরিবর্তন করলেও তিনি ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যান।
ইউপিএসসি পরীক্ষায় সফল হয়ে ইরফান লোন তাঁর জেলা বান্দিপোরার জন্যও গর্বের কারণ হয়ে ওঠেন, কারণ তিনি সেই সীমান্তবর্তী ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চল থেকে প্রথম ব্যক্তি, যিনি এই সাফল্য অর্জন করেন। তাঁর সাফল্য শুধু তাঁর নিজের নয়, এটি সারা ভারত, বিশেষ করে কাশ্মীরের বহু তরুণ-তরুণীর স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
ইরফানের মতে, সাফল্যের জন্য শুধু কঠোর পরিশ্রমই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সঠিক কৌশলও। তিনি তরুণদের পরামর্শ দেন, সোশ্যাল মিডিয়ার মতো বিভ্রান্তি এড়িয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে। তাঁর মতে, দৃঢ় সংকল্প ও ধারাবাহিকতাই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
তিনি প্রায়ই কবিতার মাধ্যমে অন্যদের অনুপ্রাণিত করেন, 'আমি এখন থামতে পারি না', 'আমার এখনও অনেক পথ চলা বাকি', 'ঝড় আর প্রখর রোদের মাঝেও', 'আমাকে এগিয়ে যেতেই হবে'।
ইরফান তাঁর সাফল্যের জন্য তাঁর বাবাকেই কৃতিত্ব দেন। তাঁর মতে, তাঁর বাবা-ই ছিলেন সবচেয়ে বড় শক্তি, যিনি তাঁকে প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়েছেন। তাঁর বাবা নিজের সব আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে সন্তানের শিক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর ভাই-বোনেরাও সবসময় তাঁর পাশে থেকেছে। ইরফানের তরুণ প্রজন্মের জন্য বার্তাউচ্চতায় পৌঁছানোই আসল সাফল্য নয়, সেখানে টিকে থাকাই প্রকৃত সাফল্য।